কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন সময়ের যৌক্তিক দাবি

সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ
সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

বাংলাদেশ তথা বাংলাভাষাভাষি অঞ্চলের একটি সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ জনপদ কুমিল্লা। অনুমান করা যেতে পারে যে, প্রাগজ্যোতিষের পূর্বের অঞ্চল কিরাতসের অংশ নিয়েই আজকের কুমিল্লা জেলা গঠিত হয়েছে। যা পরবর্তীতে সমতট অঞ্চল হিসেবে নামকরণ হয়েছিল এবং সমতটের প্রাণকেন্দ্র বা রাজধানী ছিল বর্তমান কুমিল্লা। ষষ্ঠ শতক থেকে বারো শতক পর্যন্ত বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী ও বর্তমান ত্রিপুরা জেলা ছিল সমতটের অন্যতম অংশ। এক সময় এ জনপদের পশ্চিমসীমা চব্বিশ পরগনার খাড়ী পরগনা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব তীর থেকে শুরু করে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত সমুদ্রকূলবর্তী অঞ্চলকেই সম্ভবত বলা হতো সমতট। কুমিল্লা নগরীর ১২ কিলোমিটার পশ্চিমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে দেবিদ্বার উপজেলার বড়কামতা সমতটের রাজধানী ছিল। যা বর্তমানে একটি গ্রাম মাত্র।

হাজার হাজার বছরের প্রাচীন কুমিল্লা জেলা ভৌগোলিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সকল দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এ জেলাকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পর্যায় থেকে গুরুত্ব দেয়া হয়ে থাকে। সপ্তম শতাব্দি থেকেই কুমিল্লা অঞ্চল ছিল শিক্ষা-দীক্ষা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ এলাকা। ওই সময় কুমিল্লার কোটবাড়ীতে শালবন বিহারসহ বেশ কয়েকটি জ্ঞানালয় গড়ে ওঠে। যা ছিল ওই সময়ে বিশ্ব বিখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে জ্ঞান অর্জনের জন্য এখানে ছুটে আসতেন পন্ডিতেরা।

বৃটিশ আমলেও কুমিল্লাকে প্রাধান্য দেয়া হত। ফলে বৃটিশরা এ অঞ্চলের গুরুপূর্ণ জেলা হিসেবে কুমিল্লাকে বিবেচনা করত। সে কারণে এখানে তারা বিমানবন্দর, সেনানিবাসনহ বহু প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছে। বৃহত্তর চট্টগ্রাম বিভাগে ওই সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য মাত্র ৩টি কোতয়ালি থানা স্থাপন করে বৃটিশরা। যার একটি কুমিল্লায়, বাকি দুইটির একটি চট্টগ্রাম ও অপরটি সিলেটে।

আজ থেকে প্রায় ১৩৫ বছর আগে ১৮৯০ সালে কুমিল্লা মিউনিসিপেলিটি (পৌরসভা) স্থাপিত হয়। যা এখন কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন। ১৮৯০ এর দশকে এই অঞ্চলে মাত্র ৪টি পৌরসভা স্থাপন করা হয়। অপরগুলো হল ঢাকা, চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ। ১৮২১ সালে তৎকালীন ত্রিপুরা বর্তমান কুমিল্লা থেকে আলাদা করে ভুলুয়া নামে নোয়াখালী অঞ্চলকে নিয়ে জেলা স্থাাপন করা হয়।

বৃটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী নোয়াখালী অঞ্চলসহ মিলিয়ে ১৭৬৫ সালে কুমিল্লা জেলা প্রতিষ্ঠা করেন। তখন এ জেলার নাম ছিল ত্রিপুরা জেলা। ওই সময় বর্তমান ত্রিপুরার মান ছিল পার্বত্য ত্রিপুরা রা পার্বত্য টিপ্পেরা জেলা। কুমিল্লা-নোয়াখালী সমন্বয়ে অংশের সদর ছিল কুমিল্লা। পরবর্তীতে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর পাবর্ত্য ত্রিপুরা ভারতের সাথে সংযুক্ত হয়। তখনও এ অঞ্চলের নাম ত্রিপুরা থাকে। তবে এই অঞ্চলে ত্রিপুরা নামে কোন জায়গা না থাকায় ১৯৬০ সালে পাকিস্তান আমলে কুমিল্লা সদর এলাকার নাম কুমিল্লা অনুসারে এ অঞ্চলের নাম কুমিল্লা করা হয়।

তবে দুই/আড়াই হাজার বছর আগে সমতট রাজ্যের শাসনামল থেকে থেকেই বৃহত্তর নোয়াখালী ও কুমিল্লা অঞ্চলের (নারায়নগঞ্জের আড়াইহাজার উপজেলাসহ) সদর দপ্তর থাকে কুমিল্লা শহরে। কুমিল্লা থেকেই এ অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ ও উন্নয়ন কাজ করাা হত।

কুমিল্লা খাদ্য স্বয়ংসম্পন্ন একটি জেলা। প্রতি বছর গড়ে এ জেলায় দুই থেকে আড়াই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ধান জেলার চাহিদা মিটিয়ে উদৃত্ত থাকে। গড়ে দুই লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি মাছ চাহিদা মিটিয়ে উদৃত্ত থাকে। যা দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। শাক-সবজি ও তরি-তরকারীও এ জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যত্র সরবরাহ করা হয়।

কুমিল্লার খাদি পোষাক ও রসমালাই এ জেলার একটি নিজস্ব সত্তা। যা দেশ ও দেশের বাইরে সুনামের সাথে গৌরবময় অবস্থানে রয়েছে। বিদেশী রেমিটেন্সে কুমিল্লা দেশের শীর্ষ স্থানীয় জেলা। কুমিল্লা জেলা থেকে সর্বাধিক সংখ্যক লোক আন্তর্জাতিক অভিবাসন হয়েছে। যা দেশের মোট অভিবাসনের প্রায় ১১ দশমিক ১০ শতাংশ। জনশক্তি রফতানীতে এ জেলা এবছরও শীর্ষত্ব ধরে রেখেছে।

প্রগতিশীল জেলা হিসেবেও কুমিল্লার রয়েছে দৃঢ় অবস্থান। শিক্ষা-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের দিক থেকেও এ জেলা অগ্রভাগে রয়েছে। ভৌগোলিক কারণে কুমিল্লার যোগাযোগ ব্যবস্থা সর্র্বকালেই উন্নত ছিল এবং এখনো রয়েছে। এ জেলার উপর দিয়ে দেশের অর্থনৈতিক গেটওয়ে হিসেবে খ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ১১২ কিলোমিটার অংশ বয়ে গেছে। যা বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের মাঝে দৃঢ় সংযোগের সৃষ্টি করেছে।

ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে কুমিল্লার সাথে লক্ষীপুর-নোয়াখালীর দূরত্ব দুই থেকে আড়াই ঘন্টার পথ। আর ফেনী, ব্রহ্মণবাড়ীয়া, চাঁদপুরের সাথে দূরত্ব দেড় থেকে দুই ঘন্টার পথ। বৃহত্তর কুমিল্লা ও বৃহত্তর নোয়াখালীর ৬টি জেলার ৫টিই মূলত কুমিল্লার চারদিক বেষ্টিত। শুধুমাত্র লক্ষীপুর জেলা একটু দূরে। তবে তাও সুন্দর যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে।

তুলনা করলে, নোয়াখালীর সাথে ব্রাহ্মণবাড়ীয়ার দূরত্ব ৪ থেকে সাড়ে ঘন্টার, নোয়াখালীর সাথে চাঁদপুরের দূরত্বও একই। এ দুই জেলা থেকে নোয়াখালী যেতে কুমিল্লা নগরী হয়ে যেতে হয়। ফেনীর সাথে নোয়াখালীর দূরত্ব আর কুমিল্লার দূরত্ব প্রায় সমান। কেবলমাত্র লক্ষীপুরের দুরত্ব নোয়াখালীর সাথে দেড় থেকে দুই ঘন্টার পথ। যা ফেনীর সাথেও প্রায় একই।

মূলত কুমিল্লার সীমানা ঘেঁষে উত্তরে ব্রাহ্মণবাড়ীয়া জেলা, দক্ষিণ পশ্চিমে চাঁদপুর জেলা, দক্ষিণে নোয়াখালী জেলা এবং দক্ষিণ পূর্বে ফেনী জেলা অবস্থিত। কুমিল্লা আন্তর্জাতিক সীমান্তে অবস্থিত বলে ব্যবসা-বাণিজ্যসহ বিভিন্ন কাজে আন্তদেশীয় যোগাযোগ খুব সহজেই করা যায়। যোগাযোগ একটি বিবেচনার বড় অংশ বলে কুমিল্লা অবশ্যই বিভাগের অগ্রাধিকার পাবার ন্যায্য অধিকার রাখে।

ষাটের দশকে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন নিয়ে বৃহত্তর গণ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। কুমিল্লায় বিভাগ প্রতিষ্ঠার যৌক্তিকতা ও গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদেও উথ্থাপিত হয় বলে জানা গেছে। ১৯৯৪ সালে শেখ হাসিনা ঢাকা থেকে রেল যোগে চট্টগ্রাম গণসংযোগে যাবার সময় কুমিল্লা রেল স্টেশনের পথসভায় বলেছিলেন আওয়ামীলীগ ক্ষমতায় গেলে কুমিল্লাকে বিভাগ করা হবে। এর ২ বছর পর ১৯৯৬ সালে ও ২০০৮ সাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার আগে ২০২৪ সালের ৫ আগষ্ট পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার পরেও কুমিল্লা বিভাগ হয়নি। ফলে বাস্তবায়ন হয়নি শেখ হাসিনার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রাখেন নি। বরং কুমিল্লাকে নিন্দা করে অমর্যাদামূলক কথা বলে হেয় করেছেন। যা একজন সরকার প্রধানের জন্য অশোভনীয়। কুমিল্লাকে তিনি ‘কু’ বলে নিন্দা করেছেন। এর ফলে কুমিল্লাবাসী তার প্রতি বিরক্ত হয়েছেন।

২০১৫ সালের ২৬ জানুয়ারী মন্ত্রী পরিষদ সভায় ‘কুমিল্লা বিভাগ’ বাস্তাবয়নের নীতিগত সিদ্ধান্তও নেয়া হয়। এরপর ২০১৫ সালের ৪ মার্চ জাতীয় সংসদে প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের স্বার্থে কুমিল্লা বিভাগ বাস্তাবায়নের ঘোষণা দেয়া হয়। একই সাথে ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরকেও বিভাগ করার সিদ্ধান্তের কথা সংসদকে জানানো হয়। প্রায় একই সময়ে ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ হয় কিন্ত শেখ হাসিনার বিমাতাশূলভ মনোভাবের কারণে কুমিল্লা বিভাগ হয় না। এরপর থেকে ময়নামতি/মেঘনা নামে বিভাগ দেয়ার কথা বললে কুমিল্লাবাসী তা প্রত্যাখ্যান করে।

বিভাগ প্রতিজনসংখ্যা এবং সংসদ সদস্যের সংখার দিক থেকে বিচার করলেও কুমিল্লা অঞ্চলকে বিভাগ করা যুক্তিসংঘত। চট্টগ্রামে ১৬ জন সংসদ সদস্য, কক্সবাজারে ৪ সংসদ সদস্য, রাঙ্গামাটি ১ জন সংসদ সদস্য, খাগড়াছড়ি ১ জন সংসদ সদস্য, বান্দরবান ১ জন সংসদ সদস্যসহ সাবেক চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের এ ৫ জেলায় সংসদ সদস্যের সংখ্যা ২৩ জন। বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের কুমিল্লায় ১১ জন সংসদ সদস্য, নোয়াখালী ৬ জন সংসদ সদস্য, ব্রাহ্মণবাড়ীয়া ৬ জন সংসদ সদস্য, চাঁদপুর ৫ জন সংসদ সদস্য, লক্ষীপুর ৪ জন সংসদ সদস্য ফেনী ৩ জন সংসদ সদস্যসহ বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালীর ৬ জেলায় সংসদ সদস্যের সংখ্যা ৩৫ জন। এর মধ্যে বৃহত্তর কুমিল্লার তিন জেলায় ৩ জেলায় ২২ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। জনসংখ্যার দিক দিয়ে ২০১১ সালের গণনা অনুযায়ী সাবেক চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামে মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ১৮ লাখ ৪১ হাজার। বৃহত্তর কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চলের জনসংখ্যা ১ কোটি ৭৬ লাখ ৩৮ হাজার ৯৬৩ জন। এর মধ্যে বৃহত্তর কুমিল্লার জনসংখ্যা ১ কোটি ১০ লাখ ৪৩ হাজার ৩৮৬ জন (জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে শুধু কুমিল্লার জনসংখ্যাই ৬৫ লাখেরও বেশি) এবং বৃহত্তর নোয়াখালীর জনসংখ্যা ৬৫ লাখ ৯৬ হাজার ৫৭৭ জন। বাংলাদেশে অনেক বিভাগ এর চেয়েও কম জনসংখ্যায় এবং কম সংসদ সদস্য নিয়ে গড়ে ওঠেছে। জনসংখ্যা এবং সংসদ সদস্যের দিক থেকে বিচার করলেও কুমিল্লা বিভাগ সময়ের বাস্তব ও ন্যায্য দাবি। চট্টগ্রাম বিভাগের ৩৩ দশমিক ৯০৪ বর্গ কিলোমিটার আয়তনে রয়েছে ১১টি জেলা ২টি সিটি কর্পোরেশন, একশতটি উপজেলা, ৬১ পৌরসভা, ১২০টি থানা, ৯৪৬টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত বিশাল বিভাগ। যা একজন কমিশনারের পক্ষে নিয়ন্ত্রণে রাখা খুবই কষ্টকর। সবচেয়ে বড় বিষয় এটি উন্নয়নেরও অন্তরায়। সেই সাথে এত বড় বিভাগ সামলাতে নানা সিষ্টেম লসে সরকারের আর্থিক ব্যয়ও বড়ে। কুমিল্লাকে বিভাগ করলে ওই ব্যয় কমে আসবে। দেশে এখন ১১টি জেলা নিয়ে আর কোন বিভাগ নেই। প্রশাসনিক বিকেন্দ্রিকরণের স্বার্থে বড় বড় বিভাগগুলোকে বিভক্ত করা হয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে এখন কুমিল্লাকে বিভাগ করা উচিৎ। যা বর্তমান সময়ের দাবি, জনদাবি বা গণবাদিতে পরিণত হয়েছে। তা না হলে এ অঞ্চলের উন্নয়নমুখী মানুষের প্রতি অন্যায় করা হবে। সৃষ্টি হবে চরম বৈষম্যের। যার থেকে ক্ষোভ সৃষ্টি হয়ে একদিন চরম আকার ধারণ করতে পারে বলে বিষেশজ্ঞরা মনে করেন। শক্ত প্রশাসনিক কাঠামো বিনির্মাণ, সুষম উন্নয়ন বন্টন, সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে জনগণের দোর গোড়ায় রাষ্ট্রীয় সেবা পৌঁছে দিতে কুমিল্লাকে বিভাগ প্রতিষ্ঠা জরুরী। যা বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশে রূপান্তরে অনেক ভূমিকা রাখবে। কুমিল্লাকে বিভাগ প্রতিষ্ঠার মত যোগ্যতা বহু অগেই অর্জিত হয়েছে এ জেলার। কুমিল্লায় সিটিকর্পোরেশন স্থাপিত হয়েছে। এখন কুমিল্লা মেট্রোপলিটন সিটি হবার প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এখানে জাতীয় ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় এবং কুমিল্লা-নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে গঠিত আঞ্চলিক অর্ধশতাধিক সরকারী-বেসরকারী দপ্তর রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমী (বার্ড), বাংলাদেশ সার্ভে ইন্সটিটিউট, বাংলাদেশ সমবায় একাডেমী, সেনানিবাস, বিমান বন্দর, ইপিজেড, বিবির বাজার স্থলবন্দর, বিসিক শিল্প নগরী, মৎস অধিদপ্তর চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) বিভাগীয় কার্যালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালকের কার্যালয়, পাট গবেষণার বিভাগীয় কার্যালয়, হাইওয়ে পুলিশ এর পুর্বাঞ্চলীয় সদর দপ্তর, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বিভাগীয় কার্যালয়, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় আঞ্চলিক পরিদর্শকের কার্যালয়, কৃষি ব্যাংক বিভাগীয় কার্যালয়, কর বিভাগ, কাস্টমস, ভ্যাট বিভাগের কুমিল্লা ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক কার্যালয়, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর আঞ্চলিক নির্বাচন অফিস, পরিবেশ অধিদপ্তর, কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অধিদপ্তর, প্রধান প্রকৌশল অধিদপ্তর পানি উন্নয়ন বোর্ড, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, প্রধান প্রকৌশলীর অধিদপ্তর বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ড, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের চট্টগ্রাম বিভাগীয় দপ্তর, আরইবি এর আঞ্চলিক দপ্তর, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রকৌশলীর দপ্তর বৃহত্তর নোয়াখালী ও বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চল, আনসার ভিডিপি রেঞ্জ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর কুমিল্লা অঞ্চল, বিজিবি কুমিল্লা রেঞ্জ, ন্যাশনাল ওরাল রিহাইড্রেশন প্রজেক্ট এর চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগীয় অঞ্চলের প্রধান কার্যালয়, জেনারেল পোষ্ট অফিস, আঞ্চলিক উপপরিচালকের কার্যালয় প্রাশমিক গণশিক্ষা, আঞ্চলিক উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বোর্ড, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের আঞ্চলিক অফিস, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, কুমিল্লা বেতার কেন্দ্র, কেন্দ্রিয় কারাগার। কুমিল্লাকে বিভাগ করলে এ দপ্তরগুলোর মধ্যে অনেকগুলোই নতুন করে স্থাপন করতে হবেনা। এ ছাড়াও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দিক থেকে কুমিল্লার রয়েছে গৌরবোজ্জল অবস্থান। এখানে একটি পাবলিকসহ ৪ টি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে তা হল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, বৃটানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ অর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সাইন্স এন্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি), সিসিএন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি মেডিকেল কলেজসহ ৫টি মেডিকেল কলেজ রয়েছে কুমিল্লায়। এগুলো হল কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ, ইষ্টার্ণ মেডিকেল কলেজ, ময়নামতি মেডিকেল কলেজ, সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ, আর্ম ফোর্সেস মেডিকেল কলেজ। আরো রয়েছে মেডিকেল এসিটেন্ট ট্রেনিং সেন্টার (ম্যাটস), একটি সরকারীসহ ৪ টি নার্সিং ইন্সটিটিউট, টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, সরকারী পলিটেকনিক ইন্সটিটিউট, টেকনিকেল ট্রেনিং সেন্টার, ক্যাডেট কলেজসহ অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। জনশ্রুতি আছে ১৬৬৬ সালে মোগল আমলে চট্টগ্রাম বিভাগ স্থাপনের সময় ওই বিভাগের সদর দপ্তর করার কথা ছিল কুমিল্লায়। সিলেট ও চট্টগ্রামের মাঝখানে কুমিল্লা অবস্থিত বলে জনগনের যোগাযোগের সুবিধার কারণে এখানে বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থাপনের যৌক্তিকতা বিচার করে এখানেই সদর দপ্তর স্থাপনের সিদ্ধান্ত ছিল। যাতে সম্মতি ছিল সিলেট এবং নোয়াখালী অঞ্চলের জনগণেরও। পরবর্তীতে নানা যোগাসাযশে এটিকে চট্টগ্রামে নেয়া হয়। পরে বৃটিশরা দেশ দখলের পর ১৮৬০ বৃহত্তর কুমিল্লা, নোয়াখালী ও সিলেট অঞ্চল নিয়ে কুমিল্লায় ত্রিপুরা বিভাগ নামে বিভাগীয় সদর দপ্তর স্থাপানের পরিকল্পনা করে। কিন্তু পরবর্তীতে তা আর হয়ে উঠেনি। এরপর থেকেই কুমিল্লা বিভাগ স্থাপনের দাবি উঠে, যা ১৯৪৭ এর পরে জোড়ালো হয় হতে থাকে। ১৯৬৪ থেকে এ দাবি জানানো হয় সরকারের উচ্চ মহলে। পরে ১৯৯০ সালে থেকে অ্যাডভোকেট মোখলেসুর রহামন চৌধুরী কুমিল্লা সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দকে নিয়ে কুমিল্লা বিভাগসহ ১৪ দফা দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন। তিনি নিজের পকেটের টাকা খরচ করে লিফলেট ব্যানার তৈরি করেন। কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, ঢাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় কুমিল্লা বিভাগ আন্দোলনের কমিটি গঠন হয়। পরে এ দাবিতে কুমিল্লা শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতারা সম্পৃক্ত হন। ওই সময় মানবন্ধন, সড়ক, রেলপথ অবরোধসহ নানান বড় বড় কর্মসূচি পালন করা হয়। সময়ের প্রয়োজনে কুমিল্লা নামেই কুমিল্লা বিভাগ বাস্তবায়ন এখন গণদবিতে পরিণত হয়েছে। এ গণদবির প্রেক্ষিতে দীর্ঘ প্রায় চার দশক ধরে আন্দোলন করে আসছে বৃহত্তর কুমিল্লাবাসী। বৃহত্তর এ অঞ্চলের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর প্রণের দাবি কুমিল্লা নামেই কুমিল্লা বিভাগ এবার বাস্তবে রূপ নেবে বলে কুমিল্লাবাসী আশায় বুক বেধেছে।

তথ্যসূত্র- ভারতীয় ইতিহাস, ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানী, প্রাচীন বাংলার ইতিহাস, প্রাচীন বঙ্গ ও নিজস্ব অনুসন্ধান

 

লেখক – সাইয়িদ মাহমুদ পারভেজ সাংবাদিক, কবি, ছড়াকার ও লেখক।