যে মৃত্যুরহস্যের জট ৩০ বছরেও খোলেনি

সালমান শাহ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৬ ঘন্টা আগে

১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ঢাকার নিউ ইস্কাটনের বাসায় নিথর অবস্থায় পাওয়া যায় মাত্র ২৫ বছর বয়সী চিত্রনায়ক সালমান শাহকে। দ্রুত তাকে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

সেদিনের সেই মৃত্যু প্রথমে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছিল। কিন্তু আজ তিন দশক পরও সেই মৃত্যুরহস্য ঘিরে প্রশ্নের শেষ হয়নি। আজও খোলেনি সেই মৃত্যুরহস্যের জট।

আজ ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬। সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলো। এর মধ্যে একাধিক তদন্ত হয়েছে, একাধিক প্রতিবেদনে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হয়েছে। অন্যদিকে, তার পরিবার শুরু থেকেই তা প্রত্যাখ্যান করে হত্যার অভিযোগ করে আসছে।

দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে নতুন করে তদন্তের আওতায় আসে। এখন সেই মামলার তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। তবে তদন্ত প্রতিবেদন এখনো আদালতে জমা পড়েনি। সর্বশেষ ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন থাকলেও তা জমা না হওয়ায় ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে।

আবার সম্প্রতি মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে দীর্ঘদিন ধরে পলাতক থাকা অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনের গ্রেফতারে। তবে সবকিছুর পরে মৃত্যুর ৩০ বছর পরও এখনো মূল প্রশ্নটি একই—সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন, নাকি তাকে হত্যা করা হয়েছিল?

সালমান শাহর প্রকৃত নাম চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন। টেলিভিশন নাটকের মধ্য দিয়ে অভিনয়জীবন শুরু করলেও ১৯৯০-এর দশকে চলচ্চিত্রে এসে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি হয়ে ওঠেন দর্শকদের অন্যতম প্রিয় নায়ক।

১৯৯৩ সালে ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ চলচ্চিত্র দিয়ে বড় পর্দায় তার অভিষেক। এরপর একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমায় অভিনয় করে তিনি নিজস্ব একটি অবস্থান তৈরি করেন। তার মৃত্যুর পরও একাধিক চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে ‘সত্যের মৃত্যু নাই’, ‘জীবন সংসার’ উল্লেখযোগ্য। ‘বুকের ভিতর আগুন’ ছিল তার মৃত্যুর পর মুক্তি পাওয়া শেষ চলচ্চিত্র।

অর্থাৎ, চলচ্চিত্রে তার ক্যারিয়ার ছিল খুবই সংক্ষিপ্ত। কিন্তু সেই অল্প সময়েই তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছিলেন, মৃত্যুর ৩০ বছর পরও তা কমেনি। বরং তার মৃত্যুর রহস্য তাকে ঘিরে মানুষের আগ্রহ আরও বাড়িয়েছে।

৩০ বছরের হিসাব

সালমান শাহ মারা যান ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর। ১৯৯৭ সালে সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদনে আত্মহত্যার কথা জানায়। ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। ২০১৪ সালে বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল হয়; এতে মৃত্যুকে অপমৃত্যু হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২০১৫ সালে সালমানের মা নীলা চৌধুরী আবার রিভিশন আবেদন করেন। ২০১৬ সালে আদালত পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেন।

২০২০ সালে পিবিআই জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছেন। প্রতিবেদনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। ২০২১ সালে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে নীলা চৌধুরী নারাজি আবেদন করেন। ২০২৫ সালে আদালত ঘটনাটিকে হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন। পরদিন রমনা থানায় ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা করা হয়।

২০২৬ সালে মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেফতার হন। পরে তাকে পাঁচদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়। সর্বশেষ তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ আবার পিছিয়ে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর নতুন নির্ধারণ করা হয়েছে।

৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯৬: কী ঘটেছিল সেদিন

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন নথি অনুযায়ী, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহ তার নিউ ইস্কাটনের বাসায় ছিলেন। ওই দিন তাকে অচেতন অবস্থায় পাওয়া যায়। পরে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

শুধু কোনো জবানবন্দিতে কোনো বক্তব্য থাকার অর্থই সেই বক্তব্য আদালতে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন নয়। বর্তমান তদন্তে এর সত্যতা, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি যাচাই করার কথা।—ওমর ফারুক ফারুকী

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী রমনা থানায় অপমৃত্যুর মামলা করেন। তখন থেকেই তার মৃত্যুকে ঘিরে নানান প্রশ্ন সামনে আসে।

মামলার নথি ও পরবর্তী তদন্তগুলোতে মৃত্যুর ধরন নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন আলোচনা উঠে আসে। একদিকে তদন্তকারী সংস্থাগুলো আত্মহত্যার কথা বলেছে, অন্যদিকে সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই দাবি করে আসছে, এটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। এ দুই বিপরীত দাবির মধ্যেই কেটে গেছে তিন দশক।

প্রথম তদন্ত: সিআইডির প্রতিবেদনে আত্মহত্যা

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। ১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয় সংস্থাটি।

সিআইডির ওই প্রতিবেদনে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু এ সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি তার পরিবার। সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী সিআইডির চূড়ান্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ঢাকার মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করেন। এভাবেই শুরু হয় দীর্ঘ আইনি লড়াই।

সিআইডির প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তির পর মামলাটি ২০০৩ সালের ১৯ মে বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। কিন্তু এই তদন্ত শেষ হতে সময় লাগে প্রায় এক যুগ। ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা পড়ে। এই প্রতিবেদনেও সালমান শাহর মৃত্যুকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপরও সন্তুষ্ট হয়নি পরিবার। ২০১৫ সালের ১৯ এপ্রিল সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী মহানগর দায়রা জজ আদালতে আবার রিভিশন আবেদন করেন। এর পরের বছর মামলাটি নতুন মোড় নেয়।

পরে পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ

২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বিশেষ জজ-৬-এর বিচারক ইমরুল কায়েস নীলা চৌধুরীর আবেদন মঞ্জুর করে মামলাটি তদন্তের জন্য পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) নির্দেশ দেন। সে মোতাবেক পিবিআই নতুন করে তদন্ত শুরু করে।

তদন্তে মামলার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়া হয়। পিবিআইয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংশ্লিষ্টদের জবানবন্দি গ্রহণে দীর্ঘ সময় লেগেছে। তদন্তে ১৬৪ ধারায় ১০ জনের জবানবন্দি নেওয়ার কথাও জানানো হয়। পাশাপাশি নতুন করে একটি ফ্যান আলামত হিসেবে জব্দ করার তথ্যও দেওয়া হয়। দীর্ঘ তদন্তের পর ২০২০ সালে পিবিআই তাদের সিদ্ধান্ত জানায়।

পিবিআই বললো খুন নয়, আত্মহত্যা

২০২০ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ধানমন্ডিতে সংবাদ সম্মেলন করে পিবিআই। সেখানে তৎকালীন পিবিআই প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, তদন্তে সালমান শাহকে হত্যার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পারিবারিক কলহ ও মানসিক যন্ত্রণার কারণে তিনি আত্মহত্যা করেছেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।

পিবিআইয়ের তদন্তে সালমান শাহর আত্মহত্যার পেছনে পাঁচটি কারণ উল্লেখ করা হয়। প্রথম ও প্রধান কারণ হিসেবে বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর ‘অতি-অন্তরঙ্গতা’। দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে আসে স্ত্রী সামিরার সঙ্গে দাম্পত্য কলহ। তৃতীয় কারণ হিসেবে পিবিআই উল্লেখ করে, সালমান শাহর অতিরিক্ত আবেগপ্রবণতা এবং একাধিকবার আত্মঘাতী হওয়ার বা আত্মহত্যার চেষ্টা। চতুর্থ কারণ হিসেবে বলা হয়, মায়ের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা এবং জটিল সম্পর্কের কারণে জমে থাকা অভিমান। পঞ্চম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, সন্তান না হওয়ায় দাম্পত্য জীবনে অপূর্ণতার অনুভূতি।

পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব বিষয় মিলিয়ে মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেন। পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে শাবনূরের সঙ্গে সালমান শাহর সম্পর্ককে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও শাবনূর এ অভিযোগ অস্বীকার করেন।

২০২০ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে শাবনূর বলেন, সালমান শাহ তার সহশিল্পী ও বন্ধু ছিলেন। এর বাইরে তাদের কোনো সম্পর্ক ছিল না। তিনি সালমানকে ভাইয়ের মতো শ্রদ্ধা করতেন বলেও জানান। সালমানকে বিয়ের জন্য চাপ দেওয়ার অভিযোগও সরাসরি অস্বীকার করেন শাবনূর।

তার বক্তব্য ছিল, সালমান তখন বিবাহিত ছিলেন এবং তার স্ত্রী সামিরার সঙ্গেও তার ভালো সম্পর্ক ছিল। শুটিংয়ের সময় সামিরা তাদের সঙ্গে থাকতেন বলেও জানান তিনি।

শাবনূর আরও বলেন, তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক থাকলে সেটি তখনই সবার চোখে পড়তো। এত বছর পর তাকে সালমানের মৃত্যুর সঙ্গে জড়িয়ে নানা কথা বলা হচ্ছে বলেও সে সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সালমান শাহর মামলার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই হয়েছে। ফলে এটি এখন শুধু ১৯৯৬ সালের একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং প্রায় তিন দশক ধরে চলা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি জটিল মামলা।—মাহিয়া বিনতে মাহবুব

সালমানের সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে ‘ব্যবসা’ করা হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেন শাবনূর। সালমানের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর তিনি এফডিসিতে গিয়ে তার মরদেহ দেখেছিলেন বলেও ওই সাক্ষাৎকারে জানান।

তবে পিবিআইয়ের প্রতিবেদনও মানেনি পরিবার

পিবিআইয়ের তদন্তের পরও সালমান শাহর পরিবার আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। সালমান শাহর মা পিবিআইয়ের প্রতিবেদনকে ‘ভুলে ভরা ও মনগড়া’ বলে প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি জানান, ছেলে আত্মহত্যা করেছে—এটি তারা মেনে নেননি। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে আদালতে নারাজি আবেদনও করা হয়।

২০২১ সালে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আইনজীবীর মাধ্যমে নীলা চৌধুরী এ নারাজি আবেদন জমা দেন। আবেদনে বলা হয়, সালমান শাহর অপমৃত্যুর মামলাটি সঠিকভাবে তদন্ত না করে এবং আসামিপক্ষের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে।

তিন দশক পর মামলার মোড়

পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও বিষয়টি শেষ হয়নি। সালমান শাহর পরিবারের দীর্ঘ আইনি লড়াই চলতে থাকে। ২০২৫ সালে মামলাটি আবার বড় ধরনের মোড় নেয়। ওই বছরের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনাকে ‘হত্যা মামলা’ হিসেবে গ্রহণের জন্য রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেন।

আদালতের ওই আদেশের পরদিন ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম বাদী হয়ে রমনা থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলাটি করা হয় দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায়। এভাবেই ১৯৯৬ সালে যে ঘটনা অপমৃত্যু মামলা দিয়ে শুরু হয়েছিল, প্রায় ২৯ বছর পর সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে হত্যা মামলায় রূপ নেয়।

মামলায় যাদের আসামি করা হয়েছে

হত্যা মামলায় সালমান শাহর সাবেক স্ত্রী সামিরা হক, তার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবি, আবদুস সাত্তার, সাজু এবং রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া কয়েকজন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়।

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, আসামিরা পরস্পর যোগসাজশে সালমান শাহকে হত্যা করেছেন। এজাহারে তার শরীরে আঘাতের বিভিন্ন চিহ্নের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে এবং ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়, পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করা হয়েছে। অন্যদিকে, সামিরা হক ও তার মা লতিফা হক লুসি হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।

ডনকে ঘিরে নতুন করে আলোচনায় মামলা

হত্যা মামলা হওয়ার পর দীর্ঘদিন পলাতক থাকা অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডনকে ঘিরে মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে।

২০২৬ সালের ৯ আগস্ট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন পর মামলার এজাহারনামীয় একজন আসামি গ্রেফতার হওয়ায় তদন্তে অগ্রগতি নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়। গ্রেফতারের পর তাকে আদালতে হাজির করা হলে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে তার জামিন আবেদনও নামঞ্জুর হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী আদালতে বলেন, ডন দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেলে দীর্ঘদিনের জন্য পলাতক হয়ে যেতে পারেন। এ কারণে তাকে কারাগারে রাখা প্রয়োজন।

শুনানিতে রাষ্ট্রপক্ষের পক্ষ থেকে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়। এক আসামির স্বীকারোক্তির বরাত দিয়ে ১২ লাখ টাকার বিনিময়ে সালমান শাহকে হত্যার চুক্তির কথা আদালতে তুলে ধরা হয়।

ডনের রিমান্ড

পরবর্তী সময়ে ডনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ডে চায় সিআইডি। গত ২৭ আগস্ট ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানা শুনানি শেষে ডনের পাঁচদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। সিআইডি তার সাতদিনের রিমান্ড চেয়েছিল।

রিমান্ড আবেদনে সিআইডি জানায়, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সালমান শাহর মৃত্যুর ‘প্রকৃত রহস্য’ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে ঘটনায় জড়িত অন্যদের শনাক্ত ও গ্রেফতার করা এবং কেউ পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে বা দেশ ছাড়তে সহায়তা করলে সে বিষয়ে তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনার কথাও বলা হয়।

রিমান্ড শুনানি ঘিরে আদালত চত্বরে সালমান শাহর ভক্তদেরও ভিড় জমে। সকাল থেকেই তারা মানববন্ধন করেন। তাদের হাতে থাকা একটি ব্যানারে লেখা ছিল—‘প্রিয় নায়ক ৩০ বছর ধরে কবরে, তার খুনিরা কেন বাইরে?’

ডনকে আদালতে নেওয়ার সময় এবং শুনানি শেষে বের করার সময় কয়েকজন ভক্ত দুয়োধ্বনি দেন। একপর্যায়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হওয়ার আশঙ্কায় পুলিশ দ্রুত তাকে সরিয়ে নেয়। ভক্তদের দাবি ছিল, দীর্ঘ ৩০ বছর পর হলেও প্রকৃত ঘটনা বের করতে হবে এবং যারা দায়ী তাদের আইনের আওতায় এনে বিচার করতে হবে।

পুরোনো তদন্তে ১৬৪ ধারার জবানবন্দির প্রসঙ্গ

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে হত্যা মামলা ও তদন্ত শুরু হলেও তিন দশকের পুরোনো তদন্তের নথিপত্রও বর্তমান তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, এই দীর্ঘ সময়ে মামলাটি ঘিরে একাধিক তদন্ত, আদালতের নির্দেশ, প্রতিবেদন এবং বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। বর্তমান তদন্তে এসব পুরোনো নথি ও বক্তব্য যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে বলে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

ঢাকা মহানগর আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী জাগো নিউজকে বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় অতীতে একাধিক তদন্ত ও প্রতিবেদন হয়েছে। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে সালমান শাহর পরিবার এসব তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে আদালতে রিভিশন আবেদনও করেছে।

তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, মামলার ১২ নম্বর আসামি রেজভী আহমেদ ওরফে ফারহাদ অতীতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় একটি স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। ওই জবানবন্দিতে সালমান শাহকে কারা এবং কীভাবে হত্যা করেছিল—সে বিষয়ে তথ্য বা বর্ণনা ছিল বলে দাবি করছেন তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। তবে ওই জবানবন্দিতে কী বলা হয়েছিল, সেটি কতটা নির্ভরযোগ্য এবং সেখানে উল্লেখ করা তথ্যের সঙ্গে বর্তমান মামলার অভিযোগের কতটা মিল রয়েছে—এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো তদন্তসাপেক্ষ।

‘শুধু কোনো জবানবন্দিতে কোনো বক্তব্য থাকার অর্থই সেই বক্তব্য আদালতে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন নয়। বর্তমান তদন্তে এর সত্যতা, পারিপার্শ্বিক আলামত এবং অন্যান্য সাক্ষ্য-প্রমাণের সঙ্গে মিলিয়ে বিষয়টি যাচাই করার কথা।’

দীর্ঘদিন আগের কোনো মামলায় তদন্ত শেষ করতে সময় লাগার অন্যতম কারণ হতে পারে—পুরোনো নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পুনরায় যাচাই করা এবং নতুন করে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্য খুঁজে দেখা।—মাহিয়া বিনতে মাহবুব

পিপি ওমর ফারুক ফারুকী আরও বলেন, ডনের পাঁচদিনের রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে সালমান শাহর মৃত্যুর বিষয়ে নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না, অন্য আসামিদের ভূমিকা সম্পর্কে কী তথ্য বেরিয়ে আসে এবং ডনের বিদেশে পালানোর চেষ্টার পেছনে কারও ইন্ধন ছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখবে তদন্ত সংস্থা। ফলে বর্তমান তদন্তের পরিধি শুধু নতুন করে দায়ের হওয়া হত্যা মামলার এজাহারে থাকা অভিযোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বলেন, প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো তদন্তের নথি, আগের তদন্ত প্রতিবেদন, বিভিন্ন ব্যক্তির জবানবন্দি, আদালতের নথিপত্র, পুরোনো আলামত এবং নতুন মামলায় উঠে আসা অভিযোগ—সবকিছুই মিলিয়ে দেখার প্রয়োজন হচ্ছে তদন্ত কর্মকর্তাদের। বিশেষ করে অতীতে দেওয়া কোনো জবানবন্দিতে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য থাকার দাবি থাকলে, সেই বক্তব্যের সঙ্গে বর্তমান মামলার এজাহারে করা অভিযোগ, অন্য আসামিদের ভূমিকা এবং বিদ্যমান আলামতের কোনো সামঞ্জস্য আছে কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

কেন এতো বছরেও শেষ হয়নি তদন্ত?

সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা অন্য অনেক পুরোনো মামলার চেয়ে আলাদা। কারণ, প্রায় ৩০ বছরে এই একটি ঘটনাকে ঘিরে একাধিক তদন্ত হয়েছে, আদালতে হয়েছে দীর্ঘ আইনি লড়াই এবং প্রতিটি পর্যায়ে উঠে এসেছে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত ও ব্যাখ্যা। প্রথম তদন্তে সিআইডি সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করে। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্যে ২০০৩ সালে মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠানো হয়। প্রায় ১২ বছর পর ২০১৪ সালে দেওয়া সেই তদন্ত প্রতিবেদনেও ঘটনাটিকে ‘অপমৃত্যু’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

এরপর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে মামলাটি পিবিআইকে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়। পিবিআইও দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে জানায়, সালমান শাহকে হত্যা করা হয়নি; তিনি আত্মহত্যা করেছিলেন। সংস্থাটি এর পেছনে পারিবারিক কলহসহ পাঁচটি কারণের কথা উল্লেখ করে। কিন্তু সালমান শাহর পরিবার পিবিআইয়ের সেই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা তদন্ত প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে আদালতে নারাজি আবেদন করে।

এরপর দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। ফলে একই মৃত্যুকে ঘিরে তদন্তের বিভিন্ন পর্যায়ে তৈরি হয়েছে ভিন্ন ভিন্ন আইনি অবস্থান।

ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুবের দৃষ্টিতে, এ ধরনের দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ায় আগের তদন্তের সিদ্ধান্ত, পরবর্তী আপত্তি, নতুন করে পাওয়া তথ্য এবং আদালতের নির্দেশ—সবকিছুই পরবর্তী তদন্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিশেষ করে আগের তদন্তের কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর আদালতের নির্দেশে নতুন করে তদন্ত শুরু হলে তদন্তকারী সংস্থাকে পুরোনো নথি ও নতুন অভিযোগ—দুই দিকই বিবেচনায় নিতে হয়।

‘সালমান শাহর মামলার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটিই হয়েছে। ফলে এটি এখন শুধু ১৯৯৬ সালের একটি মৃত্যুর ঘটনা নয়; বরং প্রায় তিন দশক ধরে চলা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার একটি জটিল মামলা’—বলছিলেন মাহিয়া বিনতে মাহবুব।

তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে বারবার অপেক্ষা

২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণের পর মামলাটির তদন্তের দায়িত্ব পায় সিআইডি। নতুন তদন্তে আগের তদন্ত প্রতিবেদন, পুরোনো নথিপত্র, বিভিন্ন ব্যক্তির বক্তব্য এবং মামলায় নতুন করে উত্থাপিত অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার তারিখ একাধিকবার পিছিয়েছে।

সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য ছিল। কিন্তু সিআইডির তদন্ত কর্মকর্তা পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদ ওই দিন প্রতিবেদন জমা দিতে পারেননি। পরে আদালত নতুন করে ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য করেন। অর্থাৎ, ৬ সেপ্টেম্বর সালমান শাহর মৃত্যুর ৩০ বছর পূর্ণ হলেও তার মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলার তদন্ত তখনো শেষ হয়নি।

আইনজীবী মাহিয়া বিনতে মাহবুব বলেন, দীর্ঘদিন আগের কোনো মামলায় তদন্ত শেষ করতে সময় লাগার অন্যতম কারণ হতে পারে—পুরোনো নথি ও সাক্ষ্য-প্রমাণ পুনরায় যাচাই করা এবং নতুন করে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে সেগুলোর সামঞ্জস্য খুঁজে দেখা। বিশেষ করে আগের তদন্তের সিদ্ধান্তের সঙ্গে নতুন তদন্তের অভিযোগের পার্থক্য থাকলে তদন্তকারী সংস্থাকে প্রতিটি বিষয় যাচাই করে একটি গ্রহণযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হয়।

৩০ বছর পরও দুই বিপরীত অবস্থান

সালমান শাহর মৃত্যুকে ঘিরে এখন মূলত দুটি বিপরীত অবস্থান সামনে রয়েছে। একদিকে রয়েছে আগের তদন্তগুলোর সিদ্ধান্ত। সিআইডি ১৯৯৭ সালে তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করেছিল। পরে পিবিআইও দীর্ঘ তদন্ত শেষে একই সিদ্ধান্তে পৌঁছায়। পিবিআইয়ের তদন্তে পারিবারিক কলহ, নায়িকা শাবনূরের সঙ্গে কথিত ঘনিষ্ঠতা, আবেগপ্রবণতা, মায়ের সঙ্গে অভিমান এবং সন্তান না হওয়ার কারণে দাম্পত্য জীবনের অপূর্ণতাসহ পাঁচটি কারণের কথা বলা হয়েছিল।

অন্যদিকে, সালমান শাহর পরিবার শুরু থেকেই তার মৃত্যুকে হত্যাকাণ্ড বলে দাবি করে আসছে। পিবিআইয়ের তদন্ত প্রতিবেদনও তারা প্রত্যাখ্যান করেন। পরে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ২০২৫ সালে ঘটনাটি হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়। এরপর নতুন করে তদন্তে নামে সিআইডি।

ফেসবুক মন্তব্যে হত্যার হুমকি

চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলা নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি না করার’ হুমকি পেয়েছেন মামলার বাদী ও সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম। গত ১২ আগস্ট ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সালমান শাহর ভক্ত পরিচয় দেওয়া ‘মামুন’ নামে এক ব্যক্তির ফেসবুক লাইভের মন্তব্যে ‘শাকিল কিবরিয়া (Shakil Kibria)’ নামের একটি আইডি থেকে এ হুমকি দেওয়া হয়। হুমকি বার্তায় মামলা নিয়ে বেশি এগোলে সালমান শাহর ভাই শাহরানকেও ‘একইভাবে’ হত্যা করা হবে বলে বলা হয়। পরে মন্তব্যটি মুছে ফেলা হয়।

এ ঘটনায় রমনা মডেল থানায় জিডি করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানান আলমগীর কুমকুম। সালমান ভক্ত পরিচয় দেওয়া মামুন বলেন, মানববন্ধনের আহ্বান জানিয়ে ফেসবুক লাইভে থাকার সময় ওই মন্তব্য আসে। তিনি হুমকির বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের শনাক্তের দাবি জানান।

ভক্তদের দাবি—সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার

২০২৬ সালের ২৭ আগস্ট ডনের রিমান্ড শুনানিকে কেন্দ্র করে ঢাকার আদালত চত্বরে মানববন্ধন করেন সালমান শাহর ভক্তরা। এসময় তারা সামিরাসহ মামলার অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার এবং সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে বিচারের দাবি জানান।

মানববন্ধনে অংশ নেওয়া সালমান ভক্ত মাসুদ রানা বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর নেপথ্যে যারা দায়ী, তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

‘সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা বের করে আনতে হবে। ন্যায়বিচারের স্বার্থে সামিরাসহ অন্য আসামিদের দ্রুত গ্রেফতার করতে হবে’—বলছিলেন আরেক ভক্ত মৌসুমী হক।

ডনের দাবি—‘আমি জড়িত নই’

সালমান শাহ হত্যা মামলার আসামি অভিনেতা আশরাফুল হক ওরফে ডন তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। ৯ আগস্ট বিমানবন্দর থেকে গ্রেফতারের পর তিনি দাবি করেন, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকলে এত বছর বাংলাদেশে থাকতেন না; বরং বহু আগেই বিদেশে চলে যেতেন।

ডন দাবি করেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই এবং তিনি আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন। তবে সিআইডি তার রিমান্ড চেয়ে আদালতে জানায়, তাকে জিজ্ঞাসাবাদে সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য, অন্য আসামিদের ভূমিকা এবং কেউ তাকে বিদেশে পালাতে সহযোগিতা বা উৎসাহ দিয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে তথ্য পাওয়া যেতে পারে।

সামিরার দাবি—‘সালমান আত্মহত্যা করেছিলেন’

মামলার প্রধান আসামি সামিরা হক ও তার মা লতিফা হক লুসি সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। তাদের দাবি, পারিবারিক কলহ ও মানসিক অবসাদের কারণে সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন। পূর্ববর্তী তদন্তে পিবিআইও তার মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলে উল্লেখ করেছিল। সামিরা ও তার আইনজীবীরা সেই তদন্তের অবস্থানকে সঠিক বলে মনে করেন।

তদন্ত কর্মকর্তার বর্তমান পদক্ষেপ

বর্তমান তদন্তের বিষয়ে তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক জিয়াউল মোর্শেদের সরাসরি কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তদন্তে তার নেওয়া পদক্ষেপ থেকে অগ্রগতির কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।

তদন্তের অংশ হিসেবে গত ২০ মে সালমান শাহর মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আদালতে আবেদন করেন জিয়াউল মোর্শেদ। আদালত পরে মরদেহ উত্তোলনের অনুমতি দেন। এরপরও তদন্ত প্রতিবেদন এখনো জমা পড়েনি।

সর্বশেষ গত ৩০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন ধার্য থাকলেও তদন্ত কর্মকর্তা তা জমা দিতে পারেননি। পরে আদালত আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর প্রতিবেদন দাখিলের নতুন দিন নির্ধারণ করেন। এ নিয়ে তদন্ত কর্মকর্তা নবম বারের মতো সময় পেলেন।