ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে বাঁকে বাঁকে মৃত্যুকূপ

বিশেষ প্রতিনিধি ।।
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে ৫৪টি বিপজ্জনক ইউটার্ন ও পাঁচ শতাধিক ফিডার রোড যেন মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে। এসব ইউটার্ন ও সংযোগ সড়কে প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। ঝরছে প্রাণ, পঙ্গুত্ব বরণ করছেন অনেকে। স্বজন হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে পরিবার। অথচ দুর্ঘটনার ঝুঁকিপূর্ণ স্থান ও কারণ চিহ্নিত থাকলেও প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। বিশেষ করে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ও আলেখারচর বিশ্বরোড ইউটার্নে দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
হাইওয়ে পুলিশের সমীক্ষা অনুযায়ী, মহাসড়কে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ বিপজ্জনক ও অনিয়ন্ত্রিত ইউটার্ন, ধীরগতির যানবাহনের জন্য পৃথক লেন বা সার্ভিস রোডের অভাব, পাঁচ শতাধিক অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ফিডার রোড এবং মহাসড়কের পাশে অপরিকল্পিত বাজার ও স্থাপনা। এ ছাড়া ফুটওভার ব্রিজ থাকা সত্ত্বেও পথচারীদের তা ব্যবহারে অনীহা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। হাইওয়ে পুলিশের দাবি, এসব কারণে মহাসড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনার প্রায় ৭০ শতাংশ ঘটে।
সম্প্রতি কুমিল্লার পদুয়ার বাজার ইউটার্নে বাসের ইউটার্ন নেওয়ার সময় বিপরীত দিক থেকে আসা একটি লরি সেটিকে এড়াতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। লরির নিচে চাপা পড়ে একটি প্রাইভেটকার ও অটোরিকশা। ঘটনাস্থলেই একই পরিবারের চারজন—বরুড়া উপজেলার হোসেনপুরের ওমর আলী, তাঁর স্ত্রী নূরজাহান বেগম এবং দুই ছেলে আবুল হাসেম ও আবুল কাসেম নিহত হন। এ ঘটনায় অটোরিকশার কয়েকজন যাত্রীও আহত হন।
এর আগে মহাসড়কের কালাকচুয়া এলাকায় হোটেল মিয়ামির সামনে ইউটার্ন নেওয়ার সময় একটি প্রাইভেটকারকে বিপরীত দিক থেকে আসা বাস ধাক্কা দেয়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন নোয়াখালীর সোনাইমুড়ীর মুফতি মাওলানা আবদুল মমিন, তাঁর স্ত্রী ঝর্ণা বেগম, মেয়ে লাবিবা, ছেলে সাইফ এবং প্রাইভেটকারচালক জামাল হোসেন। এসব দুর্ঘটনা মহাসড়কের ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নগুলো নিরাপদ করার প্রয়োজনীয়তাকে আরও স্পষ্ট করেছে।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা অঞ্চলের দায়িত্বের আওতায় পার্বত্য এলাকা বাদে চট্টগ্রাম বিভাগের প্রায় ৭৮০ কিলোমিটার মহাসড়ক ও আঞ্চলিক সড়ক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও প্রাইভেটকারের সঙ্গে একই লেনে মোটরসাইকেল, সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ ধীরগতির যানবাহন চলাচল করায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন যাতায়াত ও জরুরি প্রয়োজনে ছোট যানবাহনের ওপর নির্ভরতা থাকায় এগুলোর জন্য পৃথক সার্ভিস রোড বা লেন নির্মাণ জরুরি।
কুমিল্লা বাস মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মো. তাজুল ইসলাম বলেন, মহাসড়কে ধীরগতির ছোট যানবাহন চলাচল বন্ধ করা অথবা এগুলোর জন্য পৃথক সার্ভিস লেন চালুর দাবি দীর্ঘদিনের। জাতীয় পর্যায়ে বিষয়টি বারবার তুলে ধরা হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সড়ক ও জনপথ (সওজ) কুমিল্লার নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফা বলেন, ইউটার্নগুলোতে প্রায়ই দুর্ঘটনার খবর পাওয়া যায়। এসব স্থানে লাগানো প্রতিফলক স্টিকার অনুসরণ করলে দুর্ঘটনা কমতে পারে। দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় সড়কচিহ্ন ও সংকেত বাড়ানো হবে। ফিডার রোডগুলোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ সিদ্ধান্ত নেবে।
হাইওয়ে পুলিশ কুমিল্লা অঞ্চলের পুলিশ সুপার মঞ্জুর মোর্শেদ বলেন, মহাসড়কে শৃঙ্খলা ফেরানো ও দুর্ঘটনা রোধে নিয়মিত অভিযান এবং সচেতনতামূলক কার্যক্রম চলছে। তবে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে ধীরগতির মোটরসাইকেল ও অটোরিকশা একই লেনে চলায় ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে। মহাসড়ক নিরাপদ করতে ছোট যানবাহনের জন্য পৃথক লেনের বিকল্প নেই।
মহাসড়কে দুর্ঘটনা কমাতে শুধু সচেতনতামূলক প্রচার কিংবা নিয়মিত অভিযান যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ ইউটার্নের নকশা ও ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা, ফিডার রোডের নিরাপদ সংযোগ, পর্যাপ্ত সড়কচিহ্ন এবং ধীরগতির যানবাহনের জন্য নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের এসব বিপজ্জনক স্থানে দুর্ঘটনা ঘটতেই থাকবে, আর স্বজন হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াতে হবে আরও বহু পরিবারকে।