১০ ডিসেম্বর : আওয়ামীলীগ-বিএনপি মুখোমুখি, কিন্তু কেন ? -শাহাজাদা এমরান

সময়ের সংলাপ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

আগামী ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে আমাদের জাতীয় রাজনীতির মাঠ বেশ উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এত দিন আওয়ামীলীগ বিএনপির মহাসচিব পর্যায় থেকে শুরু করে মধ্যম সারির নেতাদের মধ্যে বেশ বাকযুদ্ধ চলে আসলেও গত দুই দিন ধরে শুরু হয়েছে রাজনীতির সনাতন সিলেবাস ‘গ্রেফতার রাজনীতি’। রোববার (৪ ডিসেম্বর) বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের ছাত্রলীগ কর্তৃৃক গাড়ি ভাংচুর ও কর্মীদের পিটানোর মধ্যে দিয়ে এক রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনার সূত্রপাতের দিকে যাচ্ছে কি না সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে সাধারণ মানুষের মধ্যে ।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গত প্রায় দুই মাস আগে থেকেই এ কর্মসূিচ ঘোষণা করেছে। তারা তাদের চলমান সরকারি বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে দেশের প্রতিটি বিভাগীয় জেলা সদরে গণসমাবেশের আয়োজন করে। সরকার কর্তৃক বিচ্ছিন্ন কয়েকটি ঘটনা ছাড়া এবং পরিবহন ধর্মঘটের মত অহেতুক জনদূর্ভোগের গায়েবি কর্মসূিচ পালন ছাড়া বলা যায়, দেশের অপর ৯টি বিভাগীয় গণসমাবেশ অত্যান্ত শান্তিপূর্ণ ভাবে সম্পন্ন হয়েছে। বিরোধী দলের পক্ষ থেকে কোথায়ও কোন অপ্রীতিকর ঘটনা হয়েছে বলে এমন সংবাদও এখন পর্যন্ত আসে নি।

বিএনপি আগামী ১০ ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ বিএনপি কেন্দ্রীয় কার্যালয় নয়াপল্টনে করার বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুুলিশের কাছে লিখিত আবেদন করেছে। অবশ্য এর আগ থেকেই বর্তমান ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগ নয়াপল্টনে গণসমাবেশ করার অনুমতি দিবে না এবং সহজ করে বললে বলা হয় এখানে আওয়ামীলীগ বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেবে না। বিএনপিও এখানে সমাবেশ করতে এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত অনড় রয়েছে।

১০ ডিসেম্বর গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে বিএনপির পক্ষ থেকে ঢাকা মহানগর পুলিশকে লিখিত ভাবে অনুমতির জন্য আবেদন করার পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ বিএনপিকে ২৬ শর্তে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়। পুলিশের ২৬ শর্তের মধ্যে একটি শর্ত হলো, গণসমাবেশে আসার সময় যেন মিছিল নিয়ে কেউ না আসে। এটা একটা হাস্যকর শর্ত। এই শর্ত কি পুলিশ বুঝে দিয়েছে না কি না বুঝে দিয়েছে তা নিয়ে অবশ্য সংশয় থেকে যায়। কারণ, গণসমাবেশ একটি রাজনৈতিক দলের রাজনৈতিক কর্মসূচি। পৃথিবীর এ যাবত কালের ইতিহাসে কোথায়ও কি আছে রাজনৈতিক দলের সমাবেশে কর্মীরা চুপচাপ সারিবদ্ধ ভাবে ঢুকে। ২৬ শর্তের মধ্যে এমন আরো অনেক শর্ত রয়েছে যা হাস্যকর তো বটেই এবং অবাস্তবও।

কেন বিএনপি তাদের ঢাকা বিভাগীয় গণসমাবেশ নয়াপল্টনই করতে চাচ্ছে এবং কেন আওয়ামীলীগ বিএনপিকে নয়াপল্টনে সমাবেশ করার অনুমতি দিতে চাচ্ছে না অল্প কথায় তা একটু বিশ্লেষণ করা যাক।
বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের বক্তব্য থেকে পরিস্কার যে, তারা সরকারকে বিশ^াস করতে পারছে না। এখানে বিশ^াস একটি বড় ফ্যাক্টর। ইগোটি আসছে পরে। বিএনপি মনে করে তাদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নয়াপল্টন এলাকাটি তাদের জন্য অধিকতর নিরাপদ। কোন কারণে সরকার যদি বিএনপিকে ফাঁদে ফেলার জন্য নিজেরাই সাবোটাজ করে বা করাতে চায় তাহলে তাদের নেতাকর্মীরা দ্রুত নিরাপদে এই এলাকা ত্যাগ করতে পারবে। যা বাউন্ডারী বেষ্টিত সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্ভব না। এই নয়াপল্টন এলাকাটি চারদিকে খোলা এবং বিএনপির নেতাকর্মীদের একটি অধিক পরিচিত এলাকা।

অপর দিকে, আওয়ামীলীগ এখানে বিএনপিকে সমাবেশ করার অনুমতি না দেওয়ার সবচেয়ে বড় কারণ হচ্ছে, এই সমাবেশকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে বিএনপি নেতাদের কিছু বক্তব্য সরকারের মধ্যে এক ধরনের অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। বিএনপি নেতা ও ঢাকসুর সাবেক ভিপি আমান উল্লাহ আমান বলেছিলেন আগামী ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশ চলবে বেগম খালেদা জিয়ার কথ্য়া ইত্যাদি। আবার সরকারের মধ্যে আরেকটি বড় অস্থিরতার কারণ হচ্ছে, সরকার ধারণা করছে যদি তাদের অনুমান মতে, ১০ ডিসেম্বর সমাবেশে সত্যি সত্যি বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া হাজির হয় এবং তাকে কেন্দ্র করে নেতাকর্মীদের মধ্যে যে আবেগ রয়েছে সেই আবেগ থেকে তাৎক্ষনিক কোন ঘটনা ঘটে গেলে আওয়ামীলীগ তথা সরকারের পক্ষে এটা সামাল দেওয়া হয়তো কঠিন থেকে কঠিনতর হতে পরে। অন্য দিকে, আমাদের দেশের রাজনীতির যে সংস্কৃতি তা হলো ইগো। এই ইগো থেকে আওয়ামীলীগ কিংবা বিএনপি কেউ বের হতে পারেনি। যেহেতু বিএনপি নয়াপল্টনই চাচ্ছে তাই আওয়ামীলীগ মনে করে এখন তারা যদি বিএনপিকে নয়াপল্টনই সমাবেশ করতে দেয় তাহলে তাদের রাজনৈতিক পরাজয় হবে। বিপরীত দিকে বিএনপিও তাই।

আরেকটি বিষয়, আওয়ামীলীগের আরেকটি খোঁড়া যুক্তি হলো, নয়াপল্টনে দিলে রাজধানী জুড়ে যানজট সৃষ্টি হবে। এটাও সঠিক না। কারণ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান হলো একেবারে রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে। যদি এখানেও গণমাবেশ হয় তাহলে নেতাকর্মীরা তো আর আকাশ দিয়ে এই উদ্যানে আসবে না। তারা ঢাকার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মিছিল করেই আসবে। সুতরাং যানজট নয়াপল্টনে দিলে যা হবে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে দিলে তাই হবে।

আমাদের দ্বাদশতম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক বছর সময় আছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ক্ষণগননা শুরু হয়ে গেছে। বাড়ছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। আওয়ামীলীগ হয়তো চাচ্ছে ২০১৪ এবং ২০১৮ সালের মত একটি নির্বাচন সম্পন্ন করে টানা চতুর্থ বারের মত রাষ্ট্র ক্ষমতায় ফিরে আসতে। আর বিএনপি এবার বাঁচা মরার লড়াই হিসেবে দেখছে এই নির্বাচনকে। কারণ, তারা ক্ষমতায় নেই টানা প্রায় সতের বছর ধরে। সুতরাং নিজেদের অস্তিত্ব টিকে রাখার জন্য তাদের আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ গ্রহণের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু বিএনপি এটা ভালো করেই বুঝে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া তাদের পক্ষে বিজয়ী হয়ে আসা সম্ভব না। আর আওয়ামীলীগ ও এটা ভালো করেই বুঝে নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আনা মানেই তাদের নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল দেওয়া।

কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে না হবে এটা এখনি বলা বা সিদ্ধান্তে পৌঁছা সম্ভব না। কারণ, আওয়ামীলীগ যেমন তত্ত্বাবধায়ক সরকার এনে নিজের গলায় নিজে দড়ি দিবে না ঠিক তেমনি বিএনপিও আওয়ামীলীগের অধীনে নির্বাচনে গিয়ে নিজের ফাঁসি নিজে দিবে না। সুতরাং কোন পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে এটা সিদ্ধান্ত হবে রাজ পথে । কার কোমড়ের শক্তি কতটুকু তার উপর। আমাদের হাজার বছরের ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় , কোন দাবিই কখনো সহজে আদায় হয় না, হবে না এবং হওয়ার কথাও না। দাবী আদায় করতে হলে অবশ্যই রাজপথে শক্তিপ্রদর্শণের কোন বিকল্প নেই। কিন্তু তা হতে হবে জনগণকে সাথে নিয়ে। জনবিচ্ছিন্ন কোন আন্দোলন আবার দাবি আদায়ে সহায়তাতো করবেই না বরং হিতে বিপরীত হবে।

৩ ডিসেম্বর শনিবার পুলিশের আইজি গণমাধ্যমকে বলেছেন, ১০ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে তিনি কোন নাশকতার কোন কিছু খুৃঁজে পাননি। দেশের সাধারণ জনগনের এখানেই প্রশ্ন, তাহলে নয়াপল্টন বিএনপিকে দিলে ক্ষতি কি।
বিএনপির গণসমাবেশের পাশাপাশি ইতিমধ্যে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজশাহী ও চট্রগ্রামে বড় বড় দুটি সমাবেশ করেছেন। এটাই আসলে রাজনীতির সুস্থ প্রতিযোগিতা। আমি মনে করি, বিএনপি তথা বিরোধী দলের রাজনীতির কর্মসূচির বিপরীতে আওয়ামীলীগও রাজনৈতিক কর্মসূচি দিক। জনগণ উভয় দলের বক্তব্য শুনে সিদ্ধান্ত নিক। বিএনপি যদি সরকার বিরোধী আন্দোলন করে তাহলে সরকারও সরকার রক্ষায় জনগণকে সাথে নিয়ে আন্দোলন করুক, কোন সমস্যা নেই। যার সাথে জনগণ থাকবে সে সফল হবে। কিন্তু জনগণের দোহাই দিয়ে কারো কর্মসূচি বানচাল করে দেওয়া বা করতে না দেওয়া বা প্রতিহিংসার মাধ্যম ভ-ুল করে দেওয়া বা যে কোন উপায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা তা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য নয়।

১০ ডিসেম্বর কেন্দ্র করে ইতিমধ্যে ঢাকায় যে গ্রেফতার শুরু হয়েছে, নেতাদের গাড়ি ভাংচুর শুরু হয়েছে তা নিন্দনীয়। এটা বন্ধ করতে হবে।

৪ ডিসেম্বর রোববার বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং তুরাগ নদীর বাহিরে যদি কোন বিকল্প ভেন্যুর প্রস্তাব দেওয়া হয় তাহলে আমরা বিবেচনা করব। আমি মনে করি এখন বলটি সরকারের কোর্টেই ফেলে দিয়েছে ফখরুল সাহেব। এখন জনগণ অপেক্ষায় আছে সরকারের পরবর্তী সিদ্ধান্তের।

এমনিতেই নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের উর্ধ্বগতিতে দিশেহারা জনগণ। তার উপর রাজনৈতিক অস্থিরতা জনগণের জন্য মরার উপর খাড়ার ঘা হিসেবে দেখা দিবে। আমরা উভয় পক্ষকেই সহনশীল রাজনীতির চর্চা করে সামনে দিনগুলোতে আগানোর অনুরোধ করছি।

লেখক : ব্যবস্থাপনা সম্পাদক,দৈনিক আমাদের কুমিল্লা ও সাধারণ সম্পাদক,সাংবাদিক সমিতি কুমিল্লা জেলা, ০১৭১১-৩৮৮৩০৮।