কুমিল্লা শহরের গুরুত্বপূর্ণ কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কটি যেন এখন দুর্ভোগের আরেক নাম। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় সড়কের বিভিন্ন অংশে তৈরি হয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় গর্ত। কোথাও উঠে গেছে পিচ, কোথাও ভেঙে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। সামান্য বৃষ্টিতেই এসব গর্তে পানি জমে যায়। তখন কোনটি গর্ত আর কোনটি সমতল সড়ক, তা বোঝারও উপায় থাকে না। ফলে হাসপাতালের সামনে এলেই ধীর হয়ে যায় যানবাহনের গতি। সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনরা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কের বিভিন্ন অংশের পিচ উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। বৃষ্টির পানি জমে থাকায় অনেক গর্তের গভীরতা বোঝা যায় না। ঝুঁকি নিয়ে এসব গর্ত পার হচ্ছেন মোটরসাইকেল, সিএনজি অটোরিকশা, অটোরিকশা, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অ্যাম্বুলেন্স। গর্ত এড়িয়ে চলতে গিয়ে অনেক সময় যানবাহনকে হঠাৎ গতি কমিয়ে দিতে হচ্ছে। এতে সড়কটিতে তৈরি হচ্ছে যানজটও।
তবে এই দুর্ভোগের সবচেয়ে ভয়াবহ চিত্র দেখা যায় রোগীবাহী যানবাহনের ক্ষেত্রে। জরুরি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ছুটে আসা রোগীকে নিয়ে অ্যাম্বুলেন্স যখন ভাঙাচোরা অংশে পৌঁছায়, তখন চালককে বাধ্য হয়ে গতি কমাতে হয়। সড়কের প্রতিটি গর্ত পার হওয়ার সময় অ্যাম্বুলেন্সের ভেতরে থাকা রোগীর শরীর ঝাঁকুনি খায়। গুরুতর অসুস্থ, প্রসূতি, দুর্ঘটনায় আহত কিংবা অস্ত্রোপচারের জন্য হাসপাতালে নেওয়া রোগীদের ক্ষেত্রে এই ঝাঁকুনি আরও কষ্টকর হয়ে ওঠে।
লালমাই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজন হোসনেয়ারা বেগম বলেন, রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়েছি। কিন্তু হাসপাতালের কাছাকাছি এসে গাড়ির গতি কমে যায়। রাস্তার অবস্থা এমন যে একটু দ্রুত চালালেই রোগী প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খান। চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে আসার পথেই যদি রোগীর কষ্ট বাড়ে, তাহলে বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক।
আরেক রোগীর স্বজন জহির হোসেন বলেন, হাসপাতালের সামনে এসে মনে হয় আমরা কোনো ব্যস্ত শহরের সড়কে নয়, ভাঙা কোনো গ্রামীণ রাস্তায় ঢুকে পড়েছি। বিশেষ করে বৃষ্টির সময় পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। রোগীকে গাড়ি থেকে নামানো এবং হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও দুর্ভোগ পোহাতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল শুধু কুমিল্লা জেলার মানুষের চিকিৎসাকেন্দ্র নয়, আশপাশের একাধিক জেলার মানুষেরও অন্যতম প্রধান ভরসা। কুমিল্লার পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চাঁদপুর, লক্ষ্মীপুর, ফেনী ও নোয়াখালীসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন রোগীরা এখানে আসেন। বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও জেলা হাসপাতাল থেকে জটিল রোগীদেরও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ফলে হাসপাতালমুখী এই সড়কে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের চলাচল থাকে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন প্রায় চার হাজার রোগী হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা গ্রহণ করেন। বিপুলসংখ্যক রোগীর পাশাপাশি তাদের স্বজন, চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স ও অন্যান্য যানবাহনের চাপ রয়েছে সড়কটিতে। অথচ এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি সড়ক দীর্ঘদিন ধরে ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
স্থানীয় ময়নামতি ফার্মেসির স্বত্বাধিকারী জামাল হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বিভিন্ন অংশ ভাঙাচোরা। হাসপাতালের সামনে হওয়ায় এখানে রোগী ও স্বজনদের যাতায়াত সবচেয়ে বেশি। সড়কের অবস্থা খারাপ থাকায় ব্যবসায়ীরাও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। দ্রুত সংস্কার না করলে বর্ষায় দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে রাত পর্যন্ত এই সড়কে মানুষের চাপ থাকে। গর্তের কারণে যানবাহন ধীরে চলায় প্রায়ই যানজট তৈরি হয়। হাসপাতালের রোগীদের দুর্ভোগই সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। দ্রুত সড়কটি সংস্কার করা দরকার।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, শুধু সড়কের গর্ত ভরাট করলেই হবে না, পানি যাতে জমতে না পারে সে ব্যবস্থাও করতে হবে। কারণ বৃষ্টি হলে গর্তগুলো পানিতে ডুবে যায় এবং তখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। স্থায়ীভাবে সংস্কার না করলে কয়েক মাস পর আবার একই সমস্যা দেখা দেবে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সড়কটির বেহাল দশা থাকলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। বর্ষা এলেই গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ কয়েক গুণ বেড়ে যায়। কোথাও কোথাও সড়কের ভাঙা অংশ আরও প্রশস্ত হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে শুধু যানবাহন চলাচলই নয়, পথচারীদের জন্যও বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এলাকাবাসীর দাবি, বর্ষা শেষে সড়কটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কার করে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন চলাচলের ব্যবস্থা করতে হবে। আর স্থায়ী সংস্কার শুরু হওয়ার আগ পর্যন্ত বড় গর্তগুলো দ্রুত ভরাট করে অন্তত অ্যাম্বুলেন্স ও রোগীবাহী যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখতে হবে।
এ বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, সড়কটি সংস্কারের জব্য টেন্ডার প্রক্রিয়া হয়েছে। বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের প্রক্রিয়া শেষেই কাজ শুরু হবে৷ আপাতত মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে সাময়িকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে৷
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, চিকিৎসার জন্য যেখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসেন, সেই হাসপাতালের সামনের সড়কের দুরবস্থা আর কতদিন চলবে। তাদের প্রত্যাশা, শুধু আশ্বাসে সীমাবদ্ধ না রেখে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে এবং বর্ষা শেষে সড়কটির স্থায়ী সংস্কার করা হবে। যাতে হাসপাতালের পথে এসে কোনো রোগীকে আর সড়কের গর্তের ঝাঁকুনিতে অতিরিক্ত কষ্ট পেতে না হয়।