কাস্টমস কর্মকর্তা বৈরাগী হত্যা : ঘাতক ৫ জন আটক-সবার বাড়িই সদরের আমড়াতলী

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৯ ঘন্টা আগে

কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগীর (৩৫) মৃত্যুর পর তাঁর মা-বাবা, স্ত্রী ও স্বজনরা হতবাক। বন্ধু-বান্ধব ও পরিচিতজন সামাজিক মাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন হৃদয়স্পর্শী পোস্ট দিচ্ছেন। গতকাল রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে বুলেট বৈরাগীর মরদেহের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে।

এরপর সেখান থেকে মরদেহ নিয়ে স্বজনরা রওনা হয়েছেন গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায়। মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী ঊর্মি হীরা বললেন, ‘অন্য কিছু জানতে চাই না আমি।

সামান্য কিছু জিনিসপত্র বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়ে তাঁকে গাড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মেরে ফেলতে এতটুকু হৃদয় কাঁপেনি জড়িতদের! পুরো চক্রটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হেফাজতে রয়েছে।

হত্যার সঙ্গে জড়িত চক্রের সদস্যরা বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, ব্যাগ, ক্যামেরা ও অল্প কিছু টাকা ছিনিয়ে নিয়ে নির্দয়ভাবে চলন্ত সিএনজি অটোরিকশা থেকে ধাক্কা দিয়ে রাস্তায় ফেলে দেয়। প্রচণ্ড আঘাতজনিত কারণে মারা যান তিনি। কুমিল্লার বিভিন্ন এলাকায় গতকাল রোববার অভিযান চালিয়ে এ ঘটনায় জড়িত সন্দেহে পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে তারা। বুলেট বৈরাগীর কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া মোবাইল ফোনসেটসহ বেশ কিছু জিনিসপত্র তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকায় আটতলা ভবনের একটি ফ্ল্যাটে ভাড়া থাকতেন কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। চট্টগ্রাম থেকে গত শুক্রবার রাতে কুমিল্লার বাসায় ফিরছিলেন তিনি। কাছাকাছি স্থানে পৌঁছে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে একাধিকবার কথাও বলেছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত আর বাসায় ফেরা হয়নি তাঁর। শনিবার সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার কোটবাড়ী এলাকার আইরিশ হিল হোটেলের পাশে ওই কাস্টমস কর্মকর্তার মরদেহ মিলেছে। তাঁর মরদেহের মাথার পেছনের অংশ ও মুখমণ্ডলে রক্তাক্ত চিহ্ন ছিল।

বুলেট বৈরাগী গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলার ডুমুরিয়া গ্রামের বাবুপাড়া এলাকার বাসিন্দা সুশীল বৈরাগীর ছেলে। তিনি ৪১তম বিসিএস নন-ক্যাডার পদে কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট বিভাগে যোগদান করেন। এরপর সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন কুমিল্লার বিবিরবাজার স্থলবন্দরে। ১ এপ্রিল বিবিরবাজার থেকে চট্টগ্রামে গেছেন ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণে। চাকরির সুবাদে তিনি কুমিল্লা নগরের রাজগঞ্জ পানপট্টি এলাকার ওই ভাড়া বাসায় থাকতেন। নিহত বুলেট তাঁর মা-বাবার একমাত্র সন্তান।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র  জানায়, তথ্যপ্রযুক্তিগত তদন্ত ও সিসি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শুক্রবার রাত ১০টার দিকে চট্টগ্রামের দামপাড়া থেকে সেন্টমার্টিন ইয়াসিন এক্সপ্রেসে ওঠেন বুলেট বৈরাগী। রাত পৌনে ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কোতোয়ালি থানাধীন হোটেল রোডস্টারে গাড়ির যাত্রাবিরতির সময় নেমে পড়েন তিনি। এরপর কুমিল্লার পানপট্টি এলাকার নিজের বাসায় যেতে জাগর ঝুলি নামক স্থান থেকে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। চালকসহ ওই সিএনজিচালিত অটোরিকশায় আগে থেকে পাঁচজন ছিল। ছদ্মবেশে যাত্রী হিসেবে থাকা ছিনতাইকারী চক্রের সদস্যরা ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে মোবাইল ফোনসেট, ব্যাগ, ক্যামেরা ও পায়ে থাকা জুতা হাতিয়ে নেয়। এরপর তাঁকে চলন্ত গাড়ি থেকে রাস্তায় ফেলে দেয়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জানায়, রোববার কুমিল্লা রেলস্টেশন এলাকা থেকে প্রথমে সোহাগকে আটক করা হয়। এরপর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কুমিল্লার কোতোয়ালির বিবিরবাজার এলাকা থেকে আরও দুজনকে আটক করা হয়েছে। বুড়িচং থানাধীন এরশাদ ডিগ্রি কলেজের সামনে থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা জব্দ ও তার চালককে আটক করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, বুলেট হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা সদর দক্ষিণ মডেল থানায় হত্যা মামলা করেছেন মা নীলিমা বৈরাগী। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এই মামলায় আটক পাঁচজনকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আজ আদালতে তোলা হবে।

বুলেট বৈরাগীর মা নীলিমা বৈরাগী বলেন, ‘আমার স্বামী কৃষক ছিলেন। ছেলেটাকে বড় কষ্ট করে মানুষ করেছি। কারও সঙ্গে উঁচু গলায় কথাও বলত না। শুক্রবার দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে ছেলের সঙ্গে কথা হয়। তখন বলছিল, বাসে আছে, অল্প সময়ের মধ্যে বাসায় পৌঁছাবে। এর কিছুক্ষণ পর কল দিলে আর রিসিভ করেনি। ভোর ৪টার দিকে কল দিলে অপর পাশ থেকে রিসিভ করে বলে, ‘আরেকটু পরে আইতেছি, এখন ঘুমাইতেছি।’ এরপরই মনে হয়েছে, আমার ছেলের সঙ্গে খারাপ কিছু ঘটেছে। কারণ, এমন ভাষায় আমার ছেলে কখনও কথা বলে না। তখন এটাও সন্দেহ হয়েছে, আগে তাহলে অন্য কারও সঙ্গে কথা বলেছি?

টুঙ্গিপাড়ায় শেষকৃত্য

কুমিল্লা ও গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি জানিয়েছেন, খুনের ঘটনাটি পুলিশের পাশাপাশি ছায়াতদন্ত করছে র‍্যাব, ডিবি, সিআইডি, পিবিআইসহ গোয়েন্দা সংস্থার বিভিন্ন ইউনিট।

গতকাল রোববার রাতে কুমিল্লা ক্যাম্পের অধিনায়ক মেজর সাদমান ইবনে আলম বলেন, বুলেট হত্যার রহস্য বের করা হয়েছে। জড়িতদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে সোমবার সকালে প্রেস ব্রিফিং করে বিস্তারিত জানানো হবে।

এদিকে গতকাল রোববার বিকেলে বুলেটের মরদেহ টুঙ্গিপাড়ায় পৌঁছায়। এ সময় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে। রাতেই বাড়ির উঠানের পাশে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বুলেট বৈরাগীর শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

২০২২ সালের ২৩ এপ্রিল বাগেরহাটের চিতলমারীর মেয়ে ঊর্মি হীরার সঙ্গে বুলেটের বিয়ে হয়। তিন দিন আগে ছিল তাদের বিয়েবার্ষিকী। তাদের অভয় বৈরাগী নামে এক বছরের একটি মেয়ে রয়েছে।

আজ সোমবার তাঁর প্রথম জন্মদিন। মূলত সন্তানের জন্মদিন ঘিরেই শুক্রবার রাত ১১টায় চট্টগ্রাম থেকে রওনা দেন বুলেট। আচকা এই সুখের সংসারে নেমে এসেছে অমানিশা! গতকাল রোববার কুমিল্লা মেডিকেল কলেজে লাশের ময়নাতদন্ত শেষে বেলা সাড়ে ১১টার দিকে মরদেহবাহী ফিজিং অ্যাম্বুলেন্স নেওয়া হয় কুমিল্লা নগরীর ধর্মসাগর পাড়ের পার্ক রোডের কাস্টমস, এক্সসাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট কার্যালয়ের সামনে। এ সময় বুলেটের মা-বাবা ও স্ত্রী ঊর্মির আহাজারিতে শোকাবহ পরিবেশের সৃষ্টি হয়। স্বামীর মুখ দেখতে গিয়ে বারবার অ্যাম্বুলেন্স ধরে কাঁদছিলেন ঊর্মি। তিনি বলতে থাকেন, ‘ও বুলেট আমাকে কই রেখে গেলে। আমি কীভাবে বাঁচব? আমার কলিজাকে তো আর দেখতে পাবো না। ওরে তো পুড়িয়ে দেবে।’ বুলেটের বাবা সুশীল বৈরাগী বলেন, ‘কত স্বপ্ন ছিল ছেলেটার। লেখাপড়া শেষ করে পরিবারের জন্য কিছু করবে, কত কিছুই না বলত। চাকরির কারণে কুমিল্লায় ভাড়া বাসায় উঠেছিল। এক বছরের একটি সন্তান এখনও বাবা বলতে শেখেনি। ও তো বাবাহারা হলো। এত কম বয়সে তার স্ত্রীও স্বামীহারা হলো। সন্ত্রাসীরা সব নিয়েও যদি ছেলেকে ফেরত দিত।’