৬৯ ঘন্টা পর স্পষ্ট করল কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ

কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় কমিটি বলবৎ
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

*ধোঁয়াশা এক সিদ্ধান্তে রণক্ষেত্র হয়েছে কুবি, হুমকিতে পড়েছিল ৭ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন
*ক্যাম্পাসে বিস্ফোরিত হয়েছে ককটেল ও ফাঁকাগুলি
*বহিরাগতদের নির্দেশনায় হল সিলগালা
*থমথমে অবস্থার অবসান

মহিউদ্দিন মাহি।।
কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় (কুবি) শাখা ছাত্রলীগের কমিটি বিলুপ্তি নিয়ে নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ। সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্যের পর সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয়ও বলেছেন কুবি শাখার কমিটি বলবৎ রয়েছে। চলতি মাস শেষে সম্মেলন করে নতুন কমিটি দেওয়া হবে।
ধোঁয়াশা সিদ্ধান্ত ছড়িয়ে পড়ার ৬৯ ঘন্টা পর ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী সংসদ নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করলেও এরই মধ্যে কুবি ক্যাম্পাসে ঘটে গিয়েছে নানা অরাজকতা। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরেই ককটেল ও ফাঁকাগুলি বিস্ফোরণের পর আবাসিক হলসমূহ সিলগালা করেছে বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সংকটে পড়েছিল কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ের প্রায় ৭ হাজার শিক্ষার্থীর জীবন।
গত শুক্রবার রাত ১১টা ৪৯ মিনিটে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি আল নাহিয়ান খান জয় তাঁর ফেসবুক ওয়ালে নিজের ও সাধারণ সম্পাদক লেখক ভট্টাচার্য স্বাক্ষরিত চারটি প্রেস বিজ্ঞপ্তি শেয়ার করেন। একই বিজ্ঞপ্তিগুলো শেয়ার করা হয় লেখক ভট্টাচার্র্য ও বাংলাদেশ ছাত্রলীগের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজেও। যেখানে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় শাখা কমিটিকে মেয়াদোত্তীর্ণ দেখিয়ে এ কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়। তবে রাত সোয়া ১২ টার দিকে লেখক ও ছাত্রলীগের ফেসবুক ফেসবুক পেইজ থেকে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয় সংক্রান্ত প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে নেওয়া হয়। এর ফলে কেন্দ্রীয় ও শাখা ছাত্রলীগের একটি অংশ কমিটি বিলুপ্ত হয়নি দাবি করেছিল। পরে রাত রাত ২টা ১০ মিনিটে কমিটি বিলুপ্তি হয়নি দাবি করে লেখক ভট্টাচার্য সাংবাদিকদের বলেন, কমিটি বিলুপ্ত করা হয়নি। সম্মেলন আয়োজন করা হবে। তারিখ নির্ধারণ হলে জানানো হবে।
সাধারণ সম্পাদক কমিটি বিলুপ্তির কথা অস্বীকার করলেও সভাপতি থেকে এ ধরনের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এমনকি সভাপতির অনুসারী কেন্দ্রীয় নেতারাও কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে বলে দাবি করেছিলেন। তবে সোমবার রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সভাপতি জয় তাঁর ফেসবুক ওয়াল থেকে কুবি কমিটি সংক্রান্ত ওই বিজ্ঞপ্তিটি সরিয়ে নেন। রাত ৯টায় একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের টকশো-তে এসে বলেন, আমরা একই দিনে ৩টি ইউনিটের সম্মেলনের তারিখ দিয়েছি। কিন্তু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে যে প্রেস রিলিজ দেওয়া হয়েছে সেটাতে সম্মেলনের তারিখ দেওয়ার চিন্তা ছিল। ভুলবশত সম্মেলনের তারিখ ছাড়া বিভিন্ন মাধ্যমে প্রেস রিলিজটি শেয়ার হয়ে গেছে এবং আমরা এই অনাকাঙ্খিত ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করছি।
এদিকে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের এমন ধোঁয়াশা সিদ্ধান্তে রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছিল কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়। শনিবার বিকেল ৩টার দিকে ছাত্রলীগের একটি দল (সাবেক সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহী সমর্থিত) ৪০ থেকে ৫০ টি মোটরসাইকেল নিয়ে পুলিশ ও প্রক্টরের সামনে দিয়েই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ফাঁকা গুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। মোটরসাইকেল আরোহীদের মধ্যে গুটিকয়েক ব্যতীত সকলেই স্থানীয় বহিরাগত ছিল বলে দাবি করেছেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। এরমধ্যে ২০১৬ সালের পহেলা আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে ফুল দেওয়াকে কেন্দ্র করে নিহত খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যাকাণ্ডের প্রধান আসামি বিপ্লব চন্দ্র দাস ও ২০১৭ সালে বিলুপ্ত কমিটির সাধারণ সম্পাদক রেজা-ই-এলাহীসহ আরও কয়েকজন। বহিরাগতদের মধ্যে ছিল বিভিন্ন সময়ে ছিনতাইয়ে অভিযুক্ত ইকবাল হোসেন ওরফে টারজান ইকবাল, ডাকাতি মামলার আসামি শাহজাহান, কোটবাড়ি, সালমানপুর ও বাতাইছড়ি (রেজা-ই-এলাহীর গ্রাম) এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা কবির, লিটন, আলাউদ্দিন, মনির, মোশাররফ, আকতার, নজির আহমেদ, সুমনসহ স্থানীয় বিভিন্ন অটো ও সিএনজি চালকরা।
যদিও বহিরাগতদের বিষয় অস্বীকার করে এ অংশের নেতা রেজা-ই-এলাহী বলেন, কমিটি বিলুপ্তির সংবাদে বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটি ও অর্থমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে আনন্দ মিছিল বের করেছি। এখানে কোনো বহিরাগত ছিল না। ককটেল বিস্ফোরণ ও ফাঁকাগুলির অভিযোগ মিথ্যা।
খালেদ সাইফুল্লাহ হত্যা মামলার প্রধান আসামি বিপ্লব চন্দ্র দাসের মুঠোফোনে কল দিয়েও কোনো মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
বহিরাগতদের মহড়ার পরই বিভিন্ন ধরনের দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ক্যাম্পাসে মহড়া দিয়েছে শাখা ছাত্রলীগের বর্তমান কমিটির নেতা-কর্মীরা। তাঁদের হাতে রামদা, হকিস্টিকসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। এদের মধ্যে ছিলেন যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইমাম হোসাইন মাসুম, সহ-সম্পাদক কাজল হোসাইন, বিজ্ঞান অনুসদের সভাপতি জিলান আল মাসুদসহ আরও অনেকে। তাঁরাও পুলিশ ও প্রক্টরের সামনেই অস্ত্র হাতে মহড়া দেন। অস্ত্র হাতে রেখেই ‘ক্যাম্পাস ও প্রধান ফটক বন্ধ থাকার পরও কিভাবে বহিরাগতরা ক্যাম্পাসে ঢুকে’ জিজ্ঞেস করে প্রক্টরের সাথেও বাগ্বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন তাঁরা।
ছাত্রলীগের এমন দ্বিচারি সিদ্ধান্তের ফলে হুমকিতে পড়েছিল সাধারণ শিক্ষার্থীদের জীবন। পূজার বন্ধ শেষে আগামী ১০ থেকে ১৭ তারিখ পর্যন্ত সকল ধরনের পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য আবাসিক হলসমূহ সিলগালা করে দেয় প্রশাসন। যদিও শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন সবুজ দাবি করেছেন, বিপরীত পক্ষকে সুবিধা দিতেই প্রশাসন এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ইলিয়াস বলেন, কয়েকজন শিক্ষক ও প্রশাসনের সাথে বহিরাগত ও সাবেক ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের যোগসাজোশ থাকার কারণে হল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বিশ^বিদ্যালয়েরই কয়েকজন শিক্ষক তাঁদেরকে (রেজা সমর্থিতদের) শিখিয়ে দেন যেন হল বন্ধ করার কথা ওঠে।
ইলিয়াসের কথার সত্যতা মিলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত শনিবারের ঘটনার ভিডিওতেও। যেখানে রেজার অনুসারীরা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হলের সামনে ফাঁকাগুলি ও ককটেল বিস্ফোরণ করে হলে আক্রমণের পর প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা তাঁদের থামানোর চেষ্টা করে বের হয়ে যেতে বললে ছাত্রলীগ কর্মী ইকবাল খান (রেজার অনুসারী) লাঠি হাতে নিয়ে প্রক্টর (ভারপ্রাপ্ত) কাজী ওমর সিদ্দিকীকে বলেন, ‘হল বন্ধ করেন, না হয় আমরা যাচ্ছি (হলের ভেতরে)।’ এসময় সাথে থাকা অন্যরাও একই দাবিতে শোরগোল করতে থাকেন। তবে প্রক্টর বলেন, এ বিষয়ে তারা না জেনেই মন্তব্য করেছে। প্রশাসন শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করেই আবাসিক হলসমূহ বন্ধের ঘোষণা দিয়েছে।
আবাসিক হলসমূহ সিলগালা করে দেওয়ার পর বাড়ি ফেরার পথে ইলিয়াসের অনুসারীদের মারধর করার অভিযোগও উঠেছে রেজার অনুসারীদের বিরুদ্ধে। শনিবার রাতে কোটবাড়িতে কয়েকজনকে মারধর করার পর ইলিয়াসের অনুসারীদেরকে বিশ^বিদ্যালয়ের নিজস্ব পরিবহন দিয়ে বিভিন্ন বাস স্টপেজে পৌঁছে দেয় প্রশাসন।
শুক্রবার রাতের পর থমথমে অবস্থা বিরাজ করেছিল কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে। হল সিলগালা করার পর শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে গেলেও রেজার অনুসারীরা সোমবার সারাদিনই থেমে থেমে মহড়া দিয়েছেন ক্যাম্পাস সংলগ্ন সড়কে। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে সকলের প্রবেশ নিষেধ করে মূল ফটকে সর্বক্ষণ রাখা হয়েছিল পুলিশের গাড়িও। তবে সোমবার রাতে কমিটি বলবৎ থাকার বিষয়টি জয় নিশ্চিত করার পর মঙ্গলবার ক্যাম্পাসে আশেপাশে দেখা যায়নি পুলিশের গাড়ি কিংবা ছাত্রলীগের উভয় পক্ষের কাউকে। শিক্ষার্থীরা বলছেন, গেল তিনদিন তাঁরা আতঙ্কে দিনাতিপাত করেছিলেন। সে শঙ্কা এখন অনেকটাই কেটে গেছে তাঁদের।
এদিকে ছাত্রলীগের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় নেতারাও। তাঁরা বলছেন, একটি কমিটি বিলুপ্তিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের শীর্ষ নেতারা দায়িত্বহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। কেন্দ্রীয় নেতাদের ঐক্যমত্যে না পৌছাঁনোর কারণে কুবিতে এই বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছে। বড় ধরণের কোনো সংঘাত কিংবা হত্যাকাণ্ড ঘটে গেলে এর দায়ভার কে নিত?
এ বিষয়ে কুবি ছাত্রলীগের সভাপতি ইলিয়াস হোসেন বলেন, এখানে কিছু ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হয়েছিল। মূলত একই সাথে একাধিক কমিটি বিলুপ্ত করার বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করায় এমন ঘটেছে। তবে শিক্ষার্থীদের কথা বিবেচনা করেই গতকাল কেন্দ্রীয় সভাপতি বিষয়টি পরিষ্কার কওে দিয়েছেন।
আরেক পক্ষের নেতা রেজা-ই-এলাহী বলেন, কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ যে দিক নির্দেশনা দিবে সেটিই হবে। সম্মেলনের তারিখ দিলে সম্মেলন হবে।
তবে ছাত্র রাজনীতিতে এমন দ্বিচারিত সিদ্ধান্তের নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে মনে করেন কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি সোহান খান। তিনি বলেন, শুক্রবার ছাত্রলীগের সভাপতি কুবির কমিটি বিলুপ্ত হয়েছে এমন একটি নোটিশ দেন। সাধারণ সম্পাদক আবার সেটি নাকচ করেছেন। এটি তারা দুজনের দায়, তারা ঐক্যমত্যে পৌঁছাতে পারেননি।
একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই নেতার মধ্যে মতানৈক্যের কারণে কুমিল্লা বিশ^বিদ্যালয়ে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি হওয়া ছাত্রলীগের জন্য লজ্জার এবং দুঃখজনক দাবি করে সোহান বলেন, সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক থেকে দায়িত্বশীল আচরণ আশা করেছিলাম আমরা। এ দায় তাদেরকেই নিতে হবে। তাদের সেচ্ছাচারিতার কারণেই কেন্দ্রে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গেছে। এর কুফল তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছেছে।