এক সময় চীনের দুঃখ ছিল হোয়াংহো নদী। আর কুমিল্লাবাসীর দুঃখ ছিল গোমতী নদী। চীনের হোয়াংহো নদী এখন চীনের দুঃখের বদলে আশীর্বাদে রূপ নিয়েছে। আর কুমিল্লাবাসীর দুঃখ গোমতী নদী নির্মূল না হলেও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যদিও কয়েক বছর পরপর এই গোমতী এখনো বড় দুঃখের কারণ হয়ে ওঠে। আর কুমিল্লা নগরবাসীর জন্য নতুন দুঃখ হিসেবে এখন সামনে এসেছে জলাবদ্ধতা।
কুমিল্লা পৌরসভা থেকে সিটি কর্পোরেশন হয়েছে। নাগরিকদের ব্যয় বাড়লেও বাড়েনি সুবিধা। যানজট, জলজটসহ নানা সমস্যা কুমিল্লাবাসীকে ক্রমান্বয়ে সামনে থেকে পেছনে নিয়ে যাচ্ছে। ক্ষমতার চেয়ার পরিবর্তন হলেও ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটে না নগরবাসীর। সামান্য বৃষ্টি হলেই ডুবে যায় গোটা কুমিল্লা নগর। নির্বাচন আসলেই প্রতিশ্রুতির ফুলঝুড়ি ছুটে—কুমিল্লাকে জলাবদ্ধতামুক্ত করবে বলে। এই জলাবদ্ধতার জন্য মিটিং, সিটিং ও ইটিং হয় প্রতিনিয়ত। ‘এটা করব, ওটা করব’—নানা বুলি শোনা যায় কর্তা ব্যক্তিদের মুখে। কিন্তু দিন শেষে যে লাউ সেই কদু।
জলাবদ্ধতার অন্যতম কারণ ড্রেনেজ সিস্টেম। প্রয়াত কামাল উদ্দিন চৌধুরী যখন কুমিল্লা পৌরসভার চেয়ারম্যান ছিলেন, তখন ৩২ লাখ টাকার ড্রেনেজ কেলেঙ্কারির কাহিনি এখনো সবার মুখে মুখে। সেই যে নগরীর ড্রেন সরু হতে শুরু হলো, তা আর প্রশস্ত হলো না। দিন দিন জলাবদ্ধতা মাত্রাতিরিক্ত আকার ধারণ করছে, কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের মিটিং, সিটিং ও ইটিং কোনোভাবেই শেষ হচ্ছে না। আকাশ থেকে বৃষ্টি নামার আগেই নগরীর রাস্তাঘাট, অলিগলি এবং নিচতলার বাসাবাড়ি পানির নিচে তলিয়ে যায়। আর নাগরিক জীবন থমকে দাঁড়ায়। প্রশ্নটা তখন ঘুরেফিরে আসে: এই সমস্যার জন্য আসলে দায়ী কে? শুধু কি নগর কর্তৃপক্ষ, নাকি নাগরিকরাও সমানভাবে এর জন্য দায়ী?
আজকের এই লেখায় নগর কর্তৃপক্ষকে দায়ী করার আগে আমরা যারা এই নগরের নাগরিক, আমরাও যে এই জলাবদ্ধতার জন্য কম দায়ী নই—সেটা আগে আলোকপাত করতে চাই। শুধু কুসিক কর্তৃপক্ষের আশায় বসে থাকলে যে কিছুই হবে না, তা আমরা সম্যক অবগত।
বাস্তবতা হলো, নাগরিকদের আচরণও এই সমস্যাকে প্রকট করে তুলছে। অনেকেই ডাস্টবিন ব্যবহার না করে প্লাস্টিক, পলিথিন ও নানা বর্জ্য সরাসরি ড্রেনে ফেলে দেন। এতে ড্রেন বন্ধ হয়ে যায়, পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। এমনকি বাজার ও আবাসিক এলাকাগুলোতেও একই চিত্র দেখা যায়। অর্থাৎ, আমরা নিজেরাই অনেক সময় নিজের দুর্ভোগের কারণ তৈরি করছি।
আবার সিটি কর্পোরেশনের নির্ধারিত ডাস্টবিন থাকা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে কেউ কেউ সেখানে ময়লা না ফেলে সহজ পথ হিসেবে ড্রেনকেই বেছে নেই। ফলে যা হওয়ার তাই হয়। ড্রেন ভরে যায় ময়লা-আবর্জনায়। সুতরাং কুমিল্লাকে জলাবদ্ধতার অভিশাপ থেকে মুক্ত পেতে হলে নাগরিকদের সচেতন হতে হবে। নাগরিক সচেতনতার এ ক্ষেত্রে কোনো বিকল্প নেই।
এবার আসা যাক নগর ব্যবস্থাপনার প্রসঙ্গে। একটি শহরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা যদি সঠিকভাবে পরিকল্পিত ও রক্ষণাবেক্ষিত না হয়, তাহলে জলাবদ্ধতা অনিবার্য। কুমিল্লা নগরীর অনেক এলাকায় ড্রেনগুলো সংকীর্ণ, অপরিকল্পিত কিংবা দীর্ঘদিন পরিষ্কার করা হয়নি। নতুন সড়ক নির্মাণ হলেও অনেক সময় পানি নিষ্কাশনের বিষয়টি যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয় না। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ দিক থেকে নগর কর্তৃপক্ষের দায় অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নগর পরিকল্পনার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতা। জলাধার, খাল ও প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ দখল হয়ে যাওয়াও জলাবদ্ধতার বড় কারণ। এসব জায়গা ভরাট করে নির্মাণকাজ চালানো হয়েছে বছরের পর বছর, কিন্তু তার প্রভাব এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এখানে দায় পড়ে প্রশাসন, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং নাগরিক সচেতনতার অভাব—সব কিছুর ওপর।
নগরীর পানি দ্রুত বাইরে নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য গুগাংজুরি খাল ও ডাকাতিয়া নদীতে নগরীর পানি যাওয়ার পথগুলো পরিষ্কার করতে হবে। কাজটা অবশ্যই কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। দরকার দায়িত্বশীল নেতৃত্ব এবং নাগরিকদের প্রতি সেই নেতার দায়বদ্ধতা।
সমাধান তাহলে কী? প্রথমত, একটি সমন্বিত নগর পরিকল্পনা জরুরি, যেখানে ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, খাল পুনরুদ্ধার এবং জলাধার সংরক্ষণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কঠোর আইন প্রয়োগের মাধ্যমে ড্রেনে বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের সচেতনতা বাড়ানোও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অবশ্য আশার কথা হলো, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউছুফ মোল্লা টিপু জানিয়েছেন, “১৭ বছরের সমস্যা আমি সামান্য কয়েক দিনে সমাধান করতে পারব না। তবে কুমিল্লা নগরীকে জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করতে যা যা করা দরকার, আমি সব করব ইনশাআল্লাহ। গুগাংজুরি পুরো খালটিকেই আমরা সংস্কার করব।” এবং দ্রুতই কুমিল্লাবাসী এর সুফল পাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সবশেষে বলা যায়, কুমিল্লার জলাবদ্ধতা কোনো এক পক্ষের ব্যর্থতা নয়; এটি একটি যৌথ সংকট। নগর ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা যেমন আছে, তেমনি নাগরিক দায়িত্বহীনতাও কম নয়। তাই সমাধানও হতে হবে সম্মিলিত—প্রশাসন ও জনগণ একসঙ্গে কাজ করলেই কেবল এই পুরোনো সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব।
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট, টকশো উপস্থাপক ও সংগঠক
০১৭১১-৩৮৮৩০৮,sahajadaamran@yahoo.com.