শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ মোশারফের বাড়িতে জুম্মা : পথে পথে জীবনের গল্প

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-৪
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

নীলসাগরে এসে আমরা মিশুকচালক মোশারফকে বিদায় দিইনি। তার আচরণে, কথাবার্তায় এবং আন্তরিকতায় এক ধরনের বিশ্বাস জন্ম নিয়েছিল। তাই তাকে বললাম, “আপনি থাকুন। ঘোরা শেষে আবার আপনাকেই নিয়ে শহরে ফিরব।”
নীলসাগরের পাড়ে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে, লাইভ সম্প্রচার শেষ করে যখন আমরা হোটেলের দিকে ফেরার প্রস্তুতি নিচ্ছি, তখন মোশারফ একটু সংকোচ, একটু দৃঢ়তা মিশিয়ে বলল,“স্যার, আমাদের বাড়িতে জুম্মা নামাজ আদায় করবেন। আমার ঘরে এক গ্লাস পানি খেয়ে তারপর আমরা শহরে রওনা হব। আর যেতে যেতে আপনার চ্যানেলে যদি আমার জীবন কাহিনীটা প্রচার করেন আমি আস্তে আস্তে গাড়ি চালাব। কোনো সমস্যা হবে না।” তার কথার ভেতরে ছিল গ্রামবাংলার চেনা আতিথেয়তা, আবার ছিল নিজের জীবনের কথা কারও কাছে রেখে যাওয়ার এক নির্ভরতার আকুলতা। আমরা রাজি হলাম। কারণ সাংবাদিকতার কাজ শুধু খবর বলা নয়, মানুষের কথা শোনা ও তুলে ধরা এটাও আমাদের দায়িত্ব।
মিশুক ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল। কাঁচা-পাকা পথ পেরোতে পেরোতে মোশারফ বলতে লাগল তার জীবনের গল্প। সামান্য কয়েক নম্বরের জন্য এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে পড়ার দুঃখ তাকে একদিন ঘরছাড়া করেছিল। সেই দুঃখ নিয়েই সে চলে গিয়েছিল ঢাকায়। সেখানে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ জোটে। জীবনের সেই পর্যায়ে ঘটনাচক্রে পরিচয় হয় ময়মনসিংহের এক তরুণীর সঙ্গে। সম্পর্ক, দায়িত্ব আর বাস্তবতার টানে একসময় তাকে কুমিল্লা ইপিজেডে চাকরির আশায় নিয়ে আসা হয়। আর সেখানেই জীবনের আরেক কঠিন সিদ্ধান্ত বিয়ে।
এই পুরো গল্পটি আমরা চলন্ত গাড়িতেই ‘কুমিল্লার জমিন’-এ লাইভ সম্প্রচার করি। ক্যামেরার সামনে মোশারফের কণ্ঠে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল না সাজানো ভাষা। ছিল কেবল জীবনের নিরেট সত্য। আর হয়তো সেই কারণেই লাইভটি দর্শকদের কাছে গভীরভাবে পৌঁছে যায়। মুহূর্তের মধ্যেই ব্যাপক সাড়া পাওয়া যায়। মন্তব্যে, শেয়ারেই বোঝা যাচ্ছিল মানুষ মানুষের গল্প শুনতে চায়, সত্য শুনতে চায়।
এরপর আমরা মোশারফের এলাকার মসজিদে গিয়ে জুম্মা নামাজ আদায় করি। নামাজ শেষে সে আমাদের তার বাড়িতে নিয়ে যায়। ছোট্ট ঘর, সাদামাটা আয়োজন হালকা নাস্তা আর এক গ্লাস পানি। কিন্তু সেই আপ্যায়নের ভেতরে ছিল আন্তরিকতার এমন এক উষ্ণতা, যা অনেক বিলাসবহুল আতিথেয়তার চেয়েও বড়।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে আমরা নীলফামারী শহরের দিকে রওনা দিই। পথে বিস্তীর্ণ পাটক্ষেতের দৃশ্য আবারও আমাদের থামিয়ে দেয়। সবুজ পাটগাছের ফাঁকে দাঁড়িয়ে কয়েকটি ছবি তুলি, পাটক্ষেত নিয়ে একটি ছোট ভিডিও ধারণ করি। তখনই মনে হচ্ছিল এই মাটিতে এখনও সম্ভাবনা আছে, এখনও গল্প আছে।
পরবর্তীতে কুমিল্লায় ফিরে এসে সেই ছবি ও ভিডিও ‘কুমিল্লার জমিন’-এ প্রচার করা হয়। একটি ভ্রমণ, একটি লাইভ, একজন মিশুকচালকের জীবনকথা সব মিলিয়ে এই দিনটি আমাদের কাছে কেবল সংবাদ বা ভ্রমণের অভিজ্ঞতা হয়ে থাকেনি; এটি হয়ে উঠেছিল মানুষের জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার এক অনন্য পাঠ।
প্রত্যাবর্তনের টিকিট : নীলফামারী থেকে কুমিল্লা
নীলফামারী পৌর সদরে ফিরে এসে কুমিল্লার পথে ফেরার প্রস্তুতি শুরু হলো। শহরের ভেতর কয়েকটি বাস কাউন্টার ঘুরে অবশেষে আমরা শ্যামলী পরিবহনের কাউন্টারে এসে পৌঁছাই। দীর্ঘ যাত্রার অভিজ্ঞতায় শেখা একটি বিষয় বিশ্বাসযোগ্য পরিবহন মানে কিছুটা মানসিক স্বস্তি। সেই স্বস্তির খোঁজেই শ্যামলীতে টিকেট নেওয়া।
দুটি টিকিট কাটা হলো। কাউন্টার থেকে জানানো হলো, বিকেল চারটায় গাড়ি ছাড়বে এবং রাত আনুমানিক দুইটা থেকে আড়াইটার মধ্যে কুমিল্লার হোটেল নূর জাহানের সামনে আমাদের নামিয়ে দেবে। হিসাব কষে মনে হলো রাতটা দীর্ঘ হবে, কিন্তু পরিচিত ঠিকানায় ফেরার নিশ্চয়তা থাকায় মনে একধরনের প্রশান্তি এল।
টিকিট কেটে আমরা আবার হোটেলে ফিরে যাই। তখন সময় দুপুর গড়িয়ে প্রায় আড়াইটা। সকাল থেকে একটানা ঘোরাঘুরি, লাইভ সম্প্রচার, মানুষের সঙ্গে কথা সব মিলিয়ে শরীর-মন দুটোই ক্লান্ত। আমরা দু’জনই বিছানায় হেলান দিয়ে একটু বিশ্রামের চেষ্টা করি। কিন্তু ভ্রমণের দিনগুলোতে বিশ্রামও যেন আধা-ঘুমের মতো চোখ বুজলেও মন জেগে থাকে।
এর মধ্যেই বিকেল তিনটার দিকে হোটেলের বাইরে কোলাহল বেড়ে গেল। জানতে পারলাম, শুরু হয়েছে রথযাত্রা। নীলফামারীর রথযাত্রা ভাবনাটা মাথায় আসতেই মনে হলো, এটাকে তো ‘কুমিল্লার জমিন’-এ লাইভ করা যায়। এমন দৃশ্য, এমন উৎসব এগুলোই তো ভ্রমণ সাংবাদিকতার আসল উপাদান।
আমি দ্রুত নিচে নেমে ক্যামেরা সেট করার চেষ্টা করলাম। কিন্তু প্রযুক্তির সঙ্গে সময়ের একটা চিরন্তন দ্বন্দ্ব আছে। ক্যামেরা ঠিক করতে করতেই রথযাত্রার মূল অংশ সামনে দিয়ে এগিয়ে গেল। মানুষের ঢল, ঢাকের শব্দ, শঙ্খধ্বনি সবকিছু মিলিয়ে মুহূর্তটা দ্রুত হাতছাড়া হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত কয়েক মিনিটের একটি সংক্ষিপ্ত লাইভ করেই সন্তুষ্ট থাকতে হলো। মনে হলো সব দৃশ্য ধরা যায় না, কিছু স্মৃতি কেবল চোখ আর মনে জমা থাকে।
হোটেলে ফিরে এসে দেখি সময় দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। আসরের নামাজের ওয়াক্তও প্রায় চলে এসেছে। ব্যাগ গুছিয়ে তরুণকে বললাম, “পোনে চারটা বাজে। দ্রুত উঠো। গাড়ি কিন্তু ঠিক চারটায় ছেড়ে দেবে।”
ভ্রমণের শেষ মুহূর্তে এই তাড়াহুড়োটা যেন অবধারিত। তরুণ হন্তদন্ত হয়ে উঠে নামাজ আদায় করে নেয়, তারপর দ্রুত প্রস্তুত হয়। ব্যাগ, ক্যামেরা, ট্রাইপড সব কিছু গুছিয়ে নেওয়া হলো। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, নীলফামারীর বিকেল ধীরে ধীরে সোনালি রঙে ঢেকে যাচ্ছে।
এই শহর আমাদের পরিকল্পনার বাইরে এসে জীবনের একটি অধ্যায় লিখে দিল। পঞ্চগড়ের টিকিট কেটে নীলফামারীতে নামা, নীলসাগরের নীল বেদনা, মোশারফের গল্প, লাইভ সম্প্রচার সব মিলিয়ে নীলফামারী যেন কেবল একটি যাত্রাবিরতি ছিল না, ছিল এক অনিবার্য পাঠ।
ঠিক চারটায় শ্যামলী বাস ছাড়ার প্রস্তুতি নিল। আমরা উঠে বসলাম কুমিল্লার পথে। জানতাম না, এই ফেরার পথেই নীলফামারীর দায় আরও গভীরভাবে আমার ভেতরে গেঁথে যাবে একটি অভিজ্ঞতা হয়ে নয়, বরং এক দীর্ঘ প্রশ্ন হয়ে।চলবে।