রবিবার, ৮ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং | ২৪শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ
ঢাকায় ৮ তলার ওপর ভবন অনুমোদন না দেয়ার পরিকল্পনামাইগ্রেনের যন্ত্রণা কমায় গাঁজা : গবেষণাজন্ম থেকেই ব্যাটম্যান!পাকিস্তানে মসজিদ থেকে লাখ টাকা দামের জুতা চুরি!ক্ষুধার জ্বালায় মাটি খেত শ্রীদেবীর ৬ সন্তান, এগিয়ে এল সরকারসুদানের ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ২৩উষ্ণতম বছরের তালিকায় এক নম্বর ২০১৯চার্জে রেখে মোবাইল ব্যবহারের সময় বিদ্যুতায়িত হয়ে মৃত্যুশক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে উঠল চিলিবিশ্বের সবচেয়ে বড় রক্তাক্ত উৎসব নেপালের গাধিমাইভারত হিন্দু রাষ্ট্র!অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানলজলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় ৭ম বাংলাদেশবিয়ের আগে যৌন মিলন, বেত্রাঘাতে জ্ঞান হারালেন যুবকভারতে অনলাইনে ওষুধ বিক্রি বন্ধে আদালতের নির্দেশদিল্লিতে কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, নিহত ৩৫মহাসাগরে বিপদ : দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে অক্সিজেন বাড়ছে তাপমাত্রাকুমিল্লায় বাড়ির ছাদ থেকে পড়ে ৫ সন্তানের জননী নিহতআজ কুমিল্লা মুক্ত দিবসশাসন শোষণ নীপিড়ন থেকে মুক্তি চায় ডিপ্লোমা কৃষিবিদরা

বুয়েটে ভিসির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠক : ছাত্র-শিক্ষক রাজনীতি নিষিদ্ধ আবরার হত্যাকাণ্ড : এজাহারভুক্ত ১৯ আসামি সাময়িক বহিষ্কার * তাৎক্ষণিক পাঁচ দাবি বাস্তবায়নে নোটিশ ইস্যু, অন্যথায় আন্দোলন চলবে, ভর্তি পরীক্ষা হবে না * ভিসির দুঃখপ্রকাশ * মামলার ব্যয় বহনসহ পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে * পঞ্চম দিনেও প্রতিবাদে উত্তাল বুয়েট

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বুয়েট) ছাত্র ও শিক্ষকদের সব রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি আবরার ফাহাদ হত্যায় এজাহারভুক্ত ১৯ আসামিকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে বুয়েট থেকে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর দোষী সাব্যস্ত হলে তাদের স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা হবে। হত্যা মামলা

শুক্রবার আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বৈঠকে ভিসি অধ্যাপক সাইফুল ইসলাম এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান। এ সময় তিনি আবরার হত্যার পর নিজের ‘কিছু ঘাটতি’র জন্য শিক্ষার্থীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলনের মুখে খুনের ৫ দিনের মাথায় এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হল।

তবে ভিসির এসব আশ্বাসে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি সন্তুষ্ট না হওয়ায় তারা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। রাত সাড়ে ১০টার দিকে এক সংবাদ সম্মেলনে তারা জানান, আবরার হত্যায় জড়িতদের সাময়িক বহিষ্কার, ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ও পরিবারকে ক্ষতিপূরণসহ পাঁচ দফা দাবি বাস্তবায়নে নোটিশ দিতে হবে। অন্যথায় ১৪ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় ভর্তি পরীক্ষা হবে না। অব্যাহত থাকবে ১০ দফা আদায়ের আন্দোলন।

এদিকে বিকাল ৫টায় ভিসির সঙ্গে বৈঠকের আগে আবরার হত্যার প্রতিবাদে শুক্রবার ছুটির দিনেও বুয়েটের শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেন। বেলা ১১টার পর বুয়েটের শহীদ মিনারে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা সমবেত হন। পরে দুপুর ১২টার দিকে সংবাদ সম্মেলন করেন তারা।

এরপর আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। তাদের মিছিল-স্লোগানে উত্তাল হয়ে উঠে ক্যাম্পাস। এছাড়া প্রতিবাদী বিতর্ক, ৩৭টি দেয়ালে গ্রাফিতি অঙ্কন এবং সড়ক অবরোধ কর্মসূচিও পালন করেন তারা।

এছাড়া দেশের বিভিন্ন স্থানে শোকাহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করেছেন। ওই সব কর্মসূচি থেকে তারা হত্যাকারীদের ফাঁসি দাবি করেন।

আবরারের পরিবারের আয়োজনে শুক্রবার কুষ্টিয়ায় কুলখানি অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে আবরারের বন্ধু, স্বজন, আত্মীয় এবং গ্রামবাসী যোগ দেন। এদিন আবরারের মা বলেছেন, আর কোনো মায়ের বুক যেন খালি না হয়। আর বাবা বলেছেন, সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে যেন খুনের বিচার হয়।

আবরার খুনের ব্যাপারে শুক্রবারও কথা বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। তিনি বলেন, এ খুনের ঘটনায় নিখুঁত চার্জশিট দেয়া হবে। বুয়েট প্রশাসন আরেকটু সতর্ক থাকলে হয়ত আবরার হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা নাও ঘটতে পারত।

৫ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস দেয়ার জেরে আবরার ফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে ছাত্রলীগের কিছু নেতাকর্মী। এ ঘটনায় করা মামলার ১৯ আসামির মধ্যে ১৪ জনসহ ১৮ জনকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত দু’জন জবানবন্দি দিয়েছেন।

বৈঠকে যা হল : পূর্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুয়েট মিলনায়তনে বিকাল ৫টায় ভিসির সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বেলা সাড়ে ৩টা থেকে শিক্ষার্থীরা লাইন ধরে পরিচয়পত্র দেখিয়ে প্রবেশ করেন। এতে আন্দোলনরত চারটি ব্যাচের প্রায় ৩ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নেন।

আগেই সরবরাহ করা বিশেষ পরিচয়পত্র দেখে প্রবেশ করতে দেয়া হয় সাংবাদিকদের। বুয়েটের ছাত্রকল্যাণ পরিচালক (ডিএসডব্লিউ) অধ্যাপক মিজানুর রহমান, শিক্ষক সমিতির সভাপতি একেএম মাসুদ, কয়েকজন ডিন ও হলের প্রভোস্টরা সভায় উপস্থিত ছিলেন।

মঞ্চে ছিলেন ভিসিসহ ৭ জন। বিকাল ৫টা ২১ মিনিটে মিলনায়তনে প্রবেশ করেন ভিসি। মঞ্চে উঠার আগে তিনি শিক্ষকদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপ করেন। সাড়ে ৫টায় সভা শুরু করেন বুয়েটের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার অধ্যাপক সাইদুর রহমান।

বক্তৃতার শুরুতেই তিনি আবরার হত্যার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান এবং তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন। পাশাপাশি আবরারের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেন।

এরপর তিনি আবরারের স্মরণে শোকপ্রস্তাব করেন এবং সবাই দাঁড়িয়ে ১ মিনিট নীরবতা পালন করেন।

৫টা ৩৭ মিনিটে ভিসি বক্তৃতা শুরু করেন। কিন্তু বেসরকারি টেলিভিশন সরাসরি সম্প্রচার করছে- এমন আওয়াজ তোলেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। ওই সময় ভিসির বক্তৃতা ৩ মিনিটের মতো বন্ধ থাকে। ৫টা ৪০ মিনিটে তিনি পুনরায় বক্তৃতা শুরু করেন।

মূলত শিক্ষার্থীদের উত্থাপিত ১০ দফার ওপর জবাব দেন। এর আগে বুয়েটের ডিএসডব্লিউ বক্তব্য রাখেন। এ সময় তিনি বলেন, আবরার হত্যার বিচারের জন্য আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে ভিসি বলেন, তোমাদের ১০ দফা দাবি আমি আগেই নীতিগতভাবে মেনে নিয়েছি। এখন দাবিগুলো বাস্তবায়নে কী কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে তা বলছি। ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষকের কাছে সন্তানের সমান।

তোমাদের নিজের সন্তান হিসেবে গণ্য করি। তোমাদের প্রতি আমার ভালোবাসা-আন্তরিকতার কমতি ছিল না; এখনও নেই। আবরার ফাহাদ খুনের পর কিছু কাজ করতে গিয়ে কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমার ঘাটতি ছিল।

পিতৃতুল্য হিসেবে আমি তোমাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তিনি আরও বলেন, আবরার আমার সন্তানের মতো ছিল। তোমাদের যেমন কষ্ট লাগছে তার মৃত্যুতে আমারও অনেক খারাপ লেগেছে। এটি আমি মেনে নিতে পারিনি।

তার মৃত্যুতে দুঃখ তোমরা যেমন পেয়েছ, আমিও পেয়েছি। আমরা সবাই মর্মাহত। তিনি বলেন, খুনিদের সর্বোচ্চ শাস্তির ব্যাপারে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে কথা বলেছি। শাস্তি নিশ্চিতের ব্যাপারে আমি আশ্বাস পেয়েছি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সিসিটিভি ফুটেজ নিয়ে গেছে। যাদেরই এই খুনে সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যাবে তাদেরই গ্রেফতার করা হবে।

খুনিদের আজীবন বহিষ্কার সংক্রান্ত শিক্ষার্থীদের ২ নম্বর দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা সরাসরি করা হলে আদালতের মাধ্যমে তাদের ফিরে আসার সুযোগ থাকে। অতীতে এমন অনেক দৃষ্টান্ত আমি জানি। তাই এ ব্যাপারে প্রক্রিয়া গ্রহণ করতে হবে।

সেই অনুযায়ী ইতিমধ্যে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তারা কাজ করছেন। কমিটির প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যবস্থা নেয়া হলে সেটা আদালতেও গ্রহণযোগ্য হয়। তবে ১৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার করা হল। এ সংক্রান্ত ফাইলে আমি স্বাক্ষর করেছি।

পরে প্রশ্নোত্তর পর্বে এ ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ১৯ জনকে সাময়িক বহিষ্কার এখন (শুক্রবার) থেকে কার্যকর করা হল। তদন্ত রিপোর্ট পাওয়ার পর প্রক্রিয়া অনুযায়ী শৃঙ্খলা কমিটিতে যাবে। এরপর সিন্ডিকেট সভায় উঠবে।

সিন্ডিকেট সভা তাদের আজীবনের জন্য বহিষ্কার করবে। এ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করলে তারা মামলা করে হেরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এ সময় তার পাশে থাকা ছাত্রকল্যাণ পরিচালক বলেন, তদন্ত কমিটিকে ১০ দিনের সময় দেয়া আছে।

তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর দিনই শৃঙ্খলা কমিটির বৈঠক ডাকা হবে।

ক্ষতিপূরণ দেয়ার ব্যাপারে ভিসি বলেন, আবরারের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে এবং মামলার খরচ বুয়েট কর্তৃপক্ষ বহন করবে। তবে এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত চিঠি তৈরি করতে পারিনি। শিগগিরই নোটিশ করা হবে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি আরও বলেন, ক্ষতিপূরণ কী কী দিতে হবে, তা নিয়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে আলোচনা করে দেব। সরকারের টাকা দিতে হলে অনুমোদন লাগবে। এ বিষয়ে মন্ত্রী ও উপমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে।

মামলা দ্রুতবিচার আইনে সম্পন্ন করা সংক্রান্ত দাবি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটা যেহেতু আদালতের বিষয় তাই এ নিয়ে আমরা কিছু বলতে বা আশ্বাস দিতে পারছি না। তবে সরকারের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়েছে যে, বিচারকাজ দ্রুত সম্পন্ন করা হবে।

বিচারকাজ দ্রুত শেষ করতে সরকারকে চিঠি দেয়া হবে। বিচার সংক্রান্ত বিষয়ে তোমাদের নিয়মিত আপডেট জানানো হবে।

তিনি বলেন, মামলার চার্জশিট এখনও হয়নি। চার্জশিটের কপি পাওয়ার ব্যবস্থা নেয়া হবে এবং তা পাওয়ার পর তোমাদের জানানোর ব্যবস্থা নেব।

বুয়েটে ছাত্রদের সাংগঠনিক রাজনীতি নিষিদ্ধ করা সংক্রান্ত দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, আমি আমার প্রশাসনিক ক্ষমতাবলে বুয়েটে সব ধরনের সাংগঠনিক ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি। আজ (শুক্রবার) থেকে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ।

আমরা বিভিন্ন দলকে চিঠি পাঠাব, যাতে বুয়েটে তাদের কমিটি বিলুপ্ত করা হয়। তিনি বলেন, বুয়েটে সব ধরনের রাজনীতি (শিক্ষকসহ) বন্ধ থাকবে। এখন থেকে ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে কেউ জড়িত থাকলে ডিসিপ্লিনারি বোর্ডের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ের ওপর প্রশ্নোত্তর পর্বে ভিসি আরও বলেন, এখন থেকে বুয়েটে কোনো ছাত্র সংগঠনের কমিটি থাকবে না। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, বুয়েটে রাজনীতি থাকবে না। হল থেকে বহিরাগতদের বের করে দেয়া হবে।

শনিবার থেকে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেয়া হবে। হলে হলে তল্লাশি চালাতে সরকারকে অনুরোধ করেছি। বুয়েটে স্থায়ীভাবে রাজনীতি বন্ধ করা হল কিনা- ছাত্রদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চিরস্থায়ী আমরা কেউ না।

আমিও না, তোমরাও না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বুয়েটে শিক্ষক রাজনীতিও নিষিদ্ধ। তারাও রাজনীতি করতে পারবেন না। এ সময় ছাত্র রাজনীতির বিষয়ে ছাত্র কল্যাণ পরিচালক বলেন, ছাত্র সংগঠনের পদে থাকলে ক্ষমতার প্রভাব খাটায়।

রাজনীতি না থাকলে, কমিটি না থাকলে কেউ প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না। সবাই সমান কাতারে চলে আসবে। সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের বুয়েট কমটি বিলুপ্ত করার পদক্ষেপ নিচ্ছে। এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা হয়েছে।

আর যদি কেউ গোপনে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হয়, তখন তথ্য পেলে আইন অনুযায়ী শাস্তি পাবে। এ সময় শিক্ষার্থীরা ছাত্র কল্যাণ পরিচালকের বিরুদ্ধে রাজনীতির অভিযোগ আনলে তিনি বলেন, আমি একটি রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করি, যা নিয়ে গর্ব করি। তবে আমি আর ছাত্রলীগের অনুষ্ঠানে থাকব না।

বিগত দিনে র‌্যাগিংসহ নির্যাতনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার দাবি (৮ নম্বর) প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, বুয়েটে র‌্যাগিং বন্ধ হবে। বিগত দিনের নির্যাতনের ঘটনার বিচার হবে। কেননা, নির্যাতনের শিকার একজন শিক্ষার্থীকে এর ক্ষত আজীবন বহন করতে হয়।

এটা কোনো প্রক্রিয়ায় সেটা আমরা বের করব। এ ব্যাপারে তোমাদের সহযোগিতা চাইব। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে অভিযোগ করতে হবে। অভিযোগ গ্রহণের জন্য ছাত্রকল্যাণ পরিচালক কাজ করছেন। একটা ব্যবস্থা তৈরি করা হবে, যেখানে শিক্ষার্থীরা অভিযোগ জানাবে। তাতে পরিচয় গোপন থাকবে।

তিনি বলেন, হলগুলোয় র‌্যাগিংয়ের নামে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে দ্রুততম সময়ে তদন্ত কমিটি করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। এটা প্রতিরোধে এক সপ্তাহের মধ্যে ক্যাম্পাসের মধ্যে সিসিটিভি বসানো হবে। এ জন্য সময় দরকার।

প্রশ্নোত্তর পর্ব : ভিসির বক্তব্য শেষে শুরু হয় শিক্ষার্থীদের প্রশ্নোত্তর পর্ব। এ পর্বে শিক্ষার্থীরা বলেন, আমাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম চলতে পারে, একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। দাবি বাস্তবায়নে আপনাদের যতটুকু সময় দরকার আমরা দিতে রাজি আছি।

তার আগ পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা ও একাডেমিক কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে। আবরার খুনের বিচার না হওয়া পর্যন্ত নতুন করে শিক্ষার্থী ভর্তি করে তাদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়া যাবে না বলে দাবি করেন তারা।

এভাবে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিষয়ে ভিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ভিসি এবং তার সঙ্গে আসা প্রশাসনের অন্য শিক্ষকরা এর জবাব দেন।

ছাত্রদের প্রশ্নের জবাবে আবরার হত্যার ৩৮ ঘণ্টা পর ক্যাম্পাসে আসা ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বিরূপ আচরণের অভিযোগ প্রসঙ্গে ভিসি বলেন, এখানে তথ্যের একটি গ্যাপ তৈরি হয়েছিল।

আবরার হত্যার পর এ বিষয়ে পুলিশ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ, আলামত সংগ্রহের সুযোগ তৈরি করা, মন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া ও উপর মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যস্ত ছিলাম।

আবরারের আত্মীয়স্বজনেরা এলে লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্স ও বাসের ব্যবস্থা করে দেই। এরপর তারা লাশ নিয়ে চলে গেছেন বলে আমার ধারণা ছিল। কিন্তু লাশ যে বুয়েট ক্যাম্পাসে আনা হয়েছে সেই তথ্যের গ্যাপ থাকায় আমি আসতে পারিনি।

ভিসির বক্তব্যের পর বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি ড. একেএম মাসুদকে মাইক দেয়া হলে তিনি বলেন, মন্ত্রী মহোদয়ের সঙ্গে আমাদেরও বৈঠক হয়েছে। সেখানে ভিসিও ছিলেন। আমরা দেখেছি, আবরার হত্যার ঘটনায় সরকার অনেক পদক্ষেপ নিয়েছে।

তবে আমার অনুরোধ থাকবে, যারা আন্দোলন করেছে, সেসব শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে যেন কোনো পদক্ষেপ নেয়া না হয়। এ সময় ভিসি বলেন, আমরা সব ভুলে একসঙ্গে কাজ করব। তোমরা শিক্ষার্থীরা সব সময়ের জন্য সহযোগিতা করবে।

এ পর্যায়ে ছাত্র কল্যাণ পরিচালক বলেন, আন্দোলনের কারণে তোমরা কয়েকদিন পড়তে পারোনি। আগামী ১৯ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় পরীক্ষার রুটিনে পরিবর্তন আনা হবে। একাডেমিক কাউন্সিলে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে।

এভাবে প্রশ্নোত্তর পর্বে চলাবস্থায় সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে ভিসি বলেন, সমস্যা সমাধানে সবাই একসঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার নিয়ে এখানে এসেছি। তোমরা ১৪ অক্টোবরের ভর্তি পরীক্ষা সুন্দরভাবে করতে দাও।

তখন শিক্ষার্থীদের একজন বলেন, গত কয়েকবার আন্দোলনের পর আমাদের আশ্বাস দেয়া হলেও তা বাস্তবায়ন করা হয়নি। এবারের আশ্বাসের ওপর আমাদের আস্থা নেই। এক আবরার খুন হয়েছে। দশটা আবরার খুন হতে দিতে পারি না।

আরেক শিক্ষার্থী বলেন, আমাদের আন্দোলন চলছে, আন্দোলন চলবে। এ সময় শত শত শিক্ষার্থী করতালি দেয়।

এ সময় উপাচার্য তাদের কাছে থেকে আলোচনার জন্য কিছু সময় চান। পরে সভার মধ্যেই উপাচার্য উপস্থিত শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করেন। পরে আধা ঘণ্টা পর তিনি আবার যথাসময়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য সহায়তা চান।

ভিসি বলেন, আমি তোমাদের সকল দাবির সঙ্গে একমত। সরকারের বিভিন্ন মহলে গিয়ে এগুলো বাস্তবায়ন করেছি। আমি পিতা হিসেবে তোমাদের কাছে মিনতি করছি, তোমরা ভর্তি পরীক্ষাটা হতে দাও।

তখন শিক্ষার্থীরা বলেন, আগে ক্যাম্পাসে নিরাপদ পরিবেশ সৃষ্টি হোক। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে থাকা পদক্ষেপ বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষা বন্ধ থাকুক।

পরে মাইক নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন ড. মাহবুব আলম, ড. ইজাজ হোসেন ও ড. প্রাণ কানাই সাহা নির্ধারিত সময়ে ভর্তি পরীক্ষার পক্ষে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন।

এসব বক্তব্যের পর শিক্ষার্থীরা তাদের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে বলেন, আমাদের দাবি আদায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে যে ক্ষমতা রয়েছে তা প্রয়োগ না করা পর্যন্ত আন্দোলন চলবে, ভর্তি পরীক্ষা হবে না।

এরপর রাত ৮টা ৪ মিনিটে ভিসি মিলনায়তন ত্যাগ করেন। এর আগে তিনি বলেন, তোমরা আবার চিন্তা কর। আমার আবেদন বিবেচনা কর। তোমাদের অনেক দাবি মেনে নিয়েছি। বাকিগুলোর প্রসেস চলবে।

তোমাদের অসুবিধাগুলো নিয়ে শিক্ষক সমিতিসহ সবাইকে নিয়ে কাজ করব।

আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা : ভিসি অধ্যাপক ড. সাইফুল ইসলামের সঙ্গে বৈঠক চলাকালেই আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন। মিলনায়তন থেকে বেরিয়ে তারা সোজা চলে যান বুয়েট শহীদ মিনারের সামনে চৌরাস্তায়।

সেখানে রাস্তা দখল করে বসে প্রায় ৩০ মিনিট ধরে বিক্ষোভ করতে থাকেন। এ সময় তারা স্লোগান দেন- ‘ফাঁসি, ফাঁসি, ফাঁসি চাই, হত্যাকারীদের ফাঁসি চাই’; ‘খুনিদের ঠিকানা এই বুয়েটে হবে কেন?’; ‘আমার ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না’; ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাইরে’; ‘এক আবরার কবরে, লক্ষ আবরার বাইরে’; ‘ফাঁসি ছাড়া যাব না’; ‘স্থায়ী বহিষ্কার, বহিষ্কার, খুনিদের বহিষ্কার করো’।

৫ দফা বাস্তবায়ন না হলে ভর্তি পরীক্ষা নয় : রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। এতে তারা ১০ দফা থেকে ৫টি আলাদা করে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য তুলে ধরেছেন, যাতে কর্তৃপক্ষ ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারে।

এগুলো হচ্ছে- আবরার হত্যায় জড়িত সবাইকে সাময়িক বরখাস্ত এবং চার্জশিটে যাদের নাম আসবে তাদেরকে বুয়েট থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করে সেই নোটিশ প্রকাশ করতে হবে। হত্যা মামলার খরচ ও পরিবারকে পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণ দেয়ার নোটিশ জারি করতে হবে।

আবাসিক হলগুলোতে ছাত্রসংগঠনের অফিস সিলগালা এবং বহিরাগতদের বের করে দিতে হবে। ভবিষ্যতে কেউ ছাত্র রাজনীতিতে জড়ালে কী ব্যবস্থা নেয়া হবে- তা নোটিশে উল্লেখ করতে হবে। ছাত্র রাজনীতি বন্ধের ঘোষণা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাদেশে যুক্ত করতে হবে।

এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্ডিন্যান্সে সংশোধনী আনার বিষয়টি অঙ্গীকার করে নোটিশ করতে হবে। বিগত দিনে ছাত্র নির্যাতনের ঘটনা তদন্তে কমিটি গঠন এবং এ সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে একটি প্লাটফর্ম গঠনের নোটিশ জারি করতে হবে।

পাশাপাশি অভিযোগ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার কথা থাকতে হবে। হলে হলে সিসিটিভি স্থাপন এবং তা ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং করতে হবে।

এসব দাবি ঘোষণার পর শিক্ষার্থীরা বলেন, ভিসির সর্বশেষ অনুরোধ এবং ভর্তি পরীক্ষার স্বার্থে ১০ দফা দাবি দুই ভাগ করে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য ৫টি আলাদা করে তুলে ধরা হল।

যতদিন এসব দাবি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না, ততদিন পর্যন্ত ভর্তি পরীক্ষার পরিবেশ আসবে না বলে আমরা ধরে নেব। আমরা চাই না অনুজরা এ ক্যাম্পাসে খুনিদের সংস্কৃতিতে যুক্ত হোক। আমাদের ১০ দফা দাবিই বহাল আছে। কাল (আজ) থেকে দাবি বাস্তবায়নের আন্দোলন চলবে।

সকালে বিক্ষোভ : সংবাদ সম্মেলন শেষে সাড়ে ১১টার দিকে আন্দোলরত শিক্ষার্থীরা আবরার হত্যার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেন।

মিছিল নিয়ে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন হল ও ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ শেষে দুপুর ১২টার দিকে শহীদ মিনারের সামনের সড়ক অবরোধ করে অবস্থান নেন। এ সময় ফাহাদ হত্যায় জড়িতদের ফাঁসির দাবিতে প্রতিবাদী স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ।

ডিবেটিং ক্লাবের প্রতীকী বিতর্ক : জুমার নামাজের পর বুয়েট ডিবেটিং ক্লাবের আয়োজনে প্রতীকী বিতর্কের আয়োজন করেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী অনিরুদ্ধের সঞ্চালনায় এতে ৬ জন বিতার্কিক অংশ নেন।

এতে তারা বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। সঞ্চালকের এক প্রশ্নের জবাবে বিশ্ববিদ্যালয়েরে ছাত্র তাহমিদ বলেন, আমরা ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ চাই বলে একটি গোষ্ঠী অপপ্রচার চালাচ্ছে। আসলে আমাদের দাবি হচ্ছে শুধু বুয়েট ক্যাম্পাসে সাংগঠনিক ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ।

আরেক প্রশ্নের জবাবে শিক্ষার্থী শীর্ষ এ পর্যন্ত পুলিশ যে পদক্ষেপ নিয়েছে সেজন্য তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, আবরার হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যে সিসিটিভির ফুটেজ তা পুলিশকে দেয়া নিয়ে আমাদের জড়িয়ে একটি কথা উঠেছে।

আসলে ফুটেজ শিক্ষার্থীদের দেখার অধিকার রয়েছে, খুনিদের চেহারা দেখা দরকার ছিল। আমরা যদি তা না দেখতাম, খুনিরা হয়তো আমাদের সঙ্গেই কেউ কেউ টিভি দেখত, খেতে বসত কিংবা এই আন্দোলনেও থাকতে পারত।

এখন দেখে আমরা তাদের চিহ্নিত করতে পেরেছি, আমাদের আর বিব্রত হতে হবে না। আরেক শিক্ষার্থী এসএম শিহাব বলেন, আবরার হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দীর্ঘদিনের র‌্যাগিংয়ের নামে যে নির্যাতন তারই অংশ এই আবরার হত্যাকাণ্ড।

তাই প্রতিটি হলে আগে র‌্যাগিংয়ের নামে যারা নির্যাতন করেছে তাদের আজীবনের জন্য বুয়েট থেকে বহিষ্কার করতে হবে। আরেক শিক্ষার্থী মালিহা বলেন, প্রতিটি শিক্ষার্থীর সুরক্ষার জন্য হলগুলোতে আরও সিসিটিভি লাগাতে হবে।

সংবাদটি শেয়ার করুন............
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *