বর্ণাঢ্য সংবর্ধনায় প্রধান শিক্ষকার অশ্রুসিক্ত বিদায়

সুফিয়ান রাসেল ।।
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

চোখের জলে বিদায় নিলেন অজোপাড়া গাঁয়ে আলো ছড়ানো শিক্ষক সুনীতি রাণী বিশ্বাস। দীর্ঘ কর্ম জীবনের শেষ দিনে সহকর্মী, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর ভালোবাসায় সিক্ত হন তিনি। গতকাল তাঁর বিদায় উপলক্ষে কর্মস্থল কুমিল্লার বরুড়া উপজেলার ৮৬ নং নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে বর্ণাঢ্য সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। দুপুর ২টায় অনুষ্ঠান শুরুর কথা থাকলেও প্রিয় শিক্ষাগুরুকে শেষ বিদায় জানাতে সকাল থেকেই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে জড়ো হন বর্তমান এবং প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা।ফূল ও উপহার হাতে হাজির হন বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। পরিচালনা পর্ষদ সভাপতি অমৃত দাশের সভাপতিত্বে এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বরুড়া উপজেলা শিক্ষা অফিসার মো. তরিকুল ইসলাম।

বিশেষ অতিথি ছিলেন উপজেলা সহকারী শিক্ষা অফিসার মো. সোলেমান ভূঁঞা, মো. মিজানুর রহমান মজুমদার, আব্দুল কুদ্দুস প্রধান, মো. তোফাজ্জল হোসেন , প্রাক্তন পিটিআই ইন্সট্রাক্টর উত্তম দাশ গুপ্ত, কেন্দ্রীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা শাহাদাত হোসেন ভুঞা, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা আব্দুল হক,ডাবুরিয়ার বিশিষ্ট সমাজ সেবক আব্দুর রাজ্জাক প্রমুখ।স্বাগত বক্তব্য রাখেন নোয়াপাড়া সরকারের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মোতাছাম বিল্যাহ এবং বিদায় মানপত্র পাঠ করেন প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক ঝর্ণা রানী দাশ। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন অনুষ্ঠান উদযাপন কমিটির সদস্য সচিব প্রাক্তন শিক্ষার্থী আব্দুর রাজ্জাক। পেরুল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শুভেন্দু শেখর দাস পিন্টু এবং লক্ষ্মীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাইফুল ইসলাম হাজারীর সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানের শুরুতে নলুয়া চাঁদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো.ফখরুদ্দিনের কোরআন তেলাওয়াত এবং নোয়াপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক বাবলি মজুমদারের গীতা পাঠ ও জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের পর এলইডির পর্দার মাধ্যমে তুলে ধরা হয় সুনীতি রাণী বিশ্বাসের বর্ণাঢ্য কর্মজীবন। এতে উঠে আসে তাঁর অবিশ্রান্ত সংগ্রামের আদ্যোপান্ত। একটি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কোমলমতি শিশুদের স্কুলমুখী করতে তাঁর নানামুখী কৌশলের স্থিরচিত্রও এতে স্থান পায়। আরও তুলে ধরা হয় তাকে নিয়ে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদনের চিত্র। তার বিদায় অনুষ্ঠান উপলক্ষে কুমিল্লা-৮ আসনের এমপি এ জেড এম শামীম,বরুড়া উপজেলা পরিষদ চেযারম্যান এ এন এম মইনুল ইসলাম এবং উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুং এমং মারমা মং পৃথক পৃথক বাণী প্রদান করেন।এতে শিক্ষার প্রসারে এই মহীয়সী নারীর ঐকান্তিক প্রচেষ্টার প্রশংসা করেন তারা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন ব্যতিক্রমী আয়োজনকারীদের ধন্যবাদ জানান অতিথিবৃন্দ।প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে সুনীতি রাণী বিশ্বাসের দীর্ঘ দিনের সহকর্মী ও এলাকাবাসী বলেন- স্কুলটি উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বিভিন্ন সময় বিভিন্ন জনকে পানিশমেন্ট স্বরূপ প্রতিষ্ঠানের প্রধান হিসেবে পাঠানো হতো।তাই তারা প্রতিষ্ঠানের প্রতি ততটা আন্তরিক ছিলেন না। প্রতিষ্ঠান প্রধান হিসেবে তিনি দায়িত্ব থাকাকালীন উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সহযোগিতায় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামগত ব্যাপক উন্নয়ন করেছেন।তিনি এ প্রতিষ্ঠানে যোগদানের পর থেকেই অনেক ঝরেপরা শিক্ষার্থী ক্লাসে ফিরেছে। সন্তানদের শিক্ষার প্রতি সচেতন হয়েছেন অভিভাবকবৃন্দ। তাই মানুষ গড়ার এ কারিগরকে বিদায় দিতে গিয়ে অনেকেই ডুকরে ডুকরে কেঁদে উঠেন। বিদায়ী সন্মাননা গ্রহণ করে আবেগাপ্লুত হয় পড়েন এই প্রধান শিক্ষক।

এতে আরও উপস্থিত ছিলেন লক্ষ্মীপুর ইউনিয়ন,সুদ্রা ক্লাস্টার ও বরুড়া উপজেলার বিভিন্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ,সহকারী শিক্ষক, অভিভাবকবৃন্দ ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। অনুভূতি প্রকাশ করেন প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের পক্ষে ইউপি সদস্য মো. আমির হোসেন এবং ব্যাংক কর্মকর্তা তাপস চন্দ্র দাস,পরিচালনা কমিটির পক্ষে জাহাঙ্গীর মেম্বার প্রমুখ।

উল্লেখ্য ১৯৮৬ সালে শিক্ষকতার মহান পেশায় যোগ দেন সুনীতি রাণী বিশ্বাস। এই সময়ে একাধিক প্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেন। ২০০৭ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন চিতোষী রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আর সর্বশেষ ২০০৮ সালে আসেন নিজ গ্রাম চড্ডার পার্শ্ববর্তী এলাকা নোয়াপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।প্রধান শিক্ষক হিসেবে এখানেই ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করে অবসরে গেলেন। এর আগে ২০০০ সালে তাঁর শিক্ষক স্বামী নিখিল দেওয়ানজী মারা গেলেও অনেক চড়াই-উৎরাইয়ের মধ্যেও টিকে থাকেন এ পেশায়। শুধু তাই নয়, নিজের তিন সন্তানকেও প্রতিষ্ঠিত করেন শিক্ষক হিসেবে।