চিওড়া কাজী বাড়ি: ঐতিহ্য, ঐক্য আর গ্রামবাংলার অনন্য ঈদ উৎসব

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২ মাস আগে

ইতিহাস, ঐতিহ্য ও আধুনিকতার চমৎকার মিশেলে অনন্য এক নাম কুমিল্লার চিওড়া কাজী বাড়ি। সমগ্র পাকিস্তানের বিখ্যাত ২২টি শিল্পপতি পরিবারের একটি ছিল এই চিওড়া কাজী বাড়ি। কয়েকশ বছরের ঐতিহ্য বহনকারী এই পরিবারে জন্ম নিয়েছেন বহু কৃতী ব্যক্তিত্ব কাজী (প্রধান বিচারক), নবাব, ব্রিটিশ আমলের মন্ত্রী, খান বাহাদুর, শিল্পপতি, রাজনৈতিক নেতা, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, মহিলা মন্ত্রী, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ঘোষক, ভাষা সৈনিক, প্রখ্যাত সাংবাদিক এবং প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফর আহমদসহ আরও অনেকে। তাই এই বাড়িকে ‘নক্ষত্রের বাগান’ বললেও অত্যুক্তি হয় না।
গত কয়েক দশক ধরে ঈদুল ফিতর ও পরবর্তী দিনগুলোতে ভিন্নধর্মী, বর্ণাঢ্য ও বৃহৎ আয়োজনের মাধ্যমে মুখর হয়ে ওঠে শতাধিক পরিবারের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা এই জনপদ। একে শুধু ‘বাড়ি’ না বলে ‘গ্রাম’ বলাই শ্রেয়।
চাঁদরাত থেকে টানা তিন দিন ধরে গ্রামের গাছপালা, পুকুর ও রাস্তাঘাটজুড়ে চলে দৃষ্টিনন্দন আলোকসজ্জা। ঈদের দিন শতবর্ষী ঐতিহ্যবাহী মসজিদ প্রাঙ্গণের দুই পাশে সারি করে সাজানো থাকে মিষ্টি, কেক, চকলেট, পানীয় ও টিস্যু। ঈদের নামাজ শেষে মুসল্লিরা কোলাকুলি করে পরস্পরের মুখে মিষ্টি তুলে দেন এবং নিজেরাও মিষ্টিমুখ করেন যা এক অনন্য দৃশ্য। পর্যাপ্ত আয়োজন থাকায় এখানে কোনো হুড়োহুড়ি বা ধাক্কাধাক্কি দেখা যায় না, যা সত্যিই ব্যতিক্রম। পরিশেষে মসজিদ থেকেই পরম আনন্দ অনুভূতি নিয়ে সবাই ঘরে ফিরে।
ঈদ উপলক্ষে প্রতি বছর বাড়ির কয়েকশ সদস্য একই রঙের পাঞ্জাবি পরিধান করে। এবারের রং ছিল হালকা গোলাপি দাদা-নাতি, বাবা-ছেলে, চাচা-ভাতিজা সবাই যেন একই রঙে একাকার।
ঈদের দ্বিতীয় দিনে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বসবাসরত সদস্যরা বাড়িতে সমবেত হন। সকাল থেকে শুরু হয় বয়সভিত্তিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, যা গভীর রাত পর্যন্ত চলে। প্রায় হাজার খানেক নারী-পুরুষের এই মিলনমেলা শেষ হয় লক্ষাধিক টাকার র‌্যাফেল ড্র-এর পুরষ্কারের মাধ্যমে। উৎসবস্থলে পিঠা-পুলি, চটপটি, ফুচকা, জিলাপি, চা-কফিসহ নানা খাবারের সমারোহ থাকে যেন ‘যত খুশি খাও’ আয়োজন। অন্যদিকে স্বেচ্ছাসেবক দল শতাধিক ঘরে রাতের খাবার পৌঁছে দেয়, ফলে বাড়ির গৃহিনীদের রান্নাবান্নার চিন্তাই করতে হয় না, সবাই আনন্দে মেতে উঠে।
এ বিষয়ে বাড়ির সদস্য ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা কাজী ফখরুল আলম বলেন, “এই বিশাল আয়োজনের মাধ্যমে আমরা সবাইকে গ্রামমুখী করতে পেরেছি। নতুন প্রজন্মের গুলশান-বনানীর শিশুরাও ঈদের পরদিন গ্রামে আসতে উদগ্রীব থাকে, বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে পুরস্কার পায়। এতে তাদের মধ্যে নেতৃত্বের গুণাবলি গড়ে ওঠে।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, আমাদের মতো অন্যরাও তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী গ্রামমুখী ঈদ উদযাপনে এগিয়ে আসুক। হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে পারিবারিক বন্ধন আরও দৃঢ় হোক।”