বর্ষায় হাঁটুপানিতে ডুবে ধর্মপুর খাদ্য গুদাম, শস্য রক্ষায় হুমকি

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

বর্ষা এলেই হাঁটুপানিতে ডুবে যায় কুমিল্লা জেলার প্রধান খাদ্য সংরক্ষণাগার ‘ধর্মপুর খাদ্য গুদাম’। এটি জেলার প্রধান খাদ্য সংরক্ষণাগার হলেও বছরের বড় একটি সময় এটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে। গুদামের চারপাশজুড়ে জমে থাকে ঘন কালো পানি। সৃষ্টি হয় নোংরা পরিবেশ। গ্রীষ্মে এ দুর্ভোগ কিছুটা কম থাকলেও বর্ষায় তা ভয়াবহ রূপ নেয়। জলাবদ্ধতার কারণে গুদাম ঘরগুলোর আশপাশ রূপ নেয় ময়লার ভাগাড়ে।
জানা গেছে, ১৯৫২ সালে নির্মিত এই খাদ্য গুদামে বর্তমানে ১৪টি গুদাম ঘর রয়েছে। ২০১৩ সালে নতুন করে যুক্ত হয় আরও চারটি গুদাম। মোট ধারণক্ষমতা প্রায় সাড়ে ১০ হাজার টন হলেও বর্তমানে ব্যবহারযোগ্য গুদাম মাত্র সাতটি। সাতটি গুদাম অচল অবস্থায় পড়ে আছে এবং একটি গুদাম একেবারেই পরিত্যক্ত।
গুদামগুলোতে এখন মূলত ধান, চাল ও গম সংরক্ষণ করা হয়। কার্যকর গুদামগুলোতে সর্বোচ্চ সাড়ে ছয় হাজার টন শস্য রাখা সম্ভব হলেও বারবার জলাবদ্ধতার কারণে অনেক সময়ই শস্য সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। ফলে শস্যের গুণগত মান হারায় এবং সংরক্ষণের পরিধি মারাত্মকভাবে সংকুচিত হচ্ছে।
খাদ্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এই গুদাম থেকেই জেলার পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাবসহ বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য নিয়মিত রেশন সরবরাহ করা হয়। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য জরুরি খাদ্য সহায়তার উৎসও এটি। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটির এ করুণ দশা দীর্ঘদিন ধরে চলমান।
খাদ্য গুদাম কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা যায়, জলাবদ্ধতার সূত্রপাত ২০১৭ সাল থেকে। স্থানীয়রা জানান, আশপাশের আবাসিক এলাকা থেকে ড্রেনের মাধ্যমে নেমে আসা পানি এবং টানা বৃষ্টিতে জমা জল এখানকার প্রধান সমস্যা। নেই পর্যাপ্ত ড্রেনেজ ব্যবস্থা। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, “আমরা সব কিছু আমাদের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি। তারা আমাদের ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন।”
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে গুদামের ভেতর দিয়ে হাঁটা তো দূরের কথা, চলাচলও একপ্রকার যুদ্ধ। একজন শ্রমিক মোহাম্মদ আলী জানান, “আমরা প্রতিদিনই এই নোংরা পানির মধ্য দিয়ে মাল উঠাই নামাই। পায়ে ঘা হয়ে গেছে, খোস-পাঁচড়া হয়। এই জলাবদ্ধতার কারণে কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হচ্ছে। এটা কি কেউ দেখে নাকি।”
শুধু শ্রমিকরাই নন, পরিবহণ চালকরাও দুর্ভোগের শেষ নেই বলে জানাচ্ছেন। কারণ, গুদাম এলাকার চারপাশের রাস্তা বর্ষায় পানির নিচে তলিয়ে যায়। অনেক জায়গায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা ট্রাক চলাচলে মারাত্মক বাধা সৃষ্টি করছে। ফলে খাদ্য পরিবহণেও সময় ও অর্থের অপচয় হচ্ছে।
গুদাম ভবনের একাংশে ইতোমধ্যেই মেঝে উঁচু করে সাময়িকভাবে শস্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হলেও তা সাময়িক সমাধান বলে উল্লেখ করেছেন কর্মকর্তারা। এমন পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য কর্তৃপক্ষ ‘একনেক’-এ ১০০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প প্রস্তাব পাঠিয়েছে। কিন্তু এখনও সেটি অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে।
এমনিতেই দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতায় গুদাম ঘরগুলোর ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ছে। আশপাশে একটি প্রাকৃতিক নালা থাকলেও স্থানীয় কিছু ব্যক্তি দখল করে সেটি ভরাট করে ফেলেছে বলে জানা গেছে। এতে করে পানি বের হওয়ার আর কোনো পথই অবশিষ্ট নেই।
সম্প্রতি আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ধর্মপুর গুদাম এলাকা পরিদর্শনে এসে পরিস্থিতির ভয়াবহতা দেখে অবগত হন। কর্তৃপক্ষ জানায়, ইউএনও সড়ক উঁচু করার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছেন এবং ভবিষ্যতে জলাবদ্ধতা নিরসনে উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।
এই বিষয়ে ধর্মপুর খাদ্য গুদামের সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা কামরুন নাহার বলেন, “আমাদের পাশ দিয়ে যে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেললাইন গিয়েছে, তার উন্নয়নের সময় পানি বের হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যায়। ফলে আশপাশের সিটি করপোরেশনের ড্রেনের পানি এবং বৃষ্টির পানি একত্র হয়ে জমে এই জলাবদ্ধতা তৈরি করছে।” তিনি আরও বলেন, “বারবার সিটি করপোরেশনকে জানানো হলেও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।”
এই বিষয়ে জানতে চাইলে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুন্ডু বলেন, ধর্মপুর খাদ্য গুদামের জলাবদ্ধতার বিষয়ে কর্তৃপক্ষ অবহিত রয়েছে। তবে, এটা নিয়ে এখনো কোনো প্রকল্প পাশ হয় নি। আশা করা যাচ্ছে, আগামী অর্থবছরে এই খাদ্য গুদামটি নিয়ে একটি বাজেট পাশ হবে ও সমস্যার সমাধান হবে।
জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার বলেন, কুমিল্লা শহরে জলাবদ্ধতা একটি প্রধান সমস্যা। এর মূল কারণ হচ্ছে, আমাদের যে জলাধারগুলো রয়েছে, সেগুলো ভরাট করে ফেলা হয়েছে। সচেতনতার অভাব রয়েছে আমাদের মধ্যে। আমাদের খাল গুলো অবৈধ দখলদাররা ভরাট করে ফেলেছে। যার কারণে খাদ্য গুদামসহ আমাদের অনেক স্থাপনা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এই খাদ্য গুদাম দিয়ে অনেক পুরোনো৷ নতুন করে একটি খাদ্য গুদাম তৈরি করার প্রকল্প হাতে নেওয়া সরকারের সক্রিয় বিবেচনা রয়েছে। আমরা আশা করছি খুব শীঘ্রই আমরা ধর্মপুরে নতুন একটি খাদ্যগুতামের কাজ শুরু করতে পারব।
এদিকে, এই অব্যবস্থাপনা দীর্ঘস্থায়ী হলে কুমিল্লার খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে পড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। বিশেষ করে দুর্যোগকালীন সময়ে খাদ্য সরবরাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। তাই সংশ্লিষ্টদের দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এলাকাবাসী।