কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) আবাসিক হলগুলোর ডাইনিংয়ের খাবারের মান, স্বাদ ও পরিবেশনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ রয়েছে। ডাইনিংয়ের খাবারে আস্থা না থাকায় আবাসিক শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ হলের বাইরে হোটেল, রেস্তোরাঁ কিংবা খাবারের দোকানে খাচ্ছেন। এতে প্রতিমাসে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচটি আবাসিক হলের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বর্তমানে হলে থাকা প্রায় ১ হাজার ৫৫৪ শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র ২৩ শতাংশ নিয়মিত ডাইনিংয়ে খাবার খান। বিপরীতে প্রায় ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী হলের খাবার এড়িয়ে বাইরে খেতে পছন্দ করেন। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিম্নমানের খাবার, অপর্যাপ্ত স্বাদ, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও তদারকির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী রয়েছেন ৬ হাজার ৪৮৪ জন। তাদের আবাসনের জন্য রয়েছে তিনটি ছাত্র ও দুটি ছাত্রী হল। এসব হলে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫৫৪ জন শিক্ষার্থী অবস্থান করছেন। হলভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, কাজী নজরুল ইসলাম হলে ২১০ আবাসিক শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ডাইনিংয়ে খাবার খান মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন। বিজয় ২৪ হলে ৫২০ জনের মধ্যে ১২০ থেকে ১৫০ জন, শহীদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত হলে ১৭০ জনের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪০ জন, নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলে ২৯৬ জনের মধ্যে ৩৫ থেকে ৪৫ জন এবং সুনীতি-শান্তি হলে ৩৬৬ জনের মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ জন নিয়মিত ডাইনিংয়ে খাবার গ্রহণ করেন। সুনীতি-শান্তি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী ফারহানা ইনা বলেন, “খাবারের মান একেবারে খারাপ নয়। তবে বাজার করা ও রান্নার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। অনেক সময় ভালোভাবে যাচাই না করেই মাছ কেনা হয়। ফলে নিম্নমানের বা দুর্গন্ধযুক্ত মাছ পরিবেশন করা হয়। রান্নায় মসলার সঠিক ব্যবহারও হয় না, ডালও অনেক পাতলা থাকে। তাই আমিসহ অনেকেই বাইরে খাই বা নিজেরা রান্না করি।”
কাজী নজরুল ইসলাম হলের শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান রনি বলেন, “আমাদের হলে প্রতিদিন দুপুরে ২০ থেকে ৩০ জন এবং রাতে ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী ডাইনিংয়ে খাবার খান। খাবারের মান ভালো না হওয়ায় অধিকাংশ শিক্ষার্থী বাইরে খেতে বাধ্য হন। এতে অতিরিক্ত খরচ হয়।”
তার ভাষ্য, ডাইনিংয়ে জনবল পর্যাপ্ত থাকলেও খাবারের মান, স্বাদ ও পরিমাণ নিয়ে শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়েছে। প্রশাসনের তদারকিতে মাঝে মধ্যে উন্নতি হলেও তা স্থায়ী হয় না। এ বিষয়ে কাজী নজরুল ইসলাম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক মো. হারুন বলেন, হলের ডাইনিংয়ে ভর্তুকি চালুর বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। তবে এটি বাস্তবায়নে নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন, “বর্তমানে শিক্ষার্থীরাই ডাইনিং পরিচালনা করছে। ৪০ থেকে ৪৫ টাকার মিল রেটে মানসম্মত খাবার দেওয়া কঠিন। আবার অনেক শিক্ষার্থীও ডাইনিংয়ে খেতে চান না। ভর্তুকি চালু হলে এবং মিল রেট কিছুটা সমন্বয় করা গেলে খাবারের মান আরও উন্নত করা সম্ভব।”
নওয়াব ফয়জুন্নেছা চৌধুরানী হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. সাদিয়া আফরিন সানি বলেন, সবাই খাবারের মান খারাপ বলে বাইরে খান—এমনটি বলা ঠিক হবে না। কেউ খরচ কমাতে নিজেরা রান্না করেন, আবার কেউ বাসা থেকে খাবার এনে খান। তবে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ পেলে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করে। বিজয় ২৪ হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক ড. মাহমুদুল হাসান খান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার সময় ডাইনিংয়ে শিক্ষার্থীর সংখ্যা আরও কম ছিল। পরে বিভিন্ন উদ্যোগের কারণে তা কিছুটা বেড়েছে। তবে বর্তমান ৪০ টাকার মিল রেটে মানসম্মত খাবার নিশ্চিত করা কঠিন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়ার কারণে অনেকেই ডায়রিয়া, বদহজম ও অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মাহমুদুল হাসান খান বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা সবার অধিকার। নিম্নমানের বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাদ্যসামগ্রী, নিম্নমানের তেল কিংবা অতিরিক্ত মসলা ব্যবহার করলে শুধু পেটের সমস্যা নয়, ডায়রিয়া, ফুড পয়জনিং, পানিবাহিত রোগ এবং হেপাটাইটিস ‘এ’ ও ‘ই’-এর মতো সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, “হলের ডাইনিংয়ে শিক্ষার্থীরা কেন আগ্রহী নন, সেটি আগে খতিয়ে দেখতে হবে। বর্তমান মিল রেটে মানসম্মত খাবার দেওয়া সম্ভব না হলে হল প্রভোস্টদের মাধ্যমে প্রস্তাব সিন্ডিকেটে উপস্থাপন করা যেতে পারে। শিক্ষার্থীদের কল্যাণে যৌক্তিক যেকোনো প্রস্তাব বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে।”
প্রতিদিন ডাইনিং সুবিধা থাকা সত্ত্বেও আবাসিক শিক্ষার্থীদের বড় অংশের বাইরে খাবারের ওপর নির্ভরশীলতা কেবল হলের খাবারের মান নিয়েই প্রশ্ন তুলছে না; একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক সেবার কার্যকারিতা নিয়েও নতুন করে আলোচনার জন্ম দিচ্ছে।