অনেকেই বলাবলি করতে থাকে, ‘এটি ছোঁয়াচে কালো বাতাস, যার গায়ে লাগছে, সে-ই জ্ঞান হারাচ্ছে’। যদিও শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাদের চিকিৎসা দিয়ে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি ‘কালো বাতাস’ বা কোনো মারাত্মক রোগ নয়। প্রতিদিন ভোরে খাবার না খেয়ে প্রাইভেট পড়তে যাওয়া এবং পরে বিদ্যালয়ে ক্লাসে যাওয়ায় অসুস্থ হয়ে পড়ছে তারা। বিশুদ্ধ পানির সংকটও এতে ভূমিকা রাখছে।
শিক্ষার্থীদের খালি পেটে থাকার পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে গত কয়েকদিনে উপজেলার কয়েকটি বিদ্যালয়ে এভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে অন্তত ২৫ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে পীর কাশিমপুর আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ে একদিনেই অসুস্থ হয় ১৮ জন। কামাল্লা ডি আর এস উচ্চ বিদ্যালয়েও কয়েকজন অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
সোমবার সরেজমিন আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ে দেখা যায়, নবম শ্রেণির বেশির ভাগ শিক্ষার্থী অনুপস্থিত। অসুস্থতা আতঙ্কে অধিকাংশই আসেনি। শামীমা সুলতানা তাবাসসুমের ভাষ্য, ক্লাসে হঠাৎ করে একজনের শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। বিষয়টি প্রথমে স্বাভাবিকভাবে নিলেও পরে শিক্ষার্থীরা বলাবলি করছিল, তাদের ‘হাত-পা টানছে’। কিছুক্ষণের মধ্যেই খিঁচুনি দিয়ে সবাই সংজ্ঞাহীন হয়ে যায়। ধরাধরি করে তাদের যারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গিয়েছিল, তারাও অনেকে অসুস্থ হয়ে পড়ে।
ক্লাসের অধিকাংশ মেয়েই ভোরে ঘুম থেকে উঠে প্রাইভেট পড়তে যায় জানিয়ে আরেক ছাত্রী তাকিয়া আক্তার বলছিল, ‘প্রাইভেট থেকে সবাই সোজা ক্লাসে চলে আসে। সময় মেলাতে গিয়ে সকালের নাস্তা আর দুপুরের খাবার খাওয়া হয়ে ওঠে না। ঝালমুড়ি বা শিঙাড়া-পুরি খেয়ে ক্ষুধা নিবারণ করে। পাইপলাইন থাকলেও নেই বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা।
প্রাইভেট ও ক্লাসে আসা নিয়ে একই তথ্য জানান আর এন উচ্চ বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত সহকারী প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ। তিনি বলেন, প্রাইভেট থেকে ক্লাসে চলে আসায় তাদের ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া হয় না। গরমে যতটুকু পানি পান করা দরকার, তারা সেটিও করে না। তাঁর ধারণা, এসব কারণেই তারা অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি খাবার নিয়ে আসা ও পানি পান করার বিষয়টি নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
একই ধরনের কথা বলেছেন কামাল্লা ডি আর এস উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবুল বাশার খান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের পানি পান করার জন্য বিদ্যালয়ে যথেষ্ট ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাদের আরও সচেতন করতে অভিভাবক সমাবেশ ডাকা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক খাবার ও পর্যাপ্ত পানি পান করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হবে। অভিভাবকদের আরও সচেতন হওয়া দরকার।
জানা গেছে, শুধু আর এন উচ্চ বিদ্যালয় না, একই চিত্র কামাল্লা ডি আর এস উচ্চ বিদ্যালয়, মুরাদনগর ডি আর সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়, ভুবনঘর-নহল আলহাজ আব্দুল বাতেন সরকার উচ্চ বিদ্যালয়সহ অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। অসুস্থ হয়ে পড়ছে শিক্ষার্থীরা। বিশুদ্ধ পানি ও বাধ্যতামূলক খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে, প্রধান শিক্ষকরা এমন দাবি করলেও সরেজমিন দেখা যায় ভিন্ন চিত্র।
কয়েকটি বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, নিরাপদ ও বিশুদ্ধ পানির তেমন ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীরা পাইপলাইন থেকে পানি সংগ্রহ করে পান করছে। কয়েকজন শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা বললে জানায়, তারা কেউ সকালে নাস্তা করে আসেনি।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ আর অভিভাবকদের উদাসীনতায় শিক্ষার্থীরা না খেয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছে বলে জানান উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সফিউল আলম তালুকদার। তিনি বলেন, প্রতিটি বিদ্যালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সেখানে লেখা আছে, শিক্ষকরা প্রাইভেট পড়াতে পারবেন না। বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখতে হবে। অভিভাবকরা যদি সচেতন হন, তাহলে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা ডা. সিরাজুল ইসলাম মানিক বলেন, শিক্ষার্থীরা না খাওয়ায় ও গরমে রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণ কমে যায়। এতে হিস্টোরিয়া রোগে আক্রান্ত হচ্ছে।