আত্মহত্যা ঠেকান, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা করুন

অধ্যাপক ডা: মোসলেহ উদ্দিন আহমেদ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ মাস আগে

দেশের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা বিষয়ক একটি জরিপে দেখা যায় মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিম্ববিদ্যালয় পর্যন্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ২০২২ সালের জানুয়ারী থেকে আগষ্ট পর্যন্ত ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের ১৫০টি জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা থেকে এ জরিপটির উপাত্ত সরবরাহ করা হয়েছে। এর পূর্বে ২০২১ সালে সারাদেশে ১০১ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার এ সংখ্যা গোটা জাতীর জন্য উদ্বেগজনক। বিম্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বাংলাদেশ মানসিক চিকিৎসক সমাজ ও স্বাস্থ্য মহাপরিচালকের দপ্তর এ ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষন, আত্মহত্যা প্রতিরোধ ও সামলানোর ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা এখন দেশের প্রয়োজনে অগ্রাধিকার পাওয়ার বিষয়। ক্লিনিকেল সাইকোলজি, মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সমাজকর্মীদের কর্মকান্ডের সমন্বয় ঘটানো এখন সমাজের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় একটি ব্যাপার।
শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা ও মনের যত্মের কৌশলগুলো তুলে ধরতে হবে। মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ও আত্মহত্যা প্রতিরোধে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মনরোগ বিশেষজ্ঞ নিয়োগ করা জাতীর জন্য একটি জরুরী ব্যাপার। স্কুল কলেজে পাঠ্যসূচীতে মানসিক স্বাস্থ্য ও আত্মহত্যা সম্পর্কিত বিষয়াবলী রাখার জন্য শিক্ষা মন্ত্রনালয়কে নির্দেশ প্রদান করতে হবে। প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশিক্ষণ প্রদান করতে হবে। সহশিক্ষা কায্যক্রমে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি আরও বেগবান করা উচিত। মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভ্রাম্যমান ক্যাম্পেইন পরিচালনায় সুযোগ সৃষ্টি করা অত্যবশ্যক। আপত্তিকর ছবি, হতাশা, জীবন নাশের পোষ্ট, আত্মহত্যার লাইভ ষ্ট্রিমিং ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করার ও প্রচার সীমিত করার জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিশেষ টুলস ব্যবহার কমানো এখন সামাজিক দাবী। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা দ্রুত ও সহজলভ্য করতে একটি টোল ফ্রি জাতীয় হটলাইন নম্বর চালু করা উচিত। আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে নাপারাকে আত্মহত্যার অন্যতম একটি কারণ হিসাবে গন্য করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন শিক্ষার্থী পরিবার থেকে কোন কিছু না পেয়ে অভিমান করেও আত্মহত্যা করছে। এটি রোধ করতে বড় ধরনে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। শিক্ষা অবস্থা থেকেই শিক্ষার্থীদের মনোবল শক্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি আত্মহত্যার ঘটনাগুলো আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে।
আফ্রিকায় আত্মহত্যার হার বেশি। ৭ই অক্টোবর’২২ জাতিসংঘ এ তথ্য জানিয়েছে। ডব্লিউএইচও আফ্রিকা শাখা থেকে জানিয়েছে প্রতিবছর এক লাখ জনে ১১জনই আত্মহত্যা করে মারা যান। আর গোটা বিশ্বে প্রতিবছর একলাখ জনে ৯ জন আত্মহত্যায় মৃত্যুবরন করে। আফ্রিকায় বেশির ভাগ আত্মহত্যায় ফাঁসি দিয়ে বা বিষ খেয়ে । অসম্মানবোধ করা বা অর্থের অভাবই আত্মহত্যার মূল কারণ বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। আত্মহত্যা একটি প্রধান জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এই মৃত্যু একটি ট্রাজেডি, দূর্ভাগ্যবশত: জাতীয় স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে আত্মহত্যা প্রতিরোধ খুব কমই অগ্রাধিকার পায়। আফ্রিকাতে প্রতি পাঁচ লাখ মানুষের জন্য একজন মনরোগ বিশেষজ্ঞ রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে এটি তাদের সুপারিশের চেয়ে ১০০ গুন কম।
যে কোন ধরনের ব্যর্থতাই আত্মহত্যায় একজনকে প্রলুব্ধ করে বলে অভিজ্ঞমহলে ধারনা। এরমধ্যে প্রেমের ব্যার্থতা, চুক্তিপালনে ব্যর্থতা, নিয়োগ পাওয়ায় ব্যর্থতা, প্রিয়জনের আদর আহ্লাদ পাইতে ব্যর্থতা, সুনাম কুড়াতে ব্যর্থতা, ইচ্ছা পুরনে ব্যর্থতা, এমনকি দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতাও আত্মহত্যার মত ঘটনা ঘটাতে সক্ষম। বিশেষজ্ঞরা বলেন এটি একটি বিশেষ রোগ। অনুমান করতে পারলে সঙ্গে সঙ্গেই চিকিৎসকের সরনাপন্ন হওয়া দরকার। বিশেষ করে কম বয়সী স্কুলগামী থেক শুরু করে তরুন প্রজন্মের মধ্যে এর প্রবনতা বেশি। এর হার এত উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কোন্ কারণগুলো কাজ করে তা খুজে বের করার পর যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার দাবী সকল মহলের। অনেক ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলেন, শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীদের নিয়মিত কাউন্সিলিং করতে হবে। শিক্ষার্থীদের কো-কারিকুলার কার্যক্রমে বেশি করে সম্পৃক্ত করতে হবে। এছাড়া কলেজ বা মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুলে কালচারেল শিক্ষক নিয়োগ দেয়া যেতে পারে। মোট কথা সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডে ভালভাবে সংযুক্ত থাকতে পারলে এবং দু:শ্চিন্তা করার সময় ও সুযোগ না পাওয়া গেলে, স্ফূর্তি ও কাজে কর্মের মধ্যে জীবনের সময়গুলো কাটানোর ব্যবস্থা করতে পারলে আত্মহত্যা শব্দটি কোনদিনই সমাজের মানুষকে আক্রান্ত করতে পারবে না।