২০১৫ সালের ১৫ মে। অনলাইন নিউজ পোর্টাল হিসেবে পথচলা শুরু করেছিল কুমিল্লার জমিন। সেই সময় কুমিল্লায় আজকের মতো এত বেশি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ছিল না। সীমিত পরিসরে শুরু হওয়া সেই পথচলা ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়েছে। ২০২০ সালের দিকে কুমিল্লার জমিনের ফেসবুক পেজের যাত্রা শুরু হয়। এরপর মহান আল্লাহর অশেষ রহমত এবং বৃহত্তর কুমিল্লা, বৃহত্তর নোয়াখালীসহ সারা দেশের অসংখ্য পাঠকের ভালোবাসা, বিশ্বাস ও আস্থায় কুমিল্লার জমিন হয়ে ওঠে মাটি ও মানুষের কথা বলার অন্যতম মুখপত্র।
২০২১ সালের ডিসেম্বরের দ্বিতীয় সপ্তাহে জাতীয় দৈনিক হিসেবে কুমিল্লার জমিন ঢাকায় ডিক্লারেশন লাভ করে। একই বছরের ২৮ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে দৈনিক কুমিল্লার জমিন। তবে কৌশলগত কারণে তখন মূলত অফিস কপি ছাপা হতো, যা নিয়মিতভাবে পাঠকের হাতে পৌঁছাত না।
দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—১০ আগস্ট ২০২৫। ‘ন্যায়ের পথে সংগ্রাম অবিরত’ এই স্লোগানকে ধারণ করে কুমিল্লার মাটি থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশনা শুরু হয় দৈনিক কুমিল্লার জমিনের।
কাগজে-কলমে হিসাব করলে ২০২৬ সালের ২৮ ডিসেম্বর দৈনিক কুমিল্লার জমিন পাঁচ বছর পূর্ণ করবে। কিন্তু আমাদের কাছে বয়সের হিসাবের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ পাঠকের হাতে পত্রিকাটি পৌঁছানোর দিনটি। ২০২৫ সালের ১০ আগস্টই প্রথম কুমিল্লার মানুষ নিয়মিতভাবে কুমিল্লার জমিন হাতে পেয়েছেন। তাই এই দিনটিকেই আমরা পত্রিকার প্রকৃত জন্মদিন ও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী হিসেবে নির্ধারণ করেছি। যদিও পত্রিকার প্রিন্টার্স লাইনে পত্রিকার ডিক্লারেশন পাওয়ার পর অফিস কপি ছাপার তারিখকেই (২৮.১২.২০২১) পত্রিকার প্রকৃত বয়স হিসেবে গণ্য করবে।
প্রিয় পাঠক, আজ ১০ আগস্ট ২০২৬। কুমিল্লার মাটি থেকে আনুষ্ঠানিক প্রকাশনার এক বছর পূর্ণ করল আপনাদের প্রিয় দৈনিক কুমিল্লার জমিন। এই এক বছর কেবল একটি সংবাদপত্রের পথচলার সময় নয়; এটি আমাদের জন্য ছিল পরীক্ষা, সংগ্রাম, স্বপ্ন, সাহস এবং টিকে থাকার এক কঠিন অধ্যায়।
২০১২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট পর্যন্ত আমার সম্পাদনায় কুমিল্লা থেকে প্রকাশিত হয়েছে হাজারো পাঠকের ভালোবাসার পত্রিকা দৈনিক আমাদের কুমিল্লা। সরকারি নির্দেশনায় ২০২৫ সালের ৯ আগস্ট যখন সেই পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ করে দিতে হয়, তার পরদিনই—১০ আগস্ট—এক বিশাল চ্যালেঞ্জকে সামনে রেখে শুরু করি দৈনিক কুমিল্লার জমিনের নতুন যাত্রা।
সত্যি বলতে, সেই যাত্রা আমার জন্য মোটেই সহজ ছিল না। ছিল অনেক বন্ধুর পথ। দৈনিক আমাদের কুমিল্লা সরকারি বিজ্ঞাপনের তালিকাভুক্ত পত্রিকা ছিল। সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভর করেও যেখানে একটি সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখা কঠিন, সেখানে কোনো সরকারি বিজ্ঞাপন ছাড়াই আরও বড় কলেবরে একটি দৈনিক প্রকাশ করা কতটা কঠিন, তা কেবল যারা সংবাদপত্র পরিচালনা করেন তারাই বুঝতে পারেন। সেই কঠিন কাজটিই হাতে নিয়েছিলাম আমি ।
এই পত্রিকাটি চালিয়ে নিতে গিয়ে ব্যক্তিগতভাবেও আমাকে কম অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে যেতে হয়নি। অনেক সময় নিজের প্রয়োজনকে পাশে রেখে পত্রিকার প্রয়োজনকে সামনে রাখতে হয়েছে। কখনো কখনো হিসাবের খাতায় আয়-ব্যয়ের সমীকরণ মেলেনি, তবুও পত্রিকার প্রকাশনা বন্ধ রাখার কথা ভাবিনি। কারণ তখন মনে হয়েছে, এটি শুধু আমার পত্রিকা নয়—এটি পাঠকের ভালোবাসা ও বিশ্বাসের জায়গা। সেই বিশ্বাসের কাছে ব্যক্তিগত কষ্টও ছোট হয়ে গেছে।
২০২৫ সালের ১০ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ১০ আগস্ট—এই এক বছরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগিয়ে এসেছে কুমিল্লার জমিন। শুরু থেকেই আমাদের চেষ্টা ছিল একটাই—সত্যকে সত্য হিসেবে তুলে ধরা, অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলা এবং মানুষের কথা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সম্পাদকীয় নীতির সততা, সংবাদের বস্তুনিষ্ঠতা এবং জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই কুমিল্লার জমিন পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। বাড়তে থাকে পাঠকের সংখ্যা, বাড়তে থাকে পত্রিকার প্রতি মানুষের আগ্রহ ও প্রত্যাশা। তবে প্রচার সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে একটি ডিএফপি-বিহীন পত্রিকার ব্যয়ও বাড়তে থাকে। তাই আয়-ব্যয়ের কঠিন বাস্তবতার মধ্যেও আমাদের চেষ্টা ছিল—পাঠকের আস্থা যেন কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়।
‘ন্যায়ের পথে সংগ্রাম অবিরত’—এটি শুধু আমাদের স্লোগান নয়; এটি আমাদের পথচলার দর্শন। অন্যায়, অনিয়ম, দুর্নীতি, বৈষম্য কিংবা মানুষের অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সামনে এলে আমরা কথা বলতে চাই। একই সঙ্গে সমাজের অবহেলিত, নিপীড়িত ও প্রান্তিক মানুষের কথাও তুলে ধরতে চাই। কারণ একটি সংবাদপত্রের শক্তি শুধু বড় খবর প্রকাশে নয়; যে মানুষের কথা কেউ শুনতে চায় না, তার কথাটিও দায়িত্ব নিয়ে তুলে ধরার মধ্যে।
আমরা বিশ্বাস করি, সাংবাদিকতা কারও পক্ষ নেওয়ার নাম নয়; সাংবাদিকতা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর নাম। এই বিশ্বাস নিয়েই কুমিল্লার জমিন এগিয়ে চলছে।
মাত্র এক বছরের কুমিল্লা-পর্বে পাঠকের ভালোবাসায় কুমিল্লার জমিন আজ কেবল একটি জেলার সংবাদপত্র হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ধীরে ধীরে এটি চট্টগ্রাম বিভাগের একটি গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যম হিসেবে নিজের জায়গা তৈরি করছে। কুমিল্লার পাশাপাশি বিভাগের বিভিন্ন জেলার সংবাদ, মানুষের জীবনযাপন, সমস্যা, সম্ভাবনা, উন্নয়ন, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং জনমানুষের প্রত্যাশাকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই। আমাদের লক্ষ্য—পাঠকের কাছে এমন একটি সংবাদমাধ্যম হয়ে ওঠা, যার খবর মানুষ বিশ্বাস করতে পারেন।
একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত শক্তি তার পাঠক। পাঠক আমাদের খবর পড়েন, ভুল ধরিয়ে দেন, পরামর্শ দেন, কখনো সমালোচনা করেন, আবার ভালো কাজের জন্য উৎসাহও দেন। এই সম্পর্কই একটি সংবাদপত্রকে বাঁচিয়ে রাখে। তাই আজকের এই বর্ষপূর্তিতে কুমিল্লার জমিনের অগণিত পাঠক, সংবাদদাতা, প্রতিনিধি, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী, সংবাদকর্মী এবং এই পরিবারের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের প্রতি জানাই গভীর কৃতজ্ঞতা।
বিশেষ করে কুমিল্লার পাঠকসমাজ যেভাবে শুরু থেকেই কুমিল্লার জমিনকে আপন করে নিয়েছেন, তা আমাদের জন্য শুধু গর্বের নয়, আরও ভালো কাজ করার দায়ও বাড়িয়ে দিয়েছে।
কুমিল্লার জমিনের দায়িত্ব শুধু সংবাদ প্রকাশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে চাই না। আমরা বিশ্বাস করি, একটি সংবাদমাধ্যমের সামাজিক দায়ও রয়েছে। অবক্ষয় ও অপসংস্কৃতিমুক্ত, উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সংবাদপত্র তার নিজস্ব জায়গা থেকে ভূমিকা রাখতে পারে। সেই ভাবনা থেকেই চলতি বছর গড়ে তোলা হয়েছে ‘কুমিল্লার জমিন পরিবার’ নামে একটি সামাজিক সংগঠন।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশ ও সংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে কাজ করবে কুমিল্লার জমিন পরিবার। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠনটি তার কার্যক্রমের জানান দিয়েছে। অর্থাৎ, কুমিল্লার জমিন একদিকে যেমন সংবাদপত্রের পাতায় মা, মাটি ও মানুষের কথা বলবে, অন্যদিকে কুমিল্লার জমিন পরিবার মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজ ও দেশ গঠনে ভূমিকা রাখবে।
আমরা চাই, সংবাদ কেবল খবরের কাগজে আটকে থাকবে না; সংবাদ থেকে তৈরি হবে সচেতনতা, আর সেই সচেতনতা থেকে তৈরি হবে পরিবর্তন।
এক বছর পূর্তি আমাদের আনন্দের, কিন্তু আত্মতুষ্টির নয়। বরং এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সামনে আরও বড় পথ পড়ে আছে। পাঠকের প্রত্যাশা বাড়ছে, দায়িত্ব বাড়ছে, চ্যালেঞ্জও বাড়ছে।
আমরা জানি, সামনে আরও কঠিন সময় আসবে। অর্থনৈতিক সংকট আসবে, নানা চাপ আসবে, ভুল হওয়ার সম্ভাবনাও থাকবে। কিন্তু একটি জায়গায় আমরা আপস করতে চাই না—সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতায়। কারণ পত্রিকার কাগজের বয়স যতই হোক, একটি সংবাদপত্রের প্রকৃত বয়স নির্ধারিত হয় তার বিশ্বাসযোগ্যতায়।
এই এক বছরের পথচলায় যেসব সম্মানিত ব্যক্তি আন্তরিকভাবে সাহায্য, সহযোগিতা, পরামর্শ ও উৎসাহ দিয়েছেন, তাঁদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র কৃতজ্ঞতা। তাঁদের সহযোগিতা ও শুভকামনা কুমিল্লার জমিনকে আরও শক্তভাবে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
আগামীতেও আপনাদের পাশে চাই।
প্রিয় পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা ও শুভানুধ্যায়ীরা—আপনাদের ভালোবাসা, সহযোগিতা ও আস্থা থাকলে কুমিল্লার জমিন পথ হারাবে না। আপনারাই আমাদের শক্তি, আপনারাই আমাদের সাহস।
আমরা জানি, পথ দীর্ঘ। পথ কখনো মসৃণ নয়। কিন্তু যে পথের সঙ্গে মানুষের ভালোবাসা থাকে, সে পথের ক্লান্তি কখনো পরাজয়ে পরিণত হয় না।
কুমিল্লার জমিনের এক বছরের অর্জন কোনো ব্যক্তির একার অর্জন নয়। এটি পাঠকের, এটি সংবাদকর্মীদের, এটি শুভানুধ্যায়ীদের, এটি সেইসব মানুষের—যারা সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো একটি সংবাদপত্র দেখতে চান।
আজ এক বছর পূর্তির দিনে তাই নতুন করে প্রতিজ্ঞা করছি—সত্যের কাছে আপস নয়, অন্যায়ের কাছে নত নয়। মানুষের কথা বলতে ভয় নয়, দায়িত্ব থেকে পিছু হটা নয়।
‘ন্যায়ের পথে সংগ্রাম অবিরত’—এই প্রত্যয়কে হৃদয়ে ধারণ করে কুমিল্লার জমিন এগিয়ে যাবে। কুমিল্লার মাটি থেকে যে কণ্ঠস্বরের জন্ম, তা ছড়িয়ে পড়ুক চট্টগ্রাম বিভাগের প্রতিটি জনপদে। হয়ে উঠুক মানুষের সুখ-দুঃখ, অধিকার ও প্রত্যাশার বিশ্বস্ত কণ্ঠস্বর।
শেষে শুধু এটুকুই বলতে চাই—কুমিল্লার জমিন আমার একার নয়। এটি আমাদের সবার। এই পত্রিকার প্রতিটি অক্ষরের সঙ্গে মিশে আছে পাঠকের ভালোবাসা, সংবাদকর্মীদের শ্রম, শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতা এবং একটি সুন্দর সমাজের স্বপ্ন।
হয়তো পথ চলতে গিয়ে অনেক কষ্ট এসেছে, এখনও আসছে। কিন্তু মানুষের ভালোবাসার কাছে সেই কষ্ট হার মেনে যায়। তাই যতদিন পাঠক পাশে থাকবেন, যতদিন সত্য বলার সাহস থাকবে, ততদিন কুমিল্লার জমিনও থাকবে—মানুষের পাশে, ন্যায়ের পাশে।
কুমিল্লার জমিনের পথচলা এক বছরের নয়—এ পথচলা দীর্ঘ হোক, আরও সাহসী হোক, আরও মানুষের হোক।
ন্যায়ের পথে সংগ্রাম অবিরত।
লেখক :সম্পাদক, দৈনিক কুমিল্লার জমিন