কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়ায় এক তরুণ-তরুণীর প্রেমের সম্পর্ককে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ ধীরে ধীরে সহিংসতা, মামলা এবং সামাজিক চাপে রূপ নিয়ে একটি পরিবারকে চরম সংকটে ফেলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। হামলা, বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর এবং দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের মধ্যে পড়ে এক ব্যবসায়ীর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মোঃ মেহেদী ইসলাম রাফি (২২) এবং কাজী নুজাহাত রশীদ ঐশী (২২) একই কলেজে পড়াশোনা করতেন। সেখান থেকেই তাদের পরিচয় এবং পরে তা ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়। বিষয়টি দুই পরিবারের মধ্যে জানাজানি হলে বিরোধের সূত্রপাত ঘটে। এর আগে দুই পরিবারের মধ্যে কোনো ধরনের পরিচয় বা যোগাযোগ ছিল না বলে জানা গেছে।
ঐশীর বাড়ি কুমিল্লার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায়। তিনি স্থানীয়ভাবে পরিচিত একটি রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য। তার বাবা কাজী হারুন অর রশীদ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচিত। অন্যদিকে রাফির পরিবারও রাজনৈতিকভাবে পরিচিত বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। রাফি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ও বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ এ.কে.এম আলকাসুর রহমানের ভাইয়ের ছেলে। তার বাবা মোঃ নজরুল ইসলাম ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী এবং স্থানীয়ভাবে একজন ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত।
রাফির পরিবারের দাবি, ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ওই বছরের ২৩ এপ্রিল রাফির ওপর প্রথম হামলার ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। পরিবারের ভাষ্যমতে, তাকে প্রকাশ্যে মারধর করা হয় এবং বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়। এরপর একই বছরের ৬ জুন দ্বিতীয় দফায় হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন বলে দাবি পরিবারের। তাদের অভিযোগ, এ সময় তাকে নির্মমভাবে মারধর করা হয় এবং তার হাত-পা ভেঙে দেওয়া হয়। পরে তিনি দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন ছিলেন।
পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে, যখন রাফি ও ঐশী এলাকা ছেড়ে চলে যান বলে জানা যায়। এরপর রাফির বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করা হয় বলে অভিযোগ করেছেন তার পরিবারের সদস্যরা। পুলিশও কয়েক দফা তাকে খুঁজতে তাদের বাড়িতে যায়। পরিবারটি দাবি করছে, এসব পদক্ষেপ প্রতিহিংসামূলকভাবে নেওয়া হয়েছে। রাফিকে না পেয়ে তার পরিবারের সদস্যদের ওপর বিভিন্নভাবে চাপ সৃষ্টি করা হয় বলেও তারা অভিযোগ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, সামাজিকভাবে হেয় করা, হুমকি দেওয়া এবং নানা ধরনের মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে পরিবারটি দীর্ঘদিন ধরে ভুগছিল।
পরিবারের দাবি, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়। ওই সময় তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয় এবং আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি করা হয়। এতে পরিবারটি বড় ধরনের আর্থিক সংকটে পড়ে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, তারা সরাসরি কোনো রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তবু কেন তাদের ওপর বারবার আক্রমণ নেমে এলো তা তারা বুঝতে পারছেন না। তার ভাষায়, বাড়ি এবং ব্যবসা কোনো জায়গাই আর নিরাপদ ছিল না। চারদিক থেকে চাপের মুখে পড়ে পরিবারটি কার্যত নিঃস্ব হয়ে গেছে।
পরিবারের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা হামলার ভয়, মামলা, আর্থিক ক্ষতি এবং সামাজিক চাপে রাফির বাবা নজরুল ইসলাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। তিনি আগে থেকেই কিছুটা অসুস্থ ছিলেন বলে জানা গেলেও এই পরিস্থিতিতে তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের ভয়, দুশ্চিন্তা এবং মানসিক চাপ তার মৃত্যুর অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
এ বিষয়ে ঐশীর পরিবারের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ বিষয়ে জানতে, ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে একাধিকবারবার চেষ্টা করেও পাওয়া যায় নি৷