যে কারণে বিদেশে কর্মী পাঠানো কমে গেছে বাংলাদেশের

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১৪ ঘন্টা আগে

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর গত দুই মাসে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে কর্মী পাঠানো বিপুল সংখ্যায় কমেছে। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত এক লাখ ৪৩ হাজার ৩৫১ কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন। আর চলতি বছরের একই সময়ে গেছেন ৮২ হাজার ৫৬১ জন। অর্থাৎ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৬০ হাজার ৭৯০ জন বা ৪২ দশমিক ৪০ শতাংশ কম।

২০২৪ সালের একই সময়ের সঙ্গে তুলনা করলে দেখা যায়, চলতি বছরের মার্চ-এপ্রিলের তুলনায় ওই সময় প্রায় দ্বিগুণ কর্মী বিদেশে পাঠানো হয়েছিল। ২০২৪ সালের মার্চ এবং এপ্রিল মাসে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৪ জন কর্মী বিদেশ গিয়েছিলেন।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, শুধু মধ্যপ্রাচ্যের সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত, জর্ডান নয়; বাংলাদেশের অন্যতম বড় শ্রমবাজার সিঙ্গাপুরেও কর্মী পাঠানো কমেছে। মালয়েশিয়া, ওমান, বাহরাইনের শ্রমবাজার আগের বছরগুলোর মতো বন্ধ রয়েছে বাংলাদেশিদের জন্য। কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি নেই জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ার মতো শ্রমবাজারে। কর্মী পাঠানোয় সমঝোতা স্মারক সই হলেও অস্ট্রেলিয়া, গ্রিসের মতো দেশগুলোর শ্রমবাজার খোলেনি।

এ ছাড়া রোমানিয়া, ক্রোয়েশিয়া, পোল্যান্ডের মতো ইউরোপের শ্রমবাজার বন্ধ হয়েছে। এসব দেশের ভিসা পেতে ভারতের নয়াদিল্লিতে দূতাবাসে যেতে হয় বাংলাদেশিদের। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর ভারতের ভিসা পাওয়া কঠিন হয়ে ওঠায় দিল্লি যেতে পারছেন না কর্মীরা। আবার ইউরোপের এই দেশগুলোতে গিয়ে কর্মস্থল ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় কর্মী নিয়োগ কমিয়ে দিয়েছে নিয়োগকারীরা।
ইউরোপের দেশে প্রবেশের পথ হয়ে ওঠায় কিরগিজস্তানের শ্রমবাজারও বাংলাদেশিদের জন্য প্রায় বন্ধের পথে। বৈধ চাকরি দেখিয়ে রাশিয়ায় পাঠিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ায় দেশটির শ্রমবাজারও সংকুচিত হয়েছে বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য।

সরকারের ভাষ্য, বন্ধ শ্রমবাজারগুলো খুলতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা, যুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি হলে মধ্যপ্রাচ্যে কর্মী পাঠাতে যোগাযোগ এবং কর্মীদের কাজের ও ভাষাগত দক্ষতা বৃদ্ধিতে একযোগে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর সুফল মিলবে।

সৌদিনির্ভর বৈদেশিক কর্মসংস্থান
জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৩৩৭ কর্মী বিদেশে চাকরির ছাড়পত্র নেন। তাদের মধ্যে ৭ লাখ ৫৫ হাজার ২০৯ জনের গন্তব্য ছিল সৌদি আরব। তা ছিল মোট চাকরির ৬৬ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
উপসাগরীয় অঞ্চলের দেশ কাতারে গত বছর এক লাখ সাত হাজার ৬০৩ জন কর্মী গিয়েছেন। কুয়েতে গিয়েছেন ৪২ হাজার ৭৩৮ জন। আরব আমিরাতে ১৩ হাজার ৭৫৪ জন গিয়েছিলেন। জর্ডান যেতে ১২ হাজার ৩২৯ জন কর্মী ছাড়পত্র নেন। সব মিলিয়ে উপসাগরীয় অঞ্চলের (জিসিসি) দেশগুলোতে কর্মী গিয়েছেন ৮ লাখ ৮৮ হাজার ৮৯৫, অর্থাৎ বাংলাদেশি কর্মীর ৭৮ শতাংশের কর্মসংস্থান হয়েছে এসব দেশে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর আগ্রাসন শুরু করে। প্রতিরোধে ইরান সৌদি আরব, আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডানে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায়। এর প্রভাবে দেশগুলোতে বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থান কমেছে।

গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সৌদি আরব গিয়েছিলেন এক লাখ দুই হাজার ১০৪ জন কর্মী। চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছেন ৪৪ হাজার ৮৭৬ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ৫৭ হাজার ২২৮ বা ৫৬ শতাংশ।

গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত কাতার গিয়েছিলেন ১৪ হাজার ৫৩২ জন। এ বছর গিয়েছেন চার হাজার ৭২৪ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ৬৯ শতাংশ। কুয়েত গিয়েছিলেন তিন হাজার ৫৫৮ জন। এ বছর গিয়েছেন দুই হাজার ৬১৩ জন। কর্মসংস্থান কমেছে ২৭ শতাংশ।

তবে যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ জর্ডান এবং আরব আমিরাতে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও সংখ্যার বিবেচনায় তা সামান্যই। গত বছরের ১ মার্চ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত জর্ডান গিয়েছিলেন এক হাজার ৬২৩ জন। চলতি বছরে একই সময়ে গিয়েছেন এক হাজার ৯৯৯ জন। আরব আমিরাত গিয়েছিলেন ৫৪০ জন। এবার গিয়েছেন এক হাজার ৯৬৭ জন।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, যুদ্ধের আগে গত বছরের জানুয়ারি থেকে ফেব্রুয়ারি এবং চলতি বছরের একই সময়ে বৈদেশিক কর্মসংস্থানের প্রায় সমান ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম দুই মাসে বৈদেশিক সংস্থান ছিল এক লাখ ৬০ হাজার ২৯১ জনের। চলতি বছরে গেছেন এক লাখ ৬০ হাজার ৭২৬ জন। তবে কমেছে সামগ্রিক অভিবাসন। গত বছরের প্রথম চার মাসে বিদেশে চাকরি নিয়ে দেশ ছাড়েন তিন লাখ তিন হাজার ৬৪২ জন। এই সংখ্যা চলতি বছরের প্রথম চার মাসে দুই লাখ ৪৩ হাজার ২৮৭ জন।

যুদ্ধ নেই এমন দেশেও বাড়েনি
২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধের পর সিঙ্গাপুরই মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে সবচেয়ে বড় ভরসা। গত বছরে ৭০ হাজার ৮৩৫ বাংলাদেশি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ সিঙ্গাপুরে গিয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ২২ হাজার ১২৬। অর্থাৎ এই শ্রমবাজার আমাদের জন্য প্রসারিত হয়নি।

উচ্চ বেতন এবং ভালো কর্মপরিবেশের জন্য খ্যাতি রয়েছে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার। এই দুই দেশেও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে অগ্রগতি হচ্ছে না। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে জাপানে চাকরি নিয়ে গিয়েছেন ৫৯০ জন। ২০২৫ সালে এই সংখ্যা ছিল এক হাজার ৫৬৪। ২০২৪ সালে ছিল এক হাজার ৫৮।

দক্ষিণ কোরিয়ায় ২০২৪ সালে চাকরি নিয়ে যান দুই হাজার ৮২৬ জন বাংলাদেশি। ২০২৫ সালে কর্মসংস্থান হয় দুই হাজার ৪৩৬। চলতি বছর প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ৪৮৪। নিম্ন জন্মহারের কারণে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ায় জনসংখ্যা কমছে। কর্মী ঘাটতি পূরণে বাংলাদেশ অনেক বছর ধরেই সুযোগ নেওয়ার কথা বলছে। জাপানে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তবে পরিসংখ্যান বলছে, অগ্রগতি নেই।

একই অবস্থা ইতালি, পর্তুগালের মতো উন্নত দেশের শ্রমবাজারের ক্ষেত্রে। গত বছরের প্রথম চার মাসে বৈধপথে ইতালিতে যান এক হাজার ২২২ জন। চলতি বছরে এই সংখ্যা তিন হাজার ২৬১ জন। অবৈধ পথে ইতালিতে যাওয়া বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনতে চাপ দিচ্ছে দেশটি। গত বছরের প্রথম চার মাসে পর্তুগাল গিয়েছিলেন দুই হাজার ৮৪ জন। চলতি বছর গেছেন দুই হাজার ৬৯ জন।

বন্ধ শ্রমবাজার নিয়ে আলোচনা
চলতি মাসের শুরুতে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফরে দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। রিক্রুটিং এজেন্সি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে প্রায় দুই বছর কর্মী যাওয়া বন্ধ রয়েছে। গত ৯ এপ্রিল যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ জানিয়েছে, শ্রমবাজার উন্মুক্ত হবে। এতে বলা হয়, মালয়েশিয়ার বিভিন্ন খাতের চাহিদা অনুযায়ী শ্রমবাজার খোলার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করতে দুই দেশ একমত। একই সঙ্গে একটি সুষ্ঠু, নৈতিক ও স্বচ্ছ নিয়োগ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

২০২২ সালের আগস্ট থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় পৌনে পাঁচ লাখ কর্মী পাঠায় বাংলাদেশ। সে দেশের সরকার সেবার যে ১০০ বাংলাদেশি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেয়, তারা সিন্ডিকেট হিসেবে পরিচিতি পায়। সরকার কর্মীপ্রতি ব্যয় নির্ধারণ করেছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। তবে গড়ে নেওয়া হয় সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। সিন্ডিকেটের কারণে শেষ পর্যন্ত সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও ১৮ হাজার কর্মী মালয়েশিয়া যেতে পারেননি।

জনশক্তি ব্যবসায়ী রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর মালিকদের সংগঠন বায়রা আগেরবার যোগ্যতার ভিত্তিতে এজেন্সি বাছাইয়ের নামে সিন্ডিকেট করেছিল। এবারও কি একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে. নাকি সবার জন্য বাজার উন্মুক্ত থাকবে, তার ওপর শ্রমবাজার খোলার সুফল নির্ভর করবে। সিন্ডিকেট হলে কর্মীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

বাজার হারাচ্ছে বাংলাদেশ
গতবছর আরব আমিরাত সফরে গিয়ে তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেছিলেন, জাল নথি, ভুয়া অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা সনদে বিদেশ যাওয়ায় বাংলাদেশিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিদেশ গিয়ে মাথা হেট হয়।

এই অনিয়মের কারণে ইউরোপের দেশ রোমানিয়া, পোল্যান্ড, ক্রোয়েশিয়ার শ্রমবাজার প্রায় বন্ধের পথে। ২০২৩ ও ২০২৪ সালে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৪০ হাজার কর্মী রোমানিয়া গিয়েছিলেন। চলতি বছরের প্রথম চার মাসে এই সংখ্যা ৫৪১।

অভিবাসী উন্নয়ন কর্মসূচির নির্বাহী পরিচালক শাকিরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, কর্মীরা রোমানিয়া গিয়ে চাকরিতে যোগ দেন না। পালিয়ে ইতালি ও জার্মানি চলে যান। এতে নিয়োগকারীরা আর বাংলাদেশি কর্মী নিতে আগ্রহী নন। রাশিয়ার শ্রমবাজার বেশ ভালো ছিল। গত বছর প্রায় পাঁচ হাজার কর্মী গিয়েছিলেন। এবার সংখ্যাটি কমছে। কারণ অনেকে লোভে পড়ে যুদ্ধে যান। সাধারণ চাকরিতে মাসিক বেতন হয়তো ৫০ হাজার টাকা। যুদ্ধে গেলে তা আড়াই লাখ টাকা।

সরকার ও ব্যবসায়ীরা কী বলছে
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন, শুধু যুদ্ধ নয় কর্মসংস্থান কমে যাওয়ার আরও কিছু কারণ রয়েছে। যেমন সৌদি আরবে যেতে এখন ‘তাকামুল’ নামে পরীক্ষা দিতে হয়। এতে পাস করতে না পারলে ভিসা দেওয়া হয় না। আবার সৌদিতে গিয়ে চাকরি, কাজ, বেতন না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এসব কারণেও অভিবাসন কমছে। ওমান, বাহরাইন, মালয়েশিয়ায় তো কয়েক বছর ধরে বন্ধ। সে

কারণে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে না।
ইউরোপের দেশগুলোয় কর্মসংস্থান না হওয়ার বিষয়ে এই ব্যবসায়ী বলেছেন, ভিসার জন্য ভারতে যাওয়ার ভিসা পাওয়াই কঠিন হয়ে গেছে। সরকার যদি ইউরোপের দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ভিএফএসের ব্যবস্থা করতে পারে, তাহলে ঢাকা থেকে ভিসা পাওয়া যাবে। তখন ইউরোপে কর্মসংস্থান বাড়বে।

প্রবাসী কল্যাণের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন সমকালকে বলেছেন, যুদ্ধের কারণে যেসব দেশে কর্মসংস্থান কমেছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা ও সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। দেশগুলো আশ্বস্ত করেছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে চাহিদা অনুযায়ী কর্মী নিয়োগ শুরু করবে। বাংলাদেশকে জোগান ঠিক রাখতে বলেছে।

ইউরোপের শ্রমবাজারের বিষয়ে মাহদী আমিন বলেছেন, ওইসব দেশের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে ভিসা সহজীকরণের বিষয়ে। জাপানে যাওয়ার জন্য ভাষা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সরকার কাজ করছে। নতুন শ্রমবাজার খোঁজা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়াসহ যেসব দেশের সঙ্গে অতীতে সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল, সেগুলোকে কার্যকরে ফলোআপ করা হচ্ছে। মালয়েশিয়া, ওমানের মতো পুরোনো বাজারগুলো খুলতে এরই মধ্যে চেষ্টা শুরু হয়েছে। মালয়েশিয়া থেকে ইতিবাচক সাড়া এসেছে।