নীলফামারী পৌর চত্বর থেকে মাত্র ১৫০ টাকা ভাড়া নিয়ে একটি মিশুকে আমরা রওনা হলাম নীলসাগরের উদ্দেশে। দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। শহরের কোলাহল ধীরে ধীরে পেছনে ফেলে যখন আমরা এগোতে লাগলাম, তখন পথের দুই পাশে চোখে পড়তে শুরু করল সারি সারি উঁচু পাটগাছ। দৃশ্যটা দেখে মনটা হঠাৎ করেই ভরে উঠল এক অদ্ভুত অনুভূতিতে। স্মৃতি আর বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক নীরব দীর্ঘশ্বাসে।
শৈশবের দিনগুলো মনে পড়ে গেল। তখন স্কুলের খাতায় কতবার যে রচনা লিখেছি “সোনালি আঁশ পাট”। পাট ছিল আমাদের গর্ব, ছিল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। অথচ সময়ের স্রোতে সেই দিনগুলো আজ প্রায় ইতিহাস। আদমজীসহ দেশের অধিকাংশ পাটকল বন্ধ হয়ে যাওয়ায়, আর রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতার অভাবে পাটশিল্প আজ হারিয়ে যাওয়ার পথে। তবু নীলফামারীতে এসে যেন এক ব্যতিক্রম দৃশ্য দেখলাম। এখানে এখনো ব্যাপকভাবে পাট চাষ হয়। ক্ষেতজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা, সবুজ পাটগাছগুলো দেখে মনে হলো সোনালি আঁশ হয়তো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, এখনও কিছু জমিনে সে তার অস্তিত্ব আঁকড়ে ধরে আছে।
নীলফামারীর পথে পথে এই পাটক্ষেতগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই যে, একসময় যে পাট আমাদের অর্থনীতির মেরুদণ্ড ছিল, আজ তা প্রায় অতীতের গল্প। বাস্তবতা আর স্মৃতির এই দ্বন্দ্ব নিয়েই আমরা এগোতে থাকলাম আঁকাবাঁকা গ্রামীণ পথ ধরে। পথের প্রতিটি বাঁক যেন নতুন করে খুলে দিচ্ছিল উত্তরবঙ্গের প্রকৃতির সৌন্দর্য আর মানুষের জীবনের গল্প।
বেলা প্রায় দুপুর ১২টা। আমরা পৌঁছে গেলাম নীলসাগরের প্রবেশ গেটে। বিশাল জলরাশির আগে দাঁড়িয়ে মনে হলো, এই যাত্রা শুধু একটি ভ্রমণ নয়, এটি সময়, স্মৃতি ও দায়বদ্ধতার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলার এক নীরব পথচলা।
আমাদের এই যাত্রাপথের সঙ্গী ছিল যে মিশুকটি, তার চালকের নাম মোশারফ। অল্প কথাতেই বোঝা গেল, তার জীবনের গল্পটাও কম জটিল নয়। এসএসসি পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে মনের দুঃখে একদিন সে নীলফামারী ছেড়ে পাড়ি জমায় ঢাকায়। ভাগ্যের সন্ধানে যাওয়া সেই ঢাকাই তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কয়েক মাস পর পরিচয় হয় ময়মনসিংহের এক তরুণীর সঙ্গে। সেই পরিচয়ই তাকে নিয়ে আসে কুমিল্লা ইপিজেড পর্যন্ত কাজের খোঁজে, ভবিষ্যতের আশায়।
কিন্তু জীবন সব সময় মানুষের পরিকল্পনা অনুযায়ী চলে না। কুমিল্লায় এসে মোশারফ পড়ে যায় এক মহা বিপাকে। ঘটনাচক্রে সেই সম্পর্কই তাকে বাধ্য করে একটি অপ্রত্যাশিত সিদ্ধান্তে বিয়ে। জীবনের এই বাঁকটি মোশারফের জন্য যেমন হঠাৎ করে আসা, তেমনি গভীরভাবে তা বদলে দেয় তার জীবনের গতিপথ। এই গল্পের বিস্তারিত বিবরণ থাকবে বইয়ের পরবর্তী অংশে যেখানে ব্যক্তি জীবনের দায়, সমাজের চাপ আর বাস্তবতার সংঘর্ষ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
নীলসাগরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে আমি বুঝতে পারছিলাম এই যাত্রা কেবল প্রকৃতি দেখার নয়, এটি মানুষের জীবন, হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আর বর্তমানের টিকে থাকার সংগ্রামকে কাছ থেকে দেখারও এক অনিবার্য অভিজ্ঞতা।
নীলসাগরে প্রবেশ ,লাইভ সম্প্রচার ও অজানা ইঙ্গিত :
নীলসাগরের প্রবেশপথে পৌঁছাতেই চোখে পড়ে এক বিশাল ও নান্দনিক তোরণ। দূর থেকেই সেটি যেন ঘোষণা দিচ্ছে এখানে প্রকৃতি ইতিহাসের সঙ্গে হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। তোরণের বাম পাশে ছোট একটি টিকিট কাউন্টার। সেখানে দায়িত্বে থাকা টিকিট মাস্টার আমাদের জানালেন, প্রবেশমূল্য জনপ্রতি ২০ টাকা। বড় গাড়ির জন্য ১০০ টাকা, আর ছোট গাড়ির জন্য ৫০ টাকা নির্ধারিত। আমরা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে ‘কুমিল্লার জমিন’-এর জন্য লাইভ সম্প্রচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। ক্যামেরা সেটআপ, মোবাইল নেটওয়ার্ক যাচাই, শব্দ পরীক্ষা সবকিছু মিলিয়ে চেনা এক সাংবাদিকতার ব্যস্ততা। ঠিক তখনই টিকিট মাস্টার আমাদের দিকে এগিয়ে এসে একটু কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “স্যার, আপনারা কি সাংবাদিক?” আমি সম্মতি সূচক মাথা নেড়েই বললাম, “জি।”এই একটি শব্দেই যেন পরিস্থিতি বদলে গেল। হাসিমুখে তিনি বললেন,
“তাহলে আপনাদের টিকিট কাটতে হবে না। তবে একটা অনুরোধ আছে,আপনাদের টিভিতে আমার একটা বক্তব্য নেবেন।”
এই ছোট্ট কথোপকথনের মধ্যেই সাংবাদিকতার অদৃশ্য শক্তিটা আবারও টের পেলাম। পরিচয় কখনো কখনো দরজা খুলে দেয়, কখনো আবার ভবিষ্যতের দায় ডেকে আনে । সেই দায়ের ওজন তখনো আমি পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারিনি।
দিনটি ছিল পবিত্র শুক্রবার। জুমার নামাজের সময় ঘনিয়ে আসছিল। তার ওপর আকাশে হালকা গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সময়, আবহাওয়া আর দায়িত্ব সবকিছুর চাপ নিয়েই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম, এখানেই লাইভ শুরু করতে হবে।
নীলসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে, বৃষ্টিভেজা বাতাসে ভিজে, আমরা ‘কুমিল্লার জমিন’-এ সরাসরি সম্প্রচার শুরু করলাম। ইতিহাস, প্রকৃতি, মানুষের আনাগোনা সবকিছু মিলিয়ে প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে আমরা নীলসাগর ঘুরে ঘুরে লাইভ করলাম। কখনো ক্যামেরার সামনে দিঘির নীল জলরাশি, কখনো অতিথি পাখির আনাগোনা, আবার কখনো মানুষের মুখের ভাষায় উঠে এলো এই জায়গার গল্প।
লাইভ চলাকালীন সময়েই লক্ষ্য করলাম অনেক দর্শক সরাসরি সম্প্রচারে যুক্ত হচ্ছেন। মন্তব্য আসছে, প্রশ্ন আসছে, শুভেচ্ছা আসছে। মনে মনে এক ধরনের কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম। আমি জানি, একজন উপস্থাপক হিসেবে আমার সীমাবদ্ধতা আছে। উচ্চারণে, উপস্থাপনায়, কখনো কখনো শব্দের নির্বাচনে। তবু আল্লাহর অশেষ রহমতে দর্শকরা আমাকে গ্রহণ করেছেন এই উপলব্ধি আমাকে ভেতর থেকে শক্তি দিল। এই ভেতরের শক্তি প্রতি নিয়ত আমি অনুভব করি। মনের গভীর থেকে মহান প্রভুর কাছে শুকরিয়া আদায় করলাম।
তখনো আমি জানতাম না এই সাধারণ মনে হওয়া একটি লাইভ সম্প্রচারই ভবিষ্যতে আমার জীবনের একটি বড় মোড় ঘুরিয়ে দেবে। তখনো বুঝিনি, নীলসাগরের পাড়ে দাঁড়িয়ে করা এই সম্প্রচারই আমাকে একদিন একই সঙ্গে ‘হিরো’ এবং ‘ভিলেন’ বানানোর পথ প্রশস্ত করে রাখছে। সময়ই হয়তো একদিন সেই অজানা ইঙ্গিতের পর্দা সরিয়ে দেবে। চলবে।