‘বাংকারের উপর কলা গাছ রেখে সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে গিয়েছিলাম’

বীরমুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প-২৬
শাহাজাদা এমরান।।
প্রকাশ: ৩ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. ইদ্রিছ মিয়া বলেন, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষন শুনে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেয়ার ব্যাপারে অনুপ্রানিত হই এবং সিদ্ধান্ত নেই যে কোন ভাবেই পাকিস্তান বাহিনীকে এ দেশ থেকে বিতারিত করব। ২৫মার্চ রাতে সারা দেশের ন্যায় কুমিল্লায়ও হানাদার বাহিনী আমাদের ঘুমন্ত মানুষের উপর পাশবিক নির্যাতন করে হত্যাযজ্ঞ চালায় ।তারপর থেকেই যুদ্ধে যাওয়ার সুযোগ খুঁজতে থাকলাম। সম্ভবত এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহ হবে। আমাদের কল্পবাস গ্রামের আছিম উদ্দিন ভুইয়ার বাড়ি মাঠে আমির খান,সেলিম খান,সুবেদার হোসেনসহ আরো কয়েকজন মিলে একটি প্রশিক্ষন কেন্দ্র স্থাপন করে এলাকার যুবকদের যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে ইচ্ছুক , তাদের প্রশিক্ষন দেওয়া শুরু করল। আমিও প্রশিক্ষনে যোগ দিলাম। এখানে আমাদের একটানা ১৫দিন প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। পরে মে মাসের শেষ দিকে আমিসহ আমরা ৫ বন্ধু মিলে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগর ইয়ুথ ক্যাম্পে যাই যুদ্ধে অংশ নেয়ার জন্য।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু : ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের বক্সনগর ইয়ুথ ক্যাম্পে এসে দেখি কুমিল্লার অধ্যক্ষ আবদুর রউফ স্যার। আমরা রউফ ভাইকে বললাম যে,যুদ্ধে অংশ নেব ১৫ দিনের প্রশিক্ষন নিয়েছি। তখন তিনি একটি স্লিপ লিখে আমাদের ৫ জনকে আগড়তলা কংগ্রেস ভবনে পাঠিয়ে দেন। এখানে তিন দিন কাটানোর পর আমাদের আবার পাঠানো হয় দূর্গাপুর চৌধুরী পাড়া ইয়ুথ ক্যাম্পে। এই ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন আমাদের এমপি আমির হোসন। এখানে একটানা ১৫ দিন থাকি। এখানে কয়েকশ যুবক ছিলাম আমরা। এর মধ্যে আমাদের একশ জনকে বাছাই করে প্রশিক্ষনের জন্য আসাম রাজ্যের লায়লাপুর প্রশিক্ষন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। এই কেন্দ্রে ২১ দিন আমাদের প্রশিক্ষন দেওয়া হয়। এই ক্যাম্পের প্রশিক্ষন থেকে শুরু করে পুরো তত্তাবধানের দায়িত্ব ছিল ভারতীয় সেনাবাহিনী। আমি স্টেনগানের উপর প্রশিক্ষন নেই। প্রশিক্ষন শেষে আমাদের ২নং সেক্টরের হেড কোয়ার্টার ত্রিপুরার মেলাঘরে পাঠানো হয়। এখানে আমাদের ৭দিন বিশ্রাম দেওয়া হয়। বিশ্রাম শেষে সুবেদার ওফেস এর নেতৃত্বে আমাদের ৩৫জন যুদ্ধাকে ৪টি বাংকারে ভাগ করে দেওয়া হয়।

যুদ্ধের অনুপম গল্প : বীরমুক্তিযোদ্ধা মো. ইদ্রিছ মিয়া বলেন, জুলাই মাসের শেষ দিকে আমরা কসবা অপারেশনে যাই। ব্রাক্ষ্মনবাড়িয়া জেলার কসবা উপজেলার মন্দভাগ বাজারের পশ্চিম দিকে কুমিল্লার ব্রাক্ষনপাড়া উপজেলার ছক্কার মার মসজিদের পাশে বাংকার করি। বাংকার করার একদিন পর হঠাৎ রাতে এক জেলে দৌঁড়ে এসে বলল, ভাইরা, পাঞ্জাবিরা আইতেছে। কথাটা শুনামাত্র কমান্ডার বললেন, দ্রুত যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।কমান্ডার বললেন, তোমরা আমার পেছনে থাকবা। আমি সামনে থাকব। আমি যদি টর্চ লাইটি আকাশের দিকে মেরে চর্তুদিকে ঘুরাই তখন তোমরা সাথে সাথে ফায়ার শুরু করবা। এর আগে কেউ ফায়ার করবা না। লক্ষ করলাম ঠিক ১২টা বাজতে বাজতেই কমান্ডার টর্চলাইট আকাশের দিকে মারলেন । আমরা সাথে সাথে ফায়ারিং স্টার্ট শুরু করলাম। চলল একটানা সকাল ১০টা পর্যন্ত। এরপর লক্ষ করলাম ওপাস থেকে কোন গুলির শদ্ধ শুনা যাচেছ না। কমান্ডার জানালেন, হানাদাররা পিছু হটছে । জীবনের প্রথম যুদ্ধে তোমরা জয়ী হয়েছ।
পরে সামনে এগিয়ে দেখি রাস্তার বিভিন্ন প্রান্তে হানাদার বাহিনীর একে একে ১৮টি লাশ পড়ে আছে। তখন আমাদের আনন্দ আর কে দেখে। এই খবর আমাদের হেড কোয়ার্টারে জানানোর সাথে সাথে কোনাবন থেকে ক্যাপ্টেন গাফ্ফার সাহেব জানালেন যে, আমরা যেন স্বল্প সময়ের মধ্যে ১৮টি লাশ প্যাকেট করে মেলঘর পাঠিয়ে দেই। পরে শুনেছি ,আমাদের এই ১৮টি হানাদার বাহিনীর মরদেহ দেখতে মেলাঘরে ভারতের তৎকালীন সেনা প্রধানও নাকি এসেছিলেন। এসে আমাদের বীরত্বের বেশ প্রশংসা করেছিলেন। আমরা রাতেই খবর পেয়েছিলাম যে, কাল যে কোন সময় হানাদার বাহিনী প্রতিশোধ নিতে আমাদের উপর বিমান হামলা করতে পারে। ঐ মুহূর্তে বাংকার স্থানান্তরেরও কোন সুযোগ ছিল না। তাই আমরা রাতেই বাংকারের উপর কলার গাছ কেটে দিয়ে রেখেছি। যাতে বুঝতে না পারে এখানে বাংকার রয়েছে। পরদিন সম্ভবত ১০টার পর গত রাতে যেখানে আমাদের যুদ্ধ হয়েছিল ঠিক সেখানে তারা বিমান হামলা শুরু করে। আল্লাহর রহমত তারা আমাদের বাংকার নির্দিষ্ট করতে পারেনি। যার কারণে বিমান থেকে ফেলা বোমা গুলো বাংকারের আশেপাশের বাড়ি ঘরে এবং বেশীর ভাগ বোমা পড়েছে খালি রাস্তায় । এতে অসংখ্য বাড়ি ঘর ও মালামাল জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গেলেও আমাদের কোন ক্ষতি হয়নি। হানাদার বাহিনীর বিমান হামলা শেষ হলে আমরা এখান থেকে বাংকার তুলে ন্ইে এবং মেলাঘর চলে যাই। মেলাঘরে আমাদের ৭ দিনের বিশ্রাম দেওয়া হয়। ৭ দিন পর আমাদের মোট ১০৬ জন যুদ্ধাকে একটি কোম্পানী করে একে ৩টি প্লাটুনে ভাগ করে দেশে পাঠানো হয় আবারও সরাসরি যুদ্ধ করার জন্য। এক প্লাটুনে ছিল ৩৯জন যোদ্ধা। তিন প্লাটুনকে আবার তিন কমান্ডারের নেতৃত্বে ভাগ করে দেওয়া হয়। এক কমান্ডাররের নেতৃত্ব ছিলাম আমি নিজেই। আমার প্লাটুনের ৩৯জন যুদ্ধা নিয়ে আমি হাতিমারা দিয়ে দেশে ঢুকি। আমার নেতৃত্বে প্রথম যুদ্ধটি হয় বুড়িচং উপজেলার কংশনগর গুধারাঘাট। সেখানে হানাদার বাহিনী কিংবা আমরা কেউ হতাহত না হলেও আমাদের আক্রমনের কারনে তারা সেনানিবাসের দিকে চলে যেতে বাধ্য হয়। একই সময় মুরাদনগর, ব্রাক্ষèনপাড়া ও বুড়িচং এই তিন উপজেলা নিয়ে আরেকটি যৌথ কমান্ড গঠন করা হয়। এর কামন্ডার ছিলেন সেনা বাহিনীর নায়েব সুবেদার আফজল খান।

পরিচয় : হাজী মো. ইদ্রিছ মিয়া মাষ্টার। পিতা হাজী আবদুর রহমান এবং মাতা সূর্যবানের নেছা। ।১৯৫১ সালের ১০ জুলাই কুমিল্লা জেলার ব্রাক্ষ্মনপাড়া উপজেলার সদর ইউনিয়নের ডগ্রাপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। হাইস্কুলে পড়ার সময়ই তিনি ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতি শুরু করেন। ১৯৭০ সালে যখন দেশে সাধারণ নির্বাচন হয়, তখন তিনি কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের বিকম পরীক্ষার্থী ছিলেন।