তুহিন হত্যার বিচার ও আসামীদের গ্রেফতারের দাবিতে উত্তাল বুড়িচং
# ঘুষ খেয়ে ও প্রধান খুনির সাথে সখ্যতার কারণে ওসি হত্যাকারীদের পালাতে সাহায্য করেছে – পরিবার
# ওসির প্রথম দিন মামলা না নেওয়ার কারণ কি ছিল জানতে চায় – এলাকাবাসী
# বুড়িচং থেকে ওসিকে প্রত্যাহার করার দাবি জানান বক্তারা
# একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে পাগলপারা মা
#৯ দিনেও আসামি গ্রেফতার না হওয়ায় ক্ষোভ এলাকাবাসীর
#আসামীদের গ্রেফতার করতে দিনরাত এক করে কাজ করছি-ওসি
মোস্তাফিজুর রহমান।।
বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজের মেধাবী ছাত্র তুহিনের জন্য কাঁদছে পুরো বুড়িচংবাসী। কাঁদছে তার পরিবার ও সঙ্গী সাথীরাও। একই সাথে ঘটনার ৯ দিনেও আসামীদের গ্রেফতার করতে না পারা ও আসামীদের সাথে যোগসাজসের অভিযোগ এনে বুড়িচং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার অপসারণ দাবি করছেন বুড়িচং উপজেলাবাসী ও নিহতের পরিবার।
জানা যায়, পূর্ববিরোধের জেরে কুমিল্লার বুড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজের মেধাবী ছাত্র তুহিনকে (১৯) অপহরণ ও কুপিয়ে হত্যার পর একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে অনেকটা পাগলপারা মা ফেরদৌসী আক্তার। সকলের মাঝে খুঁজে বেড়ান নিজের সন্তান তুহিনকে। প্লেটে ভাত বেড়ে ডাকছেন বাবা আয় ভাত খাবি না? আমার তুহিন কেন আসছে না। আমার তুহিন কোথায়? আমার তুহিন কথা বলছে না কেন? কি অপরাধ করেছে আমার তুহিন? মায়ের এই আহাজারি আর আর্তনাদে কাঁদছে পুরো বুড়িচং উপজেলাবাসী। হত্যারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ছাড়া মায়ের এই আর্তনাদ যেন কোন ভাবেই থামবে না।
অপরদিকে,পরিবার জানিয়েছেন, তুহিনকে কুপিয়ে আহত করার দিনই থানায় মামলা করতে যায় নিহত তুহিনের মা। কিন্তু মামলা গ্রহন করেনি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা। দ্বিতীয় দিন নানা মহলের চাপে মামলা নিতে বাধ্য হয় ওসি। এই সুযোগে আসামীরা এলাকা ছেড়ে দেয়। এমনকি মামলার নেয়ার পরেও নানা টালবাহানা করার অভিযোগ ছিল বুড়িচং থানার ওসি মোহাম্মদ আজিজুল হকের বিরুদ্ধে। পরিবারের পক্ষ থেকে শুরুতেই প্রধান আসামী আওয়ামী নেতা সাইফুল ইসলাম বাবুর সাথে ওসি আজিজুলের যোগসাজসের কথা বলে আসছে তারা। আসামী বাবুর ব্যক্তিগত ফিসারিজে ওসির যাতায়তের অভিযোগও রয়েছে অনেকের। এমনকি যে দিন তুহিন মারা যায়, সেদিন তুহিনের পরিবার দৈনিক কুমিল্লার জমিনকে জানিয়েছেন, ওসি আজিজ প্রধান খুনিকে দেশের বাহিরে পাঠানোর ব্যবস্থা করতেছে। গতকাল বুধবার মানববন্ধনে উপস্থিত বক্তারা , তুহিন হত্যাকারীদের সাথে ওসি আজিজের সখ্যতা রয়েছে উল্লেখ করে অবিলম্বে তার অপসারণ দাবি করছেন।
এলাকাবাসী জানায়, নিহত তুহিন বুড়িচং উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের বাহেরচর গ্রামের মোসলেম উদ্দিনের ছেলে। মা ফেরদৌসী আক্তার। তুহিন তাদের একমাত্র ছেলে। পরপর দুটো সন্তান হারানোর পর বাবা মায়ের শোক মুছতে জন্ম নেয় তুহিন। কে জানতো সাইফুল ইসলাম বাবু, মো. নাফিজ উদ্দিন, মো. জহির, আবদুল আলিমের মতো সন্ত্রাসীর জন্য আবারো তুহিনের বাবা মায়ের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসবে!
সব চেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, যেই নিহাকে নিয়ে ঘটনার সূত্রপাত সেই নিহা আর তার স্বামী নিরাপদ কিন্তু বিনা অপরাধে একবুক যন্ত্রণা নিয়ে পৃথিবী থেকে চলে গেলো তুহিন।
ঘটনার সূত্রপাত :
নিহার বাবা আওয়ামীলীগ নেতা সাইফুল ইসলাম বাবু তুহিন হত্যার প্রধান আসামি। নিহা একটি ছেলেকে নিয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করে । বিয়ে করার পর নিহা লাইভে এসে বলেছে , বাবা আমি আমার সুখের জন্য চলে এসেছি। আমাকে খুঁজাখুঁজি করে কোন লাভ নাই। আমি ছাড়াও তোমার আরো তিনটি সন্তান আছে, তুমি তাদেরকে ভালো করে দেখাশোনা করো। আমাকে খুঁজে টাকা নষ্ট করার দরকার নেই। আমি চলে আাসার পেছনে কারোর হাত নেই। আমি আমার নিজের ইচ্ছায় বাড়ি থেকে বের হয়ে আসছি।
কিন্তু নিহার বাবা বাবু নিহত তুহিনকে পালিয়ে যাওয়া ছেলের বন্ধু সন্দেহ করে গত ২০ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার রাতে শ্রীপুর গ্রামের একটি স্থান থেকে একদল সন্ত্রাসী জোরপূর্বক অপহরণ করে গাড়িতে তুলে নেয়। এরপর তাকে একটি নির্জন স্থানে নিয়ে গিয়ে লোহার রড ও পাইপ দিয়ে এলোপাতাড়ি পেটানো হয়। এই নির্মম নির্যাতনে তুহিনের হাত-পা ভেঙে যায় এবং সে মারাত্মকভাবে আহত হয়।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কুমিল্লায়, পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়েছিল। ঘটনার পরপরই তার মা অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বুড়িচং থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে, টানা পাঁচ দিন লাইফ সাপোর্টে থাকার পর গত ২৭ অক্টোবর সোমবার সকালে তুহিন মা-রা যান। এবং গতকাল বুধবার সকালে তুহিনের নিজ এলাকা পীরযাত্রাপুরের বাহেরচর গ্রামে জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। নামাজে জানাযায় বুড়িচং উপজেলা নির্বাহী অফিসারসহ হাজার হাজার মুসল্লীগণ উপস্থিত ছিলেন। এরপর নিজ এলাকার কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
এ ঘটনায় গত ২০ অক্টোবর তুহিনের মা ফেরদৌসী আক্তার বাদী হয়ে চারজনের নাম উল্লেখ করে আরও চারজনকে অজ্ঞাত আসামি করে বুড়িচং থানায় অভিযোগ করেন। অভিযুক্তরা হলেন- উপজেলার গোবিন্দপুর গ্রামের মো. সাইফুল ইসলাম বাবু (৪৫), মো. নাফিজ উদ্দিন (১৯), শ্রীপুর গ্রামের মো. জহির (৪২), আবদুল আলিম (৪৫)।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার নয় দিন পার হলেও এখন পর্যন্ত কোনো আসামি গ্রেপ্তার না হওয়ায় উদ্বিগ্ন তুহিনের পরিবার এবং এলাকাবাসীর।
তুহিনের মা ফেরদৌসী আক্তার জানান, তার ছেলে বড়িচং এরশাদ ডিগ্রি কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র ছিল। পূর্ববিরোধের জেরে অভিযুক্তরা দীর্ঘদিন ধরে তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে আসছিল। গত ২০ অক্টোবর রাত সাড়ে ৮টায় উপজেলার পীরযাত্রাপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর গ্রামের কামাল মিয়ার বাড়ির সামনে থেকে তুহিনকে একটি গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। এরপর অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম বাবুর গোবিন্দপুর পূর্ব পাশের বিল্ডিং ঘরে নিয়ে গিয়ে লোহার রড ও এসএস পাইপ দিয়ে মারধর করা হয়।
আসামী না ধরার বিষয়ে জানতে চাইলে বুড়িচং থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ আজিজুল হক বলেন, ভাই বিশ্বাস করেন, আমরা দিনরাত এক করে চেষ্টা করছি আসামীদের গ্রেফতার করতে। এ ঘটনার পরে ঠিক মতো খাবার খাওয়ার সময়টাও পাই নাই। কিন্তু মানুষ আমাদেরকে নিয়ে কত মন্তব্য করে। আপনি বিশ্বাস করবেন