কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নার্স সহকারীর ভুল চিকিৎসায় গর্ভের সন্তানসহ রাহেনা আক্তার টিনা (২৬) নামে এক প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। ঘটনাটি ঘটেছে পৌর এলাকার চান্দিশকরা গ্রামে। অভিযুক্ত নার্স সহকারী সুরাইয়া আক্তার উপজেলা সদরের আল নূর হাসপাতালের নার্স সহকারী বলে জানা গেছে। ঘটনার পর থেকে ওই নার্স সহকারী পলাতক রয়েছে। এর আগেও এই নার্স সহকারীর হাতে একাধিক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। গতকাল শনিবার সকালে নিহত গৃহবধূকে তার বাবার বাড়ির চান্দিশকরার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার চিওড়া ইউনিয়নের চরপাড়া গ্রামের সৌদি প্রবাসী সাদ্দাম হোসেনের স্ত্রী ও পৌর এলাকার চান্দিশকরা গ্রামের জয়নাল আবেদীনের মেয়ে রাহেনা আক্তার টিনা গর্ভধারনের পর থেকে তার বাবার বাড়িতে বসবাস করে আসছিলো। এরই মধ্যে গত শুক্রবার সকালে তার প্রসব বেদনা উঠলে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা সদরের আল নূর হাসপাতালের নার্স সহকারী সুরাইয়া আক্তারকে খবর দিয়ে বাড়িতে নেওয়া হয়। সেখানে নার্স সহকারী সুরাইয়া বেলা ১২ টা থেকে সন্ধা ৭টা পর্যন্ত নানান ভাবে জোর-জবরধস্তি করে নরমালি ডেলিভারী করার চেষ্টা করে। একই সাথে তার প্রসব ব্যাথা বাড়ানোর একাধিক ঔষধ ও ইনজেকশন পুশ করা হয়। অতিরিক্ত টানা হিছড়া ও ব্যাথায় রোগীর জরায়ু ফেটে গিয়ে প্রচুর রক্তক্ষরণ শুরু হয়। একপর্যায়ে তার অবস্থা গুরুতর বুঝতে পেরে নার্স সহকারী সুরাইয়া তাকে কুমিল্লা টাওয়ারে নেওয়ার পরামর্শ দেন। দ্রুত রাহেনা আক্তার টিনাকে কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার হাসপাতাল (কুমিল্লা টাওয়ার) এ নিয়ে গেলে গাইনী চিকিৎসক ডা. কুলসুমা আক্তারসহ অন্যান্য চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরিক্ষা করে দেখেন প্রসূতি রাহেনা আক্তার টিনার জরায়ু ফাটা এবং সেখান থেকে প্রচুর রক্তক্ষরণ হচ্ছে। এ সময়ে জরুরী ভিত্তিতে অপারেশন করে পূর্ব থেকে মাথা বের হয়ে থাকা মৃত বাচ্ছা ডেলিভারী করা হয় এবং সাথে সাথে আশংকাজনক অবস্থায় তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার অবস্থার আরো অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে ঢাকায় নেওয়ার পরামর্শ দেন। নিহত প্রসূতির বাবা জয়নাল আবেদীন তার মেয়েকে ঢাকা নেওয়ার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে আইসিইউ থেকে হাসপাতালের নিচে নামিয়ে আনলে তার মৃত্যু ঘটে। গতকাল শনিবার দুপুরে নিহত রাহেনা আক্তার টিনার বাবার বাড়ি চান্দিশকরায় গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে শুনসান নিরবতা বিরাজ করছে। সবাই শোকে স্তব্ধ রয়েছে। তাদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। নিহতের ৪ বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালের গাইনী চিকিৎসক কুলছুমা আক্তার বলেন, চৌদ্দগ্রাম থেকে রাহেনা আক্তার টিনা নামের রোগীকে শুক্রবার রাতে হাসপাতালে আনার পর দেখি অবস্থা খুবই খারাপ। জরায়ু ফেটে রক্তক্ষরণ হচ্ছে, প্রেসার কমে যাচ্ছিল। পরে রোগীর বাবা জয়নাল আবেদীনকে ডেকে জানতে পারলাম চৌদ্দগ্রাম আল নূর হসপিটালের সহকারী নার্স সুরাইয়া আক্তার নরমাল ডেলিভারির জন্য একাধিক ইনজেকশন ও ওষুধ প্রয়োগ করেছে বাড়িতে। অতিরিক্ত চেষ্টার কারণে টানা হিছড়ার ফলে রোগীর জরায়ু ফেটে অবস্থা খারাপ হয়েছে। তাৎক্ষনিক অপারেশন করে পূর্ব থেকে মাথা বের হয়ে থাকা মৃত বাচ্ছা বের করা হয় এবং সাথে সাথে তাকে আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে তার অবস্থা আরো খারাপ হতে থাকলে আমি মেয়ের বাবাকে জানিয়েছি কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার (টাওয়ার হাসপাতালে) তার চিকিৎসা সম্ভব না। পরে জানলাম ঢাকা নেওয়ার পথে মারা যায়। চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রশিদ আহমেদ চৌধুরী জানান, চৌদ্দগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নরমাল ডেলিভারীর উন্নত ব্যবস্থা রয়েছে এবং প্রতি মাসে গড়ে ১২০ থেকে ১৩০টি নরমাল ডেলিভারী করা হচ্ছে। তারপরও কেন রোগীর স্বজনরা অদক্ষ ও অনভিজ্ঞ নার্সের শরনাপন্ন হয়। আমরা বিভিন্ন মাধ্যমে নবজাতকসহ রাহেনা আক্তার টিনা নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর সংবাদ জানতে পেরে সেই নার্স সহকারী সুরাইয়ার যাবতীয় কাগজপত্রসহ তাকে তলব করেছি। এছাড়াও নিহতের পরিবার অভিযোগ করলে আমরা বিষয়টি অধিকতর খতিয়ে দেখবো। চৌদ্দগ্রাম আল নূর হাসপাতালের চেয়ারম্যান খোরশেদ আলম বলেন, সুরাইয়া আক্তার আমাদের নার্স সহকারী। যদি সে কোথাও নার্স পরিচয় দিয়ে কোন অন্যায় করে সেটার দায় একান্ত তার ব্যক্তিগত। হাসপাতালের ডিউটির বাহিরে গিয়ে সে কি করছে সে বিষয়ে আমরা অবগত না। তারপরও আমরা বিষয়টি শক্ত ভাবে খতিয়ে দেখে তার বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিবো। অভিযুক্ত নার্স সহকারী সুরাইয়া আক্তারের নিকট মোবাইল ফোনে বিস্তারিত জানতে চাইলে সে জানায়, নিহত রাহেনা আক্তার টিনার বাবা জয়নাল আবেদীন তাকে ফোন করে তাদের বাড়িতে নিয়ে যায়। তিনি নরমাল ডেলিভারী করানোর জন্য একাধিকবার চেষ্টা করেন এবং প্রসব ব্যাথা বাড়ানোর জন্য একাধিক ঔষধ ও ইনজেকশন পুশ করেন। একপর্যায়ে রোগীর অবস্থা খারাপ দেখে তিনি কুমিল্লা টাওয়ার হাসপাতালে নিয়ে যেতে বলেন। নরমাল ডেলিভারির অভিজ্ঞতা ও কি ট্রেনিং আছে এমন প্রশ্ন করলে সে জানায়, সে অসংখ্য নরমাল ডেলিভারী করার অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং তার নাকি ৬ মাসের সরকারি সিএসবিএ ট্রেনিংও রয়েছে। এদিকে একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কথিত এই নার্স সহকারী সুরাইয়া আক্তার চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতালে চাকরি করেছে। সব জায়গায় নিজেকে ডিপ্লোমা নার্স হিসেবে পরিচয় দিয়ে বেড়ায় এবং নরমাল ডেলিভারীতে নাকি তার বেশ দক্ষতাও রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে সে একজন নার্স সহকারী। তার নরমাল ডেলিভারী করার কোন অভিজ্ঞতাই নেই। তার হাতে একাধিক প্রসূতির মৃত্যু হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষেরা বুুঝে না বুঝে ও একশ্রেণীর দালালের মাধ্যমে নরমাল ডেলিভারীর জন্য তার শরনাপন্ন হয়। আর তাতেই গর্ভের সন্তানসহ অনেকের জীবন বিপন্ন হচ্ছে। গত কয়েকদিন আগেও চৌদ্দগ্রাম পৌর এলাকার বৈদ্যেরখিল গ্রামের হতদরিদ্র ইমাম হোসেনের স্ত্রী মারিয়া আক্তারের এই সুরাইয়ার হাতে মৃত্যু হয়।