নতুন কারিকুলাম ও কিছু প্রত্যাশা

নার্গিস খান।।
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

শিক্ষা সর্বজনীন অধিকার। যা হবে মানবিক, দেশপ্রেম ভিত্তিক, বিজ্ঞান সম্মত ও যুক্তি নির্ভর। শিক্ষার মাধ্যম হবে মাতৃভাষা। একটি শিক্ষাক্রম হওয়া উচিত আধুনিক। সৃজনশীল মেধা বিকাশ সম্পন্ন। আমরা যদি তৃতীয় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে পর্যবেক্ষণ করি তা হলে দেখতে পাবো কেবলমাত্র যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমে সে সকল দেশ সমূহ উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছেছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হিসেবে বলতে পারি জাপানের কথা। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে সীমানাহীন ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ও বর্তমান উন্নত ও সভ্য দেশ গুলোর মধ্যে অন্যতম। এটা সম্ভব পর হয়েছে কেবল মাত্র তাদের দেশপ্রেম ভিত্তিক সর্বজনীন, বিজ্ঞান নির্ভর ও মাতৃভাষা ভিত্তিক একটি আধুনিক শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের মাধ্যমে। তাইতো আমাদের দেশেও একটি বিজ্ঞানসম্মত, যুক্তিভিত্তিক বাস্তবতা নির্ভর জীবনমুখী শিক্ষাক্রম চালু করার ব্যাপারে ২০১৭ সাল থেকেই কাজ শুরু করা হয়। তখন মূলত চাহিদা নিরূপণ বিশ্লেষণ এর কাজ শুরু হয়। এর প্রেক্ষিতে গবেষণা অব্যাহত থাকে। বিভিন্ন সভা সেমিনারের ও আয়োজন করা হয়। অতঃপর ২০২১ সালে প্রি-প্রাইমারী থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের রূপরেখা তৈরি করা হয়। শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা প্রতিমন্ত্রীসহ বিজ্ঞজনের উপস্থিতিতে ইতিবাচক কিছু মতামতের ভিত্তিতে সংযোজন বিয়োজনের মাধ্যমে এটি পাস করা হয়। যার নাম জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১। এর উপর ভিত্তি করে ২০২২ সালে ৬০টি বিদ্যালয়ে পরীক্ষামূলকভাবে উক্ত শিক্ষাক্রমের চালু করা হয়। এরই ফলশ্রুতিতে ২০২৩ সালে প্রথম, দ্বিতীয়, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শ্রেণীতে নতুন পাঠ্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়। এই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর তৃতীয়, চতুর্থ, অষ্টম ও নবম শ্রেণীতে বাস্তবায়ন করা হবে। তারপর ২০২৫ সালে পঞ্চম ও দশম শ্রেণীতে ২০২৬ সালে একাদশ শ্রেণীতে এবং ২০২৭ সালে দ্বাদশ শ্রেণীতে ধাপে ধাপে নতুন শিক্ষাক্রম চালু হওয়ার কথা রয়েছে।
শিক্ষার্থীদের মুখস্ত নির্ভরতাসহ পরীক্ষার ভীতিদূরী করণার্থে ও আনন্দময় পরিবেশে পড়ানোর পাশাপাশি দক্ষতা, সৃজনশীলতা, অর্জন, জ্ঞানও নতুন দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে শেখাতেই এই শিক্ষাক্রম চালু করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রমও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড। নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী প্রাক-প্রাথমিক স্তর অর্থাৎ নার্সারিও প্লেতে শিশুদের জন্য আরকোন বই থাকবে না। শ্রেণীকক্ষেই শিক্ষকরা তাদের সরাসরি পড়াবেন। তাছাড়া প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত তাদের মাত্র তিনটি বই পড়ানো হবে। তবে কোন পরীক্ষা নেওয়া হবে না। এক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হবে বছরব্যাপী চলা বিভিন্ন শিখন কার্যক্রমের ভিত্তিতে। পরবর্তী শ্রেণীগুলোর মূল্যায়ন পদ্ধতি পরীক্ষণও ধারাবাহিক শিখন কার্যক্রম দুটোই থাকছে। এক্ষেত্রে শ্রেণীভেদে ত্রিশ থেকে ষাট ভাগ পর্যন্ত মূল্যায়নই হবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিখনকালীন সময়ে। বাকি সব আগের মতই পরীক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হবে। শিখনকালীন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগের দক্ষতা উপস্থাপন, ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট বা বাড়ির কাজসহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করা হবে।
প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ পর্যন্ত প্রতিটি ক্লাসেই বিভিন্ন বিষয়ের উপর শিশুদের সৃজনশীলতা বৃদ্ধি মূল্যবোধ বাড়ানোসহ নানাবিধ দক্ষতা সংযোজন করা হয়েছে। নতুন শিক্ষাক্রমে শিশুদের যেই দক্ষতাগুলো অর্জনের জন্য জোর দেয়া হবে সেগুলোর ব্যাপারে ২০১৮ সাল থেকে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন কোর্স, প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ করানো হচ্ছে যা অদ্যবধি চলমান।
এক নজরে নতুন কারিকুলামে দক্ষতাগুলো হলোঃ ১। সূক্ষ্ম চিন্তন দক্ষতা ২। সৃজনশীল চিন্তন দক্ষতা ৩। সমস্যা সমাধানের দক্ষতা ৪। সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষত া ৫। যোগাযোগ দক্ষতা ৬। স্ব-ব্যবস্থাপনা দক্ষতা ৭। সহযোগিতামূলক দক্ষতা ৮। বিশ্ব নাগরিকত্ব দক্ষতা ৯। জীবিকায়ন দক্ষতা ১০। মৌলিক দক্ষতা। আমাদের প্রত্যাশা এই দক্ষতাগুলো অর্জনের মাধ্যমে আমাদের শিশুরাই সমাজের আমূল পরিবর্তন করে নিখাঁদ সংস্কৃতির বৈষম্যহীন সম্প্রীতির সমাজ গড়ে তুলে বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের নাম গ্রন্থিত করতে পারবে। উজ্জল ভাবে এর সুষ্ঠু বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাধ্যমিক পর্যন্ত কোন বিভাগ বিভাজন থাকবে না। ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত সবাইকে দশটি বইয়ের একই বই পড়তে হবে। একাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের বিভাগ বিভাজন করতে হবে। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের নতুন পাঠ্যক্রম শিক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিকীকরন এবং শিক্ষার্থীদের আরো প্রাসঙ্গিক এবং ব্যবহারিক শিক্ষা প্রদানের একটি উচ্চাবিলাস প্রচেষ্টা। যার সফলতা নির্ভর করে তার বাস্তবায়ন এবং শিক্ষক, অভিভাবক ও নীতি নির্ধারকসহ সকল স্টেকহোল্ডারদের সমর্থনের উপর। তবে একটি দেশের পাঠ্যক্রমের উদ্দেশ্য যতই ভালো হোক না কেন তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন ও সফলতা নির্ভর এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তা মূল্যায়ন। একটি চমৎকার পাঠ্যক্রমের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া জটিল মূল্যায়ন পদ্ধতির করলে ভেস্তে যায়। মূল্যায়ন পদ্ধতিকে সহজ, সহনীয়, বোধগম্য ও সহজে বাস্তবায়নযোগ্য করা হলে কোন ধরনের বিভ্রান্তির জন্ম হবে না বলে একটি বদ্ধ মূল ধারনা পোষন করা হয়। এ পাঠ্যক্রমে কিছু ম্যাথোডোলজিক্যাল বিষয় উপস্থাপন করা হয়েছে যা নিঃসন্দেহে কার্যকর। দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষকদের এসব বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ জ্ঞানচর্চাসুযোগ করে দিলেও শিক্ষকদের গবেষণাকর্মে নিয়োজিত করলে এইসব অত্যাধুনিকধ্যান ধারণা ও শিক্ষা কৌশল বাস্তবায়ন সম্ভব। তাছাড়া সিস্টেমটি কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা হয়েছে তা নিশ্চিত করার জন্য সতর্ক পরিকল্পনা এবং সমন্বয় প্রয়োজন। সর্বোপরি মূল্যায়ন পদ্ধতির নিরক্ষন ও মূল্যায়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি শিক্ষক শিক্ষার্থীদের থেকে চলমান প্রতিক্রিয়া এবং মূল্যায়ন ফলাফলের নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে করা যেতে পারে। সংশ্লিষ্ট সকলকে জবাবদিহিতার মধ্যে নিয়ে আসতে পারলে কারিকুলাম সফল করা সর্বাধিক সহজতর হবে। এক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সর্বোপরি আন্তরিকতার একান্ত প্রয়োজন।