শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জেলা শহরের কাছাকাছি ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে স্থাপনের দাবিতে দ্বিতীয়বারের মতো বিক্ষোভ করেছেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি পালন করেন তারা।
আন্দোলনকারীদের দাবি, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের যাতায়াত, নিরাপত্তা এবং নাগরিক সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ করতে হবে।
বেলা ১১টার দিকে শরীয়তপুর সদর উপজেলা পরিষদের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়। শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে মিছিলটি জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বরাবর স্মারকলিপি দেন আন্দোলনকারীরা।
এর আগে, গত শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) বিকেলে শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের কোটাপাড়া ব্রিজসংলগ্ন এলাকায় একই দাবিতে মানববন্ধন করেন জেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
বুধবারের কর্মসূচিতে সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবরের নেতৃত্বে জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ কয়েক হাজার মানুষ অংশ নেন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে বক্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণে যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা এবং নাগরিক সুবিধা বিবেচনার দাবি জানান।
বক্তারা বলেন, শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। এটি প্রতিষ্ঠিত হলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি কৃষি গবেষণা, কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ও সামগ্রিক উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। তাই কোনো নির্দিষ্ট এলাকার স্বার্থের পরিবর্তে পুরো জেলার মানুষের সুবিধা প্রাধান্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ করতে হবে।
তাদের দাবি, জেলা শহরের কাছাকাছি ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হলে জেলার বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ হবে। পাশাপাশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করাও তুলনামূলক সহজ হবে।
চন্দ্রপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী টিউশনি করে পড়াশোনার খরচ চালান। বিশ্ববিদ্যালয় শহর থেকে অনেক দূরে চরাঞ্চলে স্থাপন করা হলে তাদের পক্ষে টিউশনি করে খরচ চালানো কঠিন হবে। রাতে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও নিরাপত্তার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সদর এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে শিক্ষার্থীদের যাতায়াত ও দৈনন্দিন জীবনযাপন সহজ হবে। উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা থাকলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ও বিদেশের শিক্ষক-গবেষকদেরও সেখানে আসার সুযোগ বাড়বে।
সদর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মোর্শেদ টিপু মাদবর বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি ডামুড্যায় স্থাপন করা হলে জেলার বিভিন্ন এলাকার শিক্ষার্থীদের যাতায়াতে সমস্যা হতে পারে। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। এ কারণে সদর, জাজিরা ও নড়িয়ার মাঝামাঝি ঢাকা-শরীয়তপুর মহাসড়কের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের দাবি জানানো হয়েছে।
তিনি বলেন, ডামুড্যায় আগে স্থাপিত দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বর্তমান অবস্থা সন্তোষজনক নয়। এর উদাহরণ হিসেবে আলহাজ আব্দুর রাজ্জাক নার্সিং কলেজের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রতিষ্ঠানটিতে বর্তমানে ১৫৮ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে শিক্ষক মাত্র একজন। কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রেও এমন পরিস্থিতি এড়াতে এখনই স্থান নির্ধারণে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। ব্যক্তিগত বা আঞ্চলিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে পুরো জেলার মানুষের সুবিধা বিবেচনায় নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আব্দুর রব বলেন, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ক্ষেত্রে শুধু জমির প্রাপ্যতা বিবেচনা করলেই হবে না। শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের সহজ যাতায়াত, নিরাপত্তা, আবাসন, চিকিৎসা, যোগাযোগব্যবস্থা ও নাগরিক সুবিধাকেও গুরুত্ব দিতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জেলা শহরের কাছাকাছি পূর্বনির্ধারিত স্থানেই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের দাবি জানান তিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২১ সালে শরীয়তপুরে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ওই বছরের অক্টোবরে সরকার বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। প্রথমে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে বিশ্ববিদ্যালয়টির নামকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ২০২৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আইন চূড়ান্ত অনুমোদন পায় এবং ওই বছরের ১৩ নভেম্বর গেজেট প্রকাশিত হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম পরিবর্তন করে শরীয়তপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় রাখে। চলতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োকেমিস্ট্রি অ্যান্ড মলিকুলার বায়োলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. হোসেন উদ্দিন শেখরকে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কোথায় স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। গত ১৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের হুইপ ও শরীয়তপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য মিয়া নুরুদ্দিন আহাম্মেদ উপাচার্য ও জেলা প্রশাসককে সঙ্গে নিয়ে ডামুড্যা উপজেলার পূর্ব ডামুড্যা এলাকায় একটি জমি পরিদর্শন করেন। ওই এলাকায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস স্থাপনের কথা জানানো হয়। এলাকাটি জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। এরপর বিশ্ববিদ্যালয়টি জেলা শহরের কাছাকাছি স্থাপনের দাবি তোলেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের দাবি বিবেচনায় নেওয়া না হলে পরবর্তী সময়ে আরও কর্মসূচি দেওয়া হবে