মাইনুল ভাই,পাখি ভাইসহ আমরা ৩জন টমছমব্রিজে বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করি – শাহাদাত হোসেন রতন

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অণুগল্প-২৩
শাহাজাদা এমরান ।।
প্রকাশ: ৪ সপ্তাহ আগে

যুদ্ধের যাত্রা যখন শুরু :
বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহাদাত হোসেন রতন বলেছেন , তখন আমি কোটবাড়ি পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের প্রথম বর্ষের ছাত্র। যেহেতু ভাই এম এন এ তাই রাজনীতির অন্দর-বন্দর মহলের খবর গুলো সব সময়ই আপডেট পেয়ে যেতাম। আর বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চ ভাষনও আমাকে দারুণ ভাবে আকর্ষন করেছে। তাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য সব সময়ই প্রস্তুত ছিলাম। ২৫ মার্চ রাতে আমি, প্রয়াত মাইনুল হুদা ভাই ,নাজমুল হাসান পাখি ভাইসহ আমরা ৩ জন মিলে টমছমব্রিজে রাত ১২টায় বাঁশ দিয়ে ব্যারিকেড সৃষ্টি করি। যাতে এ দিক দিয়ে হানাদার বাহিনী নগরীতে ঢুকতে না পারে। বাসের চালকরা তখন অনেকেই বাসের ভিতর ঘুমিয়ে ছিল। তাদের আমরা কাউকে বুঝিয়ে কাউকে ধমক দিয়ে আমাদের সাথে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলাম। হঠাৎ দেখলাম রামমালা আনসার ক্যাম্পে হানাদার বাহিনী ঢুকে পড়েছে। পরে আমাদের দিকে আসার জন্য বেরিলাইট পিস্তল আকাশের দিকে ক্ষণে ক্ষণে মারছে। তখন অবস্থা বেগতিক দেখে মাইনুল ভাই বলল,দৌঁড় দে। আমরা তিনজন তখন নিউ হোস্টেল দিয়ে সদর হাসপাতালের দেয়াল টপকিয়ে কান্দিরপাড় হক সুইটে (বর্তমান হক ওয়াচ) ঢুকি। রাতে তিনজন আমরা একসাথে ঘুমিয়ে পড়ি। দেয়াল টপকানোর কারণে আমাদের তিন জনই কম বেশী আঘাত পেয়েছিলাম।
২৬ মার্চ সকালে আমি ঘুম থেকে উঠে দেখি মাইনুল হুদা ভাই আর পাখি ভাই নেই। তারা আমাকে রেখে চলে গেছে। তখন শহরে কারফিউ চলছে। আমি খুব সকালে পিপাসা সুইটের সামনে দিয়ে পূবালী চত্তর হয়ে আইনুল হক মুন্নার বাসায় কোন রকমে উঠি। আসার সময় পিপাসার সামনে একজন আর বর্তমান বাদুরতলার হাজি তারু মিয়া পৌর বিপনীর সামনে একজনের লাশ পড়ে থাকতে দেখি। বুঝতে পারছি গেল রাতে হানাদার বাহিনীর হত্যাকান্ড এগুলো। শহরে কারফিউ থাকার কারণে তিনদিন আইনুল হক মুন্নাদের বাসায়ই ছিলাম। তিনদিন পর কারফিউ কিছুটা শিথিল করলে আমাদের পুলিশ লাইন্স সংলগ্ন রেইসকোর্স বাসায় এসে দেখি আমাদের বাসাসহ প্রায় পুরো রেইসকোর্স জনমানব শূন্য। সবার দড়জা জানালা খোলা কিন্তু কেউ নেই। আমি আমাদের বাসার সামনে ২টি মোরগ আর একটি কুকুর দেখলাম। এই ছাড়া আর কিছুই দেখলাম না। কোথায় বাবা-মা,ভাই-বোন ?আমি কেঁদে দিলাম। পরে বিকালের দিকে বাসার উত্তর দিকে ঘোরদৌর মাঠে গিয়ে বসে কান্না করতেছি, এমন সময় আমার মামা আবদুল কুদ্দুছ বাহার এসে হাজির। তিনি রেইসকোর্স আমাদের বাসায় যাওয়ার পথে আমাকে মাঠে দেখে বলেন,কি রে তোকে না পেয়ে সবাই অস্থির। তখন মা-বাবা , মামাকে পাঠিয়েছিল আমাদের বাসা থেকে চাল ডাল নিয়ে আসার জন্য। যাক সন্ধ্যার পর কালিয়াজুরি মামার বাসায় গিয়ে বাবা মাকে দেখি।
২৭ মার্চ সকালে আমরা নাঙ্গলকোট গ্রামের বাড়িতে চলে আসি। তখন অবশ্য নাঙ্গলকোট নামে উপজেলা ছিল না। এটি ছিল লাকসামের অধীন। বাড়ি গিয়ে দেখি বিডিআর,আর্মি,পুলিশ ও মোজাহেদের সদস্যরা ভারত যাওয়ার পথে আমাদের বাড়িতে যাত্রা বিরতী করে যায়। যেহেতু আমার ভাই ছিল এম এন এ। তাই আমাদের বাড়িটি ছিল তাদের কাছে একটি নিরাপদ ক্যাম্পের মত। এই সুযোগে আমি বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সাথে মিশে অস্ত্র চালানোটা শিখে ফেলি। আর তখন আমাদের গ্রাম ও আশেপাশের গ্রামের দিকে লক্ষ করলাম এলাকার যুবক ছেলেরা দল বেঁধে ভারত যাচ্ছে যুদ্ধের প্রশিক্ষন নেয়ার জন্য। আমাদের পার্শ্ববর্তী গ্রাম টুকুরিয়ার আবদুল কাদের (পরবর্তীতে বাংলাদেশ আর্মির বিগ্রেডিয়ার হয়)যখন প্রশিক্ষন নিতে ভারত গেল তখন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম,আমিও যুদ্ধে যাব।

প্রশিক্ষণ যখন শুরু : সম্ভবত এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে আমি ভারতের কাঠালিয়া যাই। গিয়ে দেখি সেখানে তখনো যুদ্ধের কোন কিছুই প্রস্তুত হয়নি।পরিচিত কাউকেই পাইনি। তখন বিকালেই নাঙ্গলকোট চলে আসি। আবার আগষ্টে আরেকবার ভারত যাই। সেখানে মেলাঘরে ইয়ুথ ক্যাম্প ও ট্রেনিং সেন্টারে ১০/১২ দিন প্রশিক্ষণ নেয়ার পর বাড়ি থেকে খবর যায় বাবা গুরুতর অসুস্থ। তাই বাবাকে দেখার জন্য ক্যাম্প থেকে চলে আসি,আর যাইনি। পরে কুমিল্লা শহরে চলে আসি বাগিচাগাঁও মুন্সি বাড়ির এনামুল হক মুন্সি ওরফে জাহাঙ্গিরের কাছে। জাহাঙ্গীর মুন্সির সাথে প্রায় মাস এক আড্ডা দেয়ার পর এক দিন তিনি বললেন, রতন,আমাদের বন্ধু আবু,আসাদ,নাজিম,জাহিদসহ অন্যরা কিন্তু যুদ্ধ করতেছে। যতটুকু শুনেছি তারা মনে হয় বসন্তপুর ক্যাম্পে আছে। এ কথা শুনে আমি চুপ করে থাকলাম। পরদিন সকালে সম্ভবত সেপ্টেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ হবে আমি সোজা বসন্তপুর বন্ধুদের সাথে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি , আমার বন্ধু ছাড়াও অনেকেই আছে আমার পরিচিত। বললাম,আমি যুদ্ধ করতে এসেছি,অস্ত্র চালাতে পারি।

যুদ্ধের অনুপম গল্প :
প্রথম যুদ্ধের অভিজ্ঞতা বর্ননা করতে গিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহাদাত হোসেন রতন বলেন, আদর্শ সদর উপজেলার পাঁচথুবি ইউনিয়নের ইটাল্লা নামক স্থানে প্রথম যুদ্ধ করি । স্থানীয় জনগন এ যুদ্ধে আমাদের সার্বিক সহযোগিতা করেন।সময় তখন দুপুর আড়াইটা হবে। স্থানীয় জনগন এসে জানাল যে,এ দিক দিয়ে পাঞ্জাবীরা আসছে। এ খবর শুনে আমরা সাথে সাথে ১০/১২জন এফ এফ ফায়ার ওপেন করে বসি। তখন আমার হাতে ছিল একটি এসএলআর। আমাদের এফএফদের মুল কাজ ছিল ‘মারও এবং ভাগ’।এখানে আমাদের ৩০মিনিট যুদ্ধ হয়। এ সময় আমাদের সাথে ছিল আসাদ,নাজিম,জাহিদ,আবুসহ আরো অনেক যুদ্ধা যারা আমার আগেই যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল। আমাদের এই বসন্তপুর ক্যাম্পসহ গোটা কোতয়ালী থানা মুক্তিযুদ্ধ কালীন সময়ের এফএফ বাহিনীর কমান্ডার ছিলেন আবদুল মতিন। এই যুদ্ধে পাক বাহিনীর কয়েকজন সৈন্য মারা যায়। এরপর অক্টোবর মাসে রাচিয়া যুদ্ধেও আমি সক্রিয় অংশগ্রহন করি। সেই যুদ্ধে আমার দায়িত্ব ছিল কাবারিংয়ে। রাচিয়া যুদ্ধে পরাজিত হওয়ার পর হানাদার বাহিনী তাদের বাংকার খুলে নেয়। এর একদিন পর আমাদের বসন্তপুর ক্যাম্পের সামনে দেখি হানাদার বাহিনীর কয়েকজন সদস্য হাঁটাহাঁটি করছে। বেলা সাড়ে ১২টার দিকে আমাদের আবুর নেতৃত্বে আমরা ৪জন (আমি,আবু,সামছুল এবং মনির) ঐ দুই হানাদার সদস্যকে গুলি করে হত্যা করি। এই ক্যাম্পে হানাদারদের দুই সদস্য নিহত হলেও আমাদের সাহসী আবু গুলিবিদ্ধ হয়।এই বাংকারে এতবেশী পাক বাহিনী রয়েছে তা আমরা বুঝতে পারিনি। নভেম্বর মাসের শেষ দিকে বসন্তপুর ক্যাম্প থেকে আমি আর আবু একটি জানাযা পড়তে যাই পার্শ্ববর্তী গ্রামে। রাজাকারদের মাধ্যমে খবরটি পাক বাহিনী জেনে যায়। এলাকার মানুষ যখন কবর খুঁড়ছে এমন সময় হানাদার বাহিনী এসে গুলি শুরু করে। আমরা তখন জানাযা না দিয়ে পালিয়ে জীবন রক্ষা করি। বন্ধু আবুর বুদ্ধিমত্তায় সেদিন আমরা বেঁচে যাই।
৮ ডিসেম্বর সকালে বসন্তপুর ক্যাম্প থেকে আমরা সোজা কুমিল্লা টাউন হলে এসে কুমিল্লা মুক্ত দিবসের আনন্দ মিছিলে শরিক হই।
এখন পর্যন্ত কেন মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেলেন না জানতে চাইলে এই সম্মুখ সমরের বীর মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমি যুদ্ধ করেছি পাকিস্তানী হানাদার বাহিনী থেকে দেশকে মুক্ত করার জন্য,স্বাধীন করার জন্য। সনদপত্র বা সার্টিফিকেট নেয়ার জন্য নয়। যুদ্ধ করতে গিয়ে তো কয়েকবার মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েছি। আল্লাহ চাইলেতো মারাও যেতে পারতাম। আমি মারা গেলে আজ আমার এই সনদপত্র কি আমি দেখতাম ? সুতরাং সনদ আর ভাতার জন্য যুদ্ধ করিনি বলেই আজ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের সনদের জন্য কোথায়ও যাইনি বা কাউকে বলিওনি।
পরিচয় : মো. শাহাদাত হোসেন রতন। পিতা আহমেদ নওয়াব হোসেন এবং মা মাহাবুবের নেছা। ১৯৫২ সালের নাঙ্গলকোট উপজেলার জোড্ডা ইউনিয়নের রাজাপাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন। ৪ ভাই ও ৩ বোনের মধ্যে তিনি তৃতীয়। তার আপন জেঠাত ভাই আহমেদ আবদুল খালেক ছিলেন এমএনএ। সে সুবাধে বলা যায় একজন রাজনৈতিক পরিবার থেকেই বেড়ে উঠেছেন তিনি।