‘প্রচলিত ঈদ-ই-মিলাদুন্নবীর নামে জসনে জুলুস করা বিদআত’

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ ঘন্টা আগে

ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে প্রচলিত বিভিন্ন আয়োজন, জশনে জুলুস, মিছিল ও বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা শরিয়তসম্মত কি না এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত পদ্ধতি কী, এসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে দৈনিক কুমিল্লার জমিনের ধারাবাহিক টকশোর ২৬৬তম পর্বে।
সোমবার (১৭ আগস্ট) রাত সাড়ে ৮ টায় দৈনিক কুমিল্লার জমিনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এ টকশোর বিষয় ছিল ঈদে মিলাদুন্নবী: শরিয়তসম্মত আমল নাকি পরবর্তীকালের সংযোজন? অনুষ্ঠানে আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সচেতন আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত ফেডারেশনের উপদেষ্টা মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন ঐক্যবাদী এবং তালীমুল হুদা মাদরাসার মুহতামিম মুফতি জালালুদ্দিন আশরাফি। অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনা করেন সংগঠক ও লেখক শাহাজাদা এমরান।
আলোচনায় মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন ঐক্যবাদী বলেন, মিলাদুন্নবী শব্দের অর্থ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শুভ জন্ম। রাসূলের জন্ম বিশ্ববাসীর জন্য নিঃসন্দেহে বড় নিয়ামত। তবে জন্মকে কেন্দ্র করে সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন আয়োজন শরিয়তসম্মত কি না, তা কোরআন ও হাদিসের আলোকে বিবেচনা করতে হবে। বারো রবিউল আউয়াল উপলক্ষে জশনে জুলুস, ঢোল, বাদ্যযন্ত্রসহ বিভিন্ন ধরনের মিছিলের যে প্রচলন রয়েছে, সেগুলোর সুস্পষ্ট ভিত্তি কোরআন ও সহিহ হাদিসে নেই। তাই এগুলোকে ইসলামের নির্ধারিত আমল হিসেবে গ্রহণ করা যাবে না।
তিনি বলেন, আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত পেয়ে আনন্দিত হওয়ার কথা কোরআনে বলা হয়েছে। তবে এ আয়াতকে ঈদে মিলাদুন্নবীর নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা জশনে জুলুসের দলিল হিসেবে গ্রহণ করা সঠিক নয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোরআন ও সুন্নাহ আঁকড়ে ধরার নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণের গুরুত্বও রয়েছে। ফলে কোনো আমল শরিয়তসম্মত কি না, তা নির্ধারণে রাসূল ও সাহাবায়ে কেরামের আমলকে সামনে রাখতে হবে।
মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন ঐক্যবাদী আরও বলেন, সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমাদের চেয়েও বেশি ভালোবাসতেন। তাঁরা নিজেদের জীবন, সম্পদ ও পরিবার পর্যন্ত রাসূলের জন্য উৎসর্গ করেছিলেন। কিন্তু তাঁদের যুগে ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে নির্দিষ্ট জশনে জুলুস বা মিছিলের প্রচলন ছিল না। তাই রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত পদ্ধতি হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা, তাঁর নির্দেশিত আমল করা এবং তাঁর জীবনাদর্শ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া।
তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্ম সোমবার হয়েছে এবং তিনি সোমবার রোজা রাখতেন। সোমবার রোজা রাখার কারণ হিসেবে তিনি তাঁর জন্মের দিন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। তাই সোমবার রোজা রাখা শরিয়তসম্মত ও সুন্নত আমল। তবে ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে নির্দিষ্ট কোনো বিশেষ আমল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মতকে নির্দেশ দিয়ে যাননি। তাঁর জীবন, চরিত্র ও আদর্শ নিয়ে আলোচনা করা এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি করা অবশ্যই ভালো কাজ। বিদআত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইসলামের নির্ধারিত ইবাদত ও আমলের মধ্যে শরিয়তসম্মত ভিত্তি ছাড়া নতুন কোনো বিষয় সংযোজন করাকে বিদআত বলা হয়। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন বিদ্যুৎ, গাড়ি বা বিমানকে বিদআত বলা যাবে না। কারণ এগুলোকে ইসলামের ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে না। তবে কোনো নতুন কাজকে ইসলামের বিশেষ আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং সেটি না করলে কাউকে নবীর দুশমন, কাফের বা পথভ্রষ্ট বলা ঠিক নয়।
মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন ঐক্যবাদী বলেন, ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে সিরাতুন্নবী বা রাসূলের জীবনচরিত আলোচনা করা যেতে পারে। এতে মানুষের মধ্যে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও ঈমান বৃদ্ধি পেতে পারে। রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম উত্তম পদ্ধতি হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা।
নবীর সম্মানে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানে সাহাবিদের দাঁড়ানোকে অপছন্দ করেছেন বলে হাদিসে বর্ণনা রয়েছে। তাই নবীর প্রতি ভালোবাসার নামে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা তাঁর নিজের নির্দেশের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য রহমত এবং তাঁর প্রতি ভালোবাসা ঈমানের অংশ। তবে সেই ভালোবাসার সঠিক প্রমাণ হলো তাঁর দেখানো পথে জীবন পরিচালনা করা।

অন্যদিকে মুফতি জালালুদ্দিন আশরাফি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি সাহাবায়ে কেরামের ভালোবাসা ছিল অতুলনীয়। তাঁরা রাসূলের জন্য জীবন, সম্পদ, পরিবার ও স্বাচ্ছন্দ্য পর্যন্ত ত্যাগ করেছেন। অথচ রাসূলের জীবদ্দশায় ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে নির্দিষ্ট কোনো অনুষ্ঠান পালন করা হয়নি। তাই রাসূলের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রে সাহাবায়ে কেরামের অনুসরণ করাই উত্তম।
তিনি বলেন, রাসূলের সম্মান করার অর্থ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা। তিনি যেভাবে জীবন পরিচালনা করেছেন এবং সাহাবিরা যেভাবে তাঁকে অনুসরণ করেছেন, আমাদেরও সেভাবেই চলতে হবে। রাসূলের প্রতি দরুদ ও সালাম পাঠ করা সব অবস্থাতেই করা যায়। দাঁড়িয়ে দরুদ পড়া নিজে সমস্যা নয়। তবে কেউ যদি বিশ্বাস করে যে দাঁড়ালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যক্তিগতভাবে সেখানে হাজির হয়ে যান, তাহলে তা আকিদাগত সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে।
মুফতি জালালুদ্দিন আশরাফি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সম্মানে সাহাবিদের দাঁড়ানো পছন্দ করতেন না বলে বর্ণনা রয়েছে। তাই তাঁর অনুসরণ করতে হলে তাঁর নির্দেশ ও পছন্দকে গুরুত্ব দিতে হবে। জশনে জুলুস বা মিছিলের বর্তমান প্রচলিত পদ্ধতির শরিয়তসম্মত ভিত্তি নেই। রাসূল, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে তাবেঈনের যুগে এ ধরনের জশনে জুলুস ছিল না।
তিনি আরও বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোমবার রোজা রাখতেন এবং সোমবার তাঁর জন্মের দিন হওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এর মাধ্যমে জন্মের দিনের শুকরিয়া আদায়ের একটি সুন্নত পদ্ধতি পাওয়া যায়। তবে জন্মের তারিখ নিয়ে ঐতিহাসিকভাবে মতভেদ থাকলেও সোমবার জন্মগ্রহণের বিষয়টি হাদিসে স্পষ্টভাবে এসেছে। তাই সোমবার রোজা রাখা সুন্নত আমল হিসেবে পালন করা যেতে পারে।
সিরাতুন্নবী প্রসঙ্গে মুফতি জালালুদ্দিন আশরাফি বলেন, রাসূলের জীবন ও চরিত্র নিয়ে আলোচনা করা ভালো কাজ। সিরাতুন্নবীর মাধ্যমে মানুষ তাঁর জীবন, আদর্শ ও সুন্নাহ সম্পর্কে জানতে পারে। তবে সিরাত আলোচনা করা এবং নির্দিষ্ট একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে আবশ্যিক মনে করা এক বিষয় নয়। বিদআতের বিষয়টি বুঝতে হলে দেখতে হবে, কোনো নতুন বিষয়কে ইসলামের নির্ধারিত আমল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে কি না।
তিনি বলেন, হজের জন্য বিমান ব্যবহার, বিদ্যুৎ বা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার ইবাদতের নিজস্ব বিধান পরিবর্তন করে না। কিন্তু কোনো নতুন পদ্ধতিকে শরিয়তের নির্ধারিত ইবাদত হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলে সেটি আলাদাভাবে বিবেচনা করতে হবে। ঈদে মিলাদুন্নবীর নামে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যার মধ্যে নামাজ বাদ দেওয়া, মানুষের চলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করা, বাদ্যযন্ত্র বা অন্য কোনো অনৈসলামিক কর্মকাণ্ড যুক্ত হয়।
মুফতি জালালুদ্দিন আশরাফি আরও বলেন, ইসলামে নির্ধারিত ঈদ হলো ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় এসে আগের দুটি আনন্দের দিনের পরিবর্তে মুসলমানদের জন্য এই দুই ঈদের নির্দেশ দিয়েছেন। তাই নবীর সম্মান দেখানোর নামে এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা তাঁর সুন্নাহর বিরোধী।
আলোচনায় উভয় আলেমই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসার গুরুত্বের ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, নবীজির আগমনে আনন্দ প্রকাশ করতে চাইলে শরিয়তসম্মত পদ্ধতি অবলম্বন করা উচিত। সোমবার রোজা রাখা, বেশি বেশি দরুদ পড়া, নবীর জীবনচরিত পাঠ ও আলোচনা করা এবং তাঁর সুন্নাহ অনুযায়ী জীবন পরিচালনার চেষ্টা করা হতে পারে সেই ভালোবাসা প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম।
আলোচনার শেষ পর্যায়ে বক্তারা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ভালোবাসা মুসলমানের ঈমানের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে ভালোবাসার প্রকৃত প্রমাণ শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং রাসূলের নির্দেশ ও আদর্শকে জীবনে বাস্তবায়ন করা। একই সঙ্গে এ বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও একে অপরকে অপমান, বিদ্বেষ কিংবা বিভেদের দিকে ঠেলে দেওয়া উচিত নয়। ধর্মীয় বিষয়ে কোরআন, হাদিস, সুন্নাহ ও গ্রহণযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার আলোকে শান্তিপূর্ণভাবে মতবিনিময়ের ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।