কুমিল্লায় জেলা প্রশাসক আমিরুল কায়সার বলেছেন, প্লাস্টিক ব্যবহারের সঙ্গে উন্নয়ন জড়িত নয়, বরং সমস্যা হচ্ছে ব্যবস্থাপনার ঘাটতিতে। বুধবার (২৫ জুন) সকাল ১১টায় জেলা প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের আয়োজিত বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ মন্তব্য করেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, “বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশ গড়ে মাথাপিছু ৪৭ কেজি প্লাস্টিক ব্যবহার করে, সিঙ্গাপুর করে ৭৬ কেজি, আমরা করি মাত্র ৯ কেজি। কিন্তু উন্নত দেশগুলোতে আমাদের মতো মাটি বা পরিবেশ দূষণ হয় না। কারণ তাদের ব্যবস্থাপনা সঠিক। আমাদের দেশে সমস্যা ব্যবস্থাপনায়, জোর করে আইন করে এটা বন্ধ করা যাবে না।”
তিনি বলেন, “প্লাস্টিক ব্যবহারে পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা দেওয়া সম্ভব নয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কিছু প্লাস্টিক আমাদের ব্যবহার করতেই হবে। তবে সিঙ্গেল ইউজ প্লাস্টিক অবশ্যই পরিহার করতে হবে। রিডিউস, রিইউজ আর রিসাইকেল—এই তিননীতি অনুসরণ করেই টেকসই সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব।”
জেলা প্রশাসক আরও বলেন, “আমরা নিজেরা সচেতন না হলে প্রশাসনিক উদ্যোগগুলোও যথাযথভাবে ফলপ্রসূ হবে না। বিদেশে বাজার করতে গেলে ব্যাগ না থাকলে নিজে কিনে নিতে হয়, কিন্তু আমরা এখানে বাজারে গিয়ে পলিথিন না পেলে দোকান ছেড়ে দেই। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। নিজের বর্জ্য নিজেকেই ব্যবস্থাপনা করতে শিখতে হবে। আমাদের সরকারের সক্ষমতার ঘাটতি থাকতে পারে, কিন্তু নাগরিকদের মধ্যে সচেতনতা ছাড়া কোনো দীর্ঘস্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।”
ইট ভাটায় পরিবেশ দূষণ প্রসঙ্গে তিনি আরও বলেন, “ইটভাটার দোষ দিয়ে লাভ নেই, ইট তৈরির প্রযুক্তি পরিবর্তন করলেই পরিবেশের ক্ষতি কমানো সম্ভব। সামগ্রিকভাবে সচেতনতা, সঠিক নীতিমালা ও কার্যকর ব্যবস্থাপনার মধ্য দিয়েই আমরা আমাদের স্বপ্নের পরিবেশবান্ধব দেশ গড়তে পারি।”
এসময়, আলোচনা সভায় শুরুতেই প্রারম্ভিক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিবেশ অধিদপ্তর কুমিল্লার উপ-পরিচালক মোসাব্বের হোসেন মোহাম্মদ রাজীব। এবারের পরিবেশ দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় ছিল—“প্লাস্টিক দূষণ আর নয়, বন্ধ করার এখনই সময়।”
আলোচনা সভার সভাপতিত্ব করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) পঙ্কজ বড়ুয়া।
সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শামীম কুদ্দুস ভূঁইয়া এবং জেলা সিভিল সার্জন ডা. আলী নূর মো. বশির আহমেদ। সিভিল সার্জন বলেন, “বিশ্বে প্রতি মিনিটে ১০ লাখ প্লাস্টিক বোতল কেনা হয়, প্রতি বছর সমুদ্রে যায় প্রায় ৫০ লাখ টন প্লাস্টিক। প্লাস্টিক এখন আমাদের রক্তে প্রবেশ করছে, এর ফলে হরমোনের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয়, ডায়াবেটিস, বন্ধ্যাত্ব এমনকি ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ে। শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশেও এতে ব্যাঘাত ঘটে।”
আলোচনা সভায় বক্তব্য রাখেন, কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি আবুল হাসনাত বাবুল, ক্রীড়া সংগঠক বদরুল হুদা জেনু, বীর মুক্তিযোদ্ধা বশিরুল আনোয়ার, বাপা কুমিল্লার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম, সাংগঠনিক সম্পাদক শাহাজাদা এমরান , কুমিল্লা ব্রিক ফিল্ড মালিক সমিতির সভাপতি ফরহাদ হোসেন মনিরসহ আরো অনেকে।
মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, প্লাস্টিক বন্ধ করতে হলে তার বাস্তবসম্মত বিকল্প খুঁজে বের করতে হবে। কেউই প্লাস্টিক ব্যবহার করতে চায় না, কিন্তু বিকল্পের অভাবেই বাধ্য হয়ে তা ব্যবহার করতে হয়। তারা অভিযোগ করেন, সদর দক্ষিণের দুটি গ্রাম এখন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে, এমনকি সেসব গ্রামে কেউ মেয়ের বিয়েও দিতে চান না। এই সমস্যা সমাধানে সিটি কর্পোরেশনকে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান তারা। বক্তারা কোমল পানীয়র ক্ষেত্রে কাঁচের বোতলের ব্যবহার ফেরানোর আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় জেলার বিভিন্ন স্তরের নাগরিক সমাজ উপস্থিত ছিলেন। সবশেষে পরিবেশ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারীদের মাঝে পুরস্কার বিতরণের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শেষ হয়।