কুরবানির পরবর্তী সময়ে কুমিল্লা নগরজুড়ে ছড়িয়ে থাকা দুর্গন্ধ, সড়কে পড়ে থাকা পশুর বর্জ্য এবং বাড়তে থাকা নাগরিক দুর্ভোগ নতুন কোনো বিষয় নয়। তবে এবার এই পরিস্থিতিকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আরও একটি প্রশ্ন—কোথায় গেল কুমিল্লা সিটি করপোরেশন (কুসিক) বরাদ্দ দেওয়া ২৫ হাজার প্লাস্টিকের বস্তা ও সাড়ে ৪ টন ডিটারজেন্ট পাউডার।
কুসিকের দাবি, এবারের ঈদে ২৭টি ওয়ার্ডে কুরবানির বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে এই পরিমাণ সামগ্রী সরবরাহ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের সচিবদের মাধ্যমে সেগুলো বিতরণও করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য। তবে বাস্তব চিত্র ভিন্ন। নগরবাসীর একাংশ বলছে, তারা এসব সামগ্রী আদৌ পাননি। আবার কেউ কেউ জানেনই না যে এমন কোনো বরাদ্দ ছিল। এতে স্পষ্ট হয়েছে, কোথাও না কোথাও ঘটেছে বিতরণে অনিয়ম।
বৃহস্পতিবার (১২ জুন) সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, বাদুরতলা, নূরপুর, টমছমব্রিজ এলাকা, সালাউদ্দিন থেকে মদিনা মসজিদ সড়ক, সংরাইশ, চৌধুরীপাড়া, চর্থা — প্রায় প্রতিটি এলাকায় রাস্তায় এখনো পশুর বর্জ্য পড়ে আছে। নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য ফেলার পরও অপসারণে দেরি হওয়ায় দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। পোকামাকড় ও কুকুর-বিড়ালের আনাগোনায় বাড়ছে পরিবেশ দূষণ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি।
বাদুরতলা এলাকার বাসিন্দা শাহাজাহান বলেন, “কোনো বস্তা বা ডিটারজেন্ট পাইনি। তবে স্থানীয়ভাবে একজন একটা বস্তা দিয়েছে। আমি জানতামই না এসব জিনিস বরাদ্দ ছিল।” মনোহরপুরের ইয়াসিন খোকনও একই অভিযোগ করেন, “বস্তা বা পাউডার কিছুই দেয়নি।” হাউজিং এস্টেটের বাসিন্দা কামাল বলেন, “পর্যাপ্ত বস্তা দেয়নি। মনে হচ্ছে টাকা আত্মসাৎ করেছে।”
ছোটরা এলাকার সাইফুল ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এখন শুনছি যে বস্তা বরাদ্দ ছিল। কিন্তু আমাদের দেয়নি। কোথায় গেল সেই বরাদ্দ? কেউ কি তা বিক্রি করে পকেট ভরেছে?” একই এলাকার মমিনুল হকের ভাষায়, “রাস্তার পাশে এখনো বর্জ্য পড়ে আছে। দুর্গন্ধে টেকা যায় না। কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করেনি। বিষয়টি তদন্ত হওয়া জরুরি।”
এসব অভিযোগের জবাবে কুসিকের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, “সব ওয়ার্ডে বস্তা পাঠানো হয়েছে। কেউ কেউ নতুন বস্তা রেখে দিয়ে পুরাতন বস্তা ব্যবহার করেছে।” তবে তিনি স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা দিতে পারেননি—যেসব এলাকায় একটিও বস্তা যায়নি, সেগুলোর দায় কার।
অন্যদিকে কুসিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মামুন দাবি করেন, “আমরা শতভাগ কুরবানির বর্জ্য অপসারণ করেছি। তবে যেহেতু এবার আগের চেয়ে বেশি মানুষ কুরবানি দিয়েছে, তাই কিছু এলাকায় সামগ্রী কম পড়েছে। আমাদের কোনো দুর্বলতা ছিল না।”
তবে নাগরিক ভোগান্তি, শহরজুড়ে দুর্গন্ধ, এবং অসংখ্য অভিযোগ যেন বাস্তব চিত্রের ভিন্ন বার্তা দেয়। এখন প্রশ্ন উঠছে—যদি বরাদ্দ দেওয়া হয়ে থাকে, তবে তার সদ্ব্যবহার নিশ্চিত হলো না কেন। যদি না দেওয়া হয়ে থাকে, তবে সেই বরাদ্দের হিসাব কোথায়।
এই অনিয়ম কেবল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, নগরবাসীর মৌলিক নাগরিক অধিকারও ক্ষুণ্ন করছে। পরিবেশগত ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্যের বিষয়টি মাথায় রেখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত এর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনা। না হলে, আগামী কুরবানিতে এই একই চিত্র আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।