বাবা দিবসে আজ বাবা নেই!

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ সপ্তাহ আগে

শিব্বীর আহমেদ: ১৯ জুন রোববার ২০২২। আজ নাকি বাবা দিবস। আমার বাবা আলহাজ্ব জালাল আহমেদ আর আমাদের মাঝে নেই। তিনি চলে গেছেন ওপারে। মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দিয়ে গত ১৪ জানুয়ারি ২০০৯ সালে তিনি চীরদিনের জন্য ওপারে চলে গিয়েছেন। বাবা যতদিন বেঁচে ছিলেন ততদিন তিনি আমাদের চাইতেও মানুষের কাছেই বেশি সময় ছিলেন। মানুষের মাঝে থেকে মানুষের জন্যই আজীবন করে গিয়েছেন তাঁর সামর্থ্য আর সক্ষমতা অনুযায়ী। মানুষকে ভালোবাসা মানুষের সেবা করা এই ব্রত নিয়েই তিনি মানুষের ভালোবাসায় আজীবন বেঁচে ছিলেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে তিনি আমাদের জন্য কিছু করে যাননি। তিনি আমাদের জন্যও করে গিয়েছেন তার সাধ্য ও সামর্থ অনুযায়ী।

১৯২১ সালের ১ জুলাই তিনি তৎকালীন কুমিল্লা জেলার লাকসাম থানার অর্ন্তগত পাঁচপুকুরিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে তিনি জন্মগ্রহন করেন। তাঁর বাবার নাম ছিল ওয়ালী মিয়া পন্ডিত এবং মা ছিলেন জোবেদা বেগম। ১৯৪০ সালে তিনি সীতাকুন্ড মাদ্রাসা থেকে ২য় বিভাগে দাখিল পাশ করেন এবং ঐ বছরই হাতিমারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। প্রায় পাঁচ বছর শিক্ষকতা করার পর ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা যান এবং খাদ্য পরিদর্শক হিসাবে খাদ্য বিভাগে যোগদান করেন। ১৯৬০ সালে খাদ্য বিভাগ বিলুপ্ত হওয়ার পর তিনি খিলা ইউনিয়নে মেম্বার নির্বাচন করে জয়লাভ করেন। এরপর তিনি পর পর দুইবার খিলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এ ছাড়া তিনি লাকসাম ও বরুড়া ইউনিয়ন চেয়ারম্যান এসোশিয়েশনর সভাপতি নির্বাচিত হন।

আওয়ামী লীগ গঠিত হবার পর থেকেই আওয়ামী রাজনীতির সাথে যুক্ত হন। ভাষা আন্দোলন সহ বাংলার স্বাধীকার ও অধিকার আদায়ের সকল সংগ্রামে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং অত্র অঞ্চলে নেতৃত্ব প্রদান করেন। সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবদুল আউয়াল, সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবুল কালাম মজুমদার সহ অন্যান্য জাতীয় নেতাদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে ছয়দফা আন্দোলন, উনসত্তরের গণ আন্দোলনে অগ্রনী ভূমীকা পালন করেন। আলহাজ্ব জালাল আহমদ ১৯৭০ সালে লাকসাম থেকে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।

৭ই মার্চ রমনার রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পূর্বে জালাল আহমেদ পবিত্র কোরানের বাণী পাঠ করেন। এই সময় তারঁ সাথে লাকসামের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবদুল আউয়াল সহ অন্যান্য রাজনীতিবীদরা উপস্থিত ছিলেন।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় সম্ভবত: মরহুম জালাল আহমেদই একমাত্র সংসদ সদস্য ছিলেন যিনি পরিবার পরিজন ছেড়ে ভারতে গিয়ে গেরিলা ট্রেনিং নিয়ে ২ নং সেক্টরে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম জালাল আহমেদকে লক্ষ্য করে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনি তাঁর নিজ গ্রাম পাঁচপুকুরিয়ায় হামলা চালায় এবং তাঁর বাড়িঘর লুটপাট শেষে বোমা বসিয়ে পুরো বাড়ি ধ্বংস করে দেয়।

দেশ স্বাধীন হবার পর কাঁধে বন্দুক খাকী হাফপ্যান্ট সার্ট মাথায় ক্যাপ পায়ে আর্মীবুট পরে বীরের বেশে তিনি তাঁর গ্রাম পাঁচপুকুরিয়ায় ফিরে আসেন। এই সময় হাজার হাজার জনতা তাঁকে কাঁধে নিয়ে উল্লাসে মেতে উঠেন।

স্বাধীনতার পর স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে যে সংবিধান প্রস্তাবনা পাশ করা হয় তাতে তিনি স্বাক্ষর করেন। সংসদে বঙ্গবন্ধু মরহুম জালাল আহমেদকে ’জালাল কইরে’, ’আমার জালাল কই’ ইত্যাদি নামে সম্বোধন করতেন।

১৯৭২ সালের ২৬ জানুয়ারি লাকসামের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আবদুল আউয়াল এবং সাবেক সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জালাল আহমেদ লাকসামকে জেলা করার দাবী জানিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করেন। সম্ভবত: এটিই স্বাধীন বাংলাদেশর প্রথম দাবী। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম এই দাবী আজো পুরন হয়নি।

১৯৭৩ সালে তিনি লাকসাম থেকে সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে মরহুম আলহাজ্ব জালাল আহমেদ বাংলাদেশ থেকে প্রথম হজ্জ যাত্রীদের ডেলিগেট প্রধান হিসেবে নেতৃত্ব দেন এবং হজ্জব্রত পালন করেন।

মরহুম আলহাজ্ব জালাল আহমদ ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত লাকসাম থানার আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সভাপতি এবং ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত কুমিল্লা জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বায়তুল মোকাররম মসজিদে ইসলামিক ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এলাকায় বহু স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, মক্তব, রেলওয়ে ষ্টেশন প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখেন।

১/১১ এর পর ২৯ ডিসেম্বর ২০০৮ অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্ব বিজয় লাভ করার পর ১৪ জানুয়ারি ২০০৯ সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম জালাল আহমেদ মহান রাব্বুল আলামীনের ডাকে সাড়া দিয়ে চীরদিনের জন্য এই পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। ইন্নালিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন। ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম আলহাজ জালাল আহমেদ এর নামে উত্থাপিত শোক-প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।

আজ বাবা দিবস! কিন্তু এই বাবা দিবসে আজ বাবা নেই। আমার মা বেঁচে আছে। মা আজ শিশুর মতো বেঁচে আছেন। মা বেঁচে আছেন বলেই মাকে ঘিরেই আমাদের বন্ধন এখনো অটুট রয়েছে। এক সময় মা শিশু ছিলেন। শিশু থাকা অবস্থায় তিনি কিছুই করতে পারতেন না। তারপর ধীরে ধীরে তিনি বড় হয়েছেন। নিজের হাতেই সবকিছু করতে শিখেছেন। বাবার সাথে তার বিয়ে হয়েছে। আমাদের দশ ভাইবোনের জন্ম হয়েছেন। বাবা ছিলেন পথে পথে মানুষের সাথে মানুষের মাঝে। মা’ই আমাদেরকে বড় করেছেন। মানুষের মত মানুষ করবার চেষ্টা করেছেন। আজ আমরা বড় হয়েছি। মা আবারো শিশুতে পরিনত হয়েছেন। বয়সের ভার এখন তার চারিদিকে ছড়িয়ে আছে। এখন তার দিনরাত চব্বিশ ঘন্টার ঠিকানা বিছানা। ভাইবোন ছেলে বউ নাতী নাতনী সবাই যে যখনই সুযোগ পায় তখনই মায়ের বিছানার পাশে মাকে আগলে বসে থাকে। হয়ত যেকোন মুহুর্তেই খবর আসবে মা আমাদেরকে ছেড়ে চলে গেছেন। এটাই নিয়ম। এই পৃথিবীতে মানুষ আসে চলে যাবার জন্য। সবাইকে চলে যেতে হবে। বাবা চলে গিয়েছেন। মাও চলে যাবেন। একদিন আমরাও যাবো। আমাদের সবাইকেই যেতে হবে। পবিত্র কোরান মজিদের সুরা ৩ আল ইমরানের ১৮৫ নাম্বার আয়াতে বলা হয়েছে, ’ কুল্লু নাফসিন যায়েকাতুল মউত’। অর্থাৎ ’প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে’। পবিত্র কোরানের বাণী অবধারীত। এর একটি লাইনও মিথ্যা নয়। সুতরাং আমাদের সবাইকেই চলে যাবার প্রস্তুতি নিতে হবে।

বাবা দিবেস মহান রাব্বুল আলামীনের কাছে শুধু এই প্রার্থনা তিনি আমাদের মাকে আমাদের সবার মাঝেই বাঁচিয়ে রাখুন এবং মাকে ঘিরেই আমাদের পরিবারের সবার মাঝে মিল ও বন্ধন অটুট থাকুক। আমিন।

– কথাসাহিত্যিক/ সাংবাদিক