যতোসব আইন মুক্ত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে 

কামাল পারভেজ 
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

আমার দেশের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। আমরা যা বলি তা উল্টো দিকটা দেখি। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে গণমাধ্যমের উপর খড়গ চালিয়ে যাওয়াটা এখন পর্যন্ত অব্যাহত রয়েছে। বাংলাদেশ গণমাধ্যম নিয়ে রাষ্ট্র সরকার কথায় কথায় বলে থাকেন স্বাধীন সংবাদ/মুক্ত গণমাধ্যম। আমরা কতটুকু স্বাধীন এবং মুক্ত গণমাধ্যমের প্রকাশনা অবিচল গতিতে চলছে তা একটু আলোকপাত /পর্যালোচনা করা যেতে পারে। একটু পিছনের ফিরে যাই তাহলে দেখা যাবে ১৯৭৫ সালের ১৬ জুন ছিলো গণমাধ্যমের একটি কালো অধ্যায়ের দিন। সেই থেকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণের কালো দিবস বলা হয়ে থাকে। তত্কালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান বাকশালের দর্শন অনুযায়ী একটি অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে দুটি মাত্র সংবাদপত্রের ডিক্লারেশন বহাল রেখে সব পত্রিকার ডিক্লারেশন বাতিল করেন।দৈনিক বাংলা ও বাংলাদেশ অবজারভার এই দুইটি পত্রিকার ডিক্লেয়ারেশন ঠিক রেখে অন্যসব পত্রিকার বিরুদ্ধে বন্ধের কালো আইন জারী করেন। অবশ্য পরে ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ টাইমসকে নতুনভাবে ডিক্লেয়ারেশন প্রদান করে সরকারি ব্যবস্থাপনায় মোট ৪টি পত্রিকার প্রকাশনা সাময়িকভাবে অব্যাহত রাখেন। এর আগে তিনি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে একদলীয় বাকশাল গঠন করেন এবং এ ব্যবস্থাকে তিনি দ্বিতীয় বিপ্লব হিসেবে উল্লেখ করেন। এই বিপ্লব সফল করতেই তিনি চারটি দৈনিক পত্রিকা রেখে সব দৈনিক পত্রিকা বন্ধ করে দেন। অন্যসব পত্রিকা বন্ধ করে দেওয়ায় ফলে কয়েক হাজার সাংবাদিক এবং সংবাপত্রে কর্মরত কর্মী বেকার হয়ে পড়েন। বেকারত্বের কশাঘাতে দুর্বিষহ হয়ে ওঠে তাদের জীবন। অন্যদিকে গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের এই নগ্ন হস্তক্ষেপে রুদ্ধ হয়ে যায় সংবাদপত্রের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক স্বাধীনতা, গোষ্ঠীর স্বাধীনতা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা। তখন গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে সরকারের এই নির্যাতনমূলক কার্যকলাপের প্রতিবাদ করার সাহস কারও হয়নি। তবে ’৭৫-এর ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে পরের বছর (১৯৭৬) থেকে সাংবাদিক সমাজ এই দিনটিকে সংবাদপত্রের কালো দিবস হিসাবে পালন করে আসছেন। শেখ মুজিবুর রহমান ততকালীন গণমাধ্যমের স্রোতকে বাঁধাগ্রস্ত করতে গলা টিপে ধরার জন্য একটা নতুন কৌশল বলা চলে। পরবর্তী সময় দ্বিতীয় বিপ্লবের আলোকে সংবাদপত্র সম্পর্কে নতুন নীতি ঘোষণা তৈরি করে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সংবাদপত্র পরিচালনাসংক্রান্ত ব্যাপারে নতুন নীতি ঘোষণা করিয়া দুইটি অর্ডিন্যান্স জারি করিয়াছেন। নতুন ব্যবস্থা অনুযায়ী মঙ্গলবার হইতে সারা দেশে বাংলাদেশ অবজার্ভার, দৈনিক বাংলা, দৈনিক ইত্তেফাক এবং বাংলাদেশ টাইমস এই চারটি দৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হইবে। জনাব নুরুল ইসলাম পাটোয়ারী, জনাব ওবায়দুল হক, শেখ ফজুলল হক মনি ও জনাব এহতেশাম হায়দার চৌধুরী যথাক্রমে দৈনিক ইত্তেফাক, বাংলাদেশ অবজার্ভার, বাংলাদেশ টাইমস ও দৈনিক বাংলার সম্পাদক নিযুক্ত হইয়াছেন। সেই থেকে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করার জন্য, তাকে দমন করে রাখার জন্য এরপর একেকভাবে নতুন নতুন আইন কানুন পাস করার যে তোড়জোড় চলছে, তাতে কারো মনে হতে পারে সরকার যে খাতগুলোকে আটকে দেওয়া দরকার বলে ভাবছে, তার মধ্যে সবার আগে সাংবাদিকদের ‘স্থবির’ করা দরকার। সরকারের বেপরোয়া ব্যবহার থলের বিড়াল সম্পর্কে জানতে চায় এবং গণমাধ্যম তা কলমে প্রতিবাদের আওয়াজ তুলে তখনই সরকার গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে ত্রুটির শব্দচয়ণ উচ্চারিত বলে লাগাম টেনে ধারার সুকৌশল যন্ত্র ব্যবহার করেন। কিন্তু কেন? এই প্রশ্নের উত্তর এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে ব্যাখ্যার আড়ালেই থেকে গেছে। স্বাধীন গণমাধ্যম যে গণতন্ত্র, সুশাসন, আইনের শাসন ও জবাবদিহির প্রাণশক্তি, সে কথা কেন কখনোই মেনে নেওয়া হয় না? কেন এটি স্বীকার করা হয় না, ‘উন্নয়নশীল’ স্তরে যে দেশগুলো যাচ্ছে, তারা শুধুমাত্র উচ্চতর জিডিপি দিয়ে সেখানে যাচ্ছে না, বরং তার সঙ্গে উচ্চতর স্তরের মানবাধিকার এবং সব ধরনের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়ও আছে। শুধুমাত্র অর্থনীতিতে উন্নয়ন হলেই হবে না, সমাজেও উন্নয়ন বা অগ্রগতি আসতে হবে। উন্নয়নকে অর্থপূর্ণ হতে হলে তাকে অবশ্যই সামগ্রিক অর্থে উন্নত হতে হবে। সরকারের আমলা মন্ত্রী মিনিস্টার নেতারা রাজনৈতিক প্লাটফর্মে বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুধের মত সাদা বক্তব্যে বলে থাকেন সংবাদপত্র এখন স্বাধীন, তাঁর পরের কথাগুলো আড়ালে “দমন আইন” বিষয় নিয়ে মুখ খুলতে লজ্জা হয়। আগে বলেছি যতোসব আইন করা হয় মুক্ত গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে এই আইন গুলো শুধু মাত্র সংবাদকর্মী ও সংবাদপত্রকে দমিয়ে রাখা অভিনবত্ব কৌশল। আর এই দমিয়ে রাখা আইন এখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সাংবাদিকতাকে প্রভাবিত করে এমন কতকগুলো আইনের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা দিচ্ছি: ১.) পেনাল কোড ১৯৬০ (ধারা ৪৯৯-মানহানি); ২.) ফৌজদারি কার্যবিধি ১৮৯৮ (ধারা ৯৯, ১০৮, ১৪৪); ৩.) অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট ১৯২৩; ৪.) আদালত অবমাননা আইন, ২০১৩; ৫.) প্রিন্টিং প্রেস ও প্রকাশনা (ঘোষণা ও নিবন্ধন) আইন, ১৯৭৩; ৬.) প্রেস কাউন্সিল আইন, ১৯৭৪; ৭.) সংবাদপত্র কর্মচারী (পরিষেবার শর্ত) আইন, ১৯৭৪; ৮.) তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি আইন, ২০০৬; ৯.) ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮; ১০.) ডিজিটাল, সোশ্যাল মিডিয়া এবং ওটিটি প্ল্যাটফর্মের জন্য বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি) রেগুলেশন, ২০২১; ১১.) ওভার দ্য টপ (ওটিটি) কনটেন্ট বেজড্ সার্ভিস প্রভাইডিং অ্যান্ড অপারেশন পলিসি, ২০২১ (আইসিটি বিভাগ দ্বারা); এবং ১২.) (খসড়া) ম্যাস মিডিয়া কর্মচারী (পরিষেবার শর্তাবলি) আইন ২০২২।
এখানে বলে রাখছি ২০১০ সালের পর থেকে যে আইনটি বেশির ভাগ সংবাদকর্মীদের উপর খড়গ চালিয়েছে সে বিষয়টি নিয়ে একটু তুলে ধরতে চাই। যেমন ২০০৬ সালে প্রণীত আইসিটি আইনের ৫৭ ধারা নিয়ে শুরুতেই প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। ২০১০ সালে এ আইনের আওতায় ফেসবুক বন্ধ করে দেয়া হলে ফেসবুক বন্ধ করা এবং ৫৭ ও ৪৬ ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়। আবেদনে ধারা দু’টিকে অসাংবিধানিক বলে অভিহিত করা হয়। শুনানি শেষে হাইকোর্ট ৫৭ ও ৪৬ ধারা কেন অবৈধ নয় জানতে চেয়ে সরকারের প্রতি রুল জারি করেন। চার সপ্তাহের মধ্যে আইন সচিব, তথ্য সচিব, তথ্য ও যোগাযোগ সচিব এবং বিটিআরসির চেয়ারম্যানকে জবাব দিতে বলা হয়। ২০১৩ সালে যখন আইসিটি আইন সংশোধন করা হয়, তখন স্বভাবতই আশা করা হয়েছিল, ৫৭ ধারার যথাযথ সংশোধন হবে। বাস্তবে সংশোধন হয় বটে তবে সেই সংশোধনীতে ধারাটিকে আরো কঠোর ও শক্ত করা হয়। পুলিশের ক্ষমতা বাড়ানো হয়। সন্দেহভাজন যে কাউকে বিনা পরোয়ানায় গ্রেফতার ও মামলা দায়েরের ক্ষমতা দেয়া হয়। সেই সঙ্গে এই আইনের আওতায় অপরাধকে জামিনের অযোগ্য করা হয়। শুধু তাই নয়, এ ধারায় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন কারাদন্ড ৭ বছর এবং সর্বোচ্চ ১৪ বছর করা হয়। একই সঙ্গে এক কোটি টাকার অর্থদন্ডে বিধান করা হয়। এ নিয়ে আইসিটি আইনের বিতর্কিত ৫৭ ধারা বাতিল করে ওই ধারার বিষয়গুলো প্রস্তাবিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে রেখে দেয়া এবং এর পাশাপাশি আরো নতুন কয়েকটি কঠোর ধারা তাতে সংযোজন করায় সাংবাদিক, আইনবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন। এখানে যা বলা আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫, ২৮, ২৯ ও ৩১ ধারার তা সন্নিবেশিত হয়েছে। সরকার ও আমলা কর্মকর্তা কর্মচারী সুকৌশলের আশ্রয় নিতে যাদের দিয়ে আইনটি তৈরি করেন তারা কি মনে করেন, তাঁরাই খুব চালাক-চতুর, অন্যরাসব বেয়াকুবের তালিকায় থাকেন। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে আরও ভয়ংকর ধারা যুক্ত করা হয়েছে। এটি ৩২ ধারা, যাতে বলা হয়েছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বেআইনি প্রবেশের মাধ্যমে কোনো সরকারি আধা সরকারি স্বায়ত্তশাসিত বা সংবিধিবদ্ধ কোনো সংস্থার কোনো ধরনের অতি গোপনীয় বা গোপনীয় তথ্য-উপাত্ত কম্পিউটার ডিজিটাল ডিভাইস, কম্পিউটার নেটওয়ার্ক বা অন্য কোনো ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ধারণ, প্রেরণ বা সংরক্ষণ করেন বা করিতে সহায়তা করেন তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে কম্পিউটার গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধ। ১৯২৩ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সরকারি গোপনীয়তা আইনের ৩ ধারার গুপ্তচরবৃত্তির অপরাধের শাস্তির বিভিন্ন বিধানকে ভিন্ন মোড়কে খসড়া ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ৩২ ধারায় সন্নিবেশিত করা হয়েছে। গুপ্তচর বৃত্তির অজুহাতে গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ব্যক্তির মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে তদন্তকারী কর্মকর্তার অভিপ্রায়নির্ভর করায় প্রস্তাবিত আইনটি ক্ষেত্র বিশেষে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহৃত হবে। এছাড়াও ৩২ ধারার অপপ্রয়োগের ফলে তথ্য অধিকার আইন ২০০৯ অনুযায়ী দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘন সংক্রান্ত তথ্য জানার অধিকার ব্যাপকভাবে রুদ্ধ হবে এবং ফলে দুর্নীতি ও মানবাধিকার লংঘন সুরক্ষিত হয়ে এরূপ অপরাধের অধিকতর বিস্তার ঘটাবে। মানবাধিকার লংঘন মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ সংক্রান্ত যে সমস্ত তথ্যাবলী মানুষের জানার কথা বা জানার অধিকার রয়েছে, এমনকি প্রকাশের অধিকার রয়েছে সাংবাদিকসহ অন্যান্য গণমাধ্যমকর্মীদের তা খর্ব করা হয়েছে।
একজন মন্ত্রী তো রাখ ঢাক না করেই বলেছেন, ঠিক তেমনি অনেক এমপি, নেতা লোকচক্ষু আড়ালে হোক বা প্রকাশ্যে হোক প্রায়শই বলে থাকে, গণমাধ্যমে যেভাবে বিভিন্ন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করেন, তাতে তাদের মান-ইজ্জত থাকে না। তাদের সম্মান ক্ষুন্ন হয়। তারা তো জনপ্রতিনিধি। তাই নিজেকে বাঁচাতে পারবে এবং আইনের বলে এখন হয়তো এমন পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়া যেতে পারে। যেমন সরকার দলের চুরিসহ বিভিন্ন ব্যাংকের অর্থ কেলেংকারির কথা দেশের মানুষ হয়তো কখনোই জানতে পারতো না। জানতে পারতো না ভুয়া মুক্তিযোদ্ধ সার্টিফিকেট বাণিজ্য, সরকারি কর্মকর্তাদের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিয়ে প্রমোশন হাতিয়ে নেয়া, গুনে গুনে ঘুষ খাওয়া কর্মকর্তার হদিস বা স্বর্ণের ক্রেস্টে স্বর্ণ কম থাকার কথা। বহু নেতা-এমপির বিরুদ্ধে সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যহার, মাদক ব্যবসা, মানবপাচার ইত্যাদির যে কথা-কাহিনী মানুষ জানতে পেরেছে, তাও হয়তো তাদের পক্ষে জানা সম্ভব হতো না। শুধু এখানেই ক্ষান্ত হননি “প্রস্তাবিত গণমাধ্যম আইন -২০২১ সংশোধন” দাবী তুলে সুকৌশলে গণমাধ্যম কর্মীদের উপর মালিক দাসত্বের সুবিধাভোগী আইন চাপিয়ে দেওয়া হয়। ২০ টি পয়েন্টের গুরুত্বপূর্ণ ১৩-২০ উল্লেখ করা হচ্ছে –
১৩. বিদ্যমান আইনে মালিকের সাথে দরকষাকষি, সভ,সমাবেশ করার অধিকার থাকলেও প্রস্তাবিত গণমাধ্যম আইনে তা রাখা হয়নি,বরং মালিকের অনুমতি ছাড়া সভা সমাবেশে যোগ দিলে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, ৬ মাসের জেলের বিধান রাখা হয়েছে।
১৪. প্রস্তাবিত আইনে সাংবাদিকদের ট্রেড ইউনিয়ন করার অধিকার থাকছে না, করা যাবে “কল্যাণ সমিতি”
১৫. বিদ্যমান আইন এবং শ্রম বিধিমালা অনুযায়ী কর্মরত সাংবাদিক ও সাংবাদিকদের উপর নির্ভরশীলদের চিকিৎসা সহায়তা দেয়া বাধ্যতামুলক থাকলেও প্রস্তাবিত আইনে তা রাখা হয়নি।
১৬. শ্রম আদালতের পরিবর্তে, গণমাধ্যম আদালত প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আদালতের কার্যক্রম খর্ব করা হয়েছে, – বিদ্যমান শ্রম আইনের ২১৯,২২০,২২১,২২২,২২৩,২২৮,২৩১ ধারা প্রয়োগেরও ক্ষমতা থাকছে না গণমাধ্যম আদালত ও আপিল আদালতের।
১৭. দি প্রেস কাউন্সিল এ্যাক্ট-১৯৭৪, প্রেস এন্ড পাবলিকেশন এ্যাক্ট -১৯৭৩ এর সাথে সাংঘর্ষিক প্রস্তাবিত আইনটি।
১৮. প্রস্তাবিত আইনটি বিদ্যমান বাংলাদেশ শ্রম আইন -২০০৬ সাথে সাংঘর্ষিক।
১৯. প্রস্তাবিত আইনটি ১৯৭৪ সালের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত নিউজ পেপার এ্যাক্ট -১৯৭৪ এবং ১৯৬১ সালের সাংবাদিকদের জন্য প্রণীত আইনেরও পরিপন্থী।
২০. প্রস্তাবিত আইনটি সংবাদপত্র ও সংবাদমাধ্যম এবং বাংলাদেশ সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের পরিপন্থী।
এখানেও যে আইন গুলো উত্থাপিত করা হয়েছে তার সবই হচ্ছে সাংবাদিকদের জন্য সরকার ও মালিক পক্ষের প্রতিপক্ষকে ঘায়েলের ধুঁকে মারা আইন। যেমন এই দেশে মুলা চুরির দায়ে ফাঁসি হয়, মুরগী চোরের গলায় ফুলের মালা দেওয়া হয়। ২০২২ সালের ১৪ জুন বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. নিজামুল হক যে তথ্য জানিয়েছেন, এবং তাঁর বক্তব্য মতে এই বছরের গণমাধ্যম কর্মীদের উপর শেষ স্টিমরোলার চালিয়ে দিয়ে সরকার অনায়াসে অপকর্মে ফর্দ শাক দিয়ে ঢেকে দেওয়ার পায়তারা চালাচ্ছে। বক্তব্যটি হচ্ছে, সাংবাদিকেরা অন্যায় করলে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রেখে একটি আইন হচ্ছে। আইনের খসড়া এখন মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে আছে। আগামী সংসদেই তা পাস হতে পারে। তাহলে কি শুধু আমলা, মন্ত্রী মিনিস্টার, নেতা, বিচারকদের চোখে পৃথিবীর সবচাইতে বড় অপরাধী গণমাধ্যমকর্মী, অন্যরাসব ধুঁয়া তুলশি পাতা।
আমরা যারা মিডিয়াতে কাজ করি তারা বুঝতে পারছি এবং সম্পাদক, মালিক এবং কর্মরত সাংবাদিক ইউনিয়ন সকলেই এ বিষয়ে একমত যে, এই আইনটি ‘অসুখের চেয়েও ক্ষতিকারক ওষুধ’ এর মতো এবং এটি মিডিয়াকে জটিল এবং প্যাঁচানো আইনি লড়াইয়ে জড়িয়ে ফেলবে।
বাধ্যতামূলকভাবে প্রতিবেদন দাখিলের মতো শর্ত জুড়ে দিয়ে মিডিয়া হাউসের পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক হস্তক্ষেপ বাড়ানোর অসংখ্য বিধান রাখা হয়েছে। এটি বেসরকারি খাতে শিল্প পরিচালনার স্বাভাবিক ধরনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
মানসিকতার সম্পূর্ণ পরিবর্তনের সময় এসেছে। গণমাধ্যমকে সব সময় ‘শত্রু’ হিসাবে দেখার, তাকে নিয়ন্ত্রণ করার বা অন্ততপক্ষে নজরদারিতে রাখার পরিবর্তে এটিকে গণতন্ত্র ও উন্নয়নের ‘মিত্র’ হিসাবে দেখা উচিত।
লেখক :- চট্টগ্রাম ব্যুরো প্রধান, দৈনিক আমাদের নতুন সময়