কুমিল্লার লাকসামের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ডাকাতিয়া নদী বর্তমানে শিল্পকারখানার কেমিক্যাল বর্জ্য, পৌরসভার অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য এবং বিভিন্ন রাইসমিলের বর্জ্যে মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে। পানির দূর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশে-পাশের এলাকা। গোসল ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা যা”েছ না পানি। নদীটির ভয়াবহতার কারণে কৃষি, মৎস্য সম্পদ, জনস্বা¯’্য ও পরিবেশ সবক্ষেত্রেই দেখা দিয়েছে বিপর্যয়।
তথ্য সূত্রে জানা যায়, ডাকাতিয়া বাংলাদেশ-ভারতের একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য প্রায় ২০৭ কিলোমিটার এবং প্র¯’ প্রায় ৬৭ মিটার (২২০ ফুট)। এটি মেঘনার একটি উপনদী। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের পাহাড় থেকে উৎপন্ন হয়ে কুমিল্লা জেলার বাগসারা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে এবং পরবর্তীতে চাঁদপুর ও লক্ষীপুর জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। নদীটি কুমিল্লার লাকসাম, মনোহরগঞ্জ ও নাঙ্গলকোট, চাঁদপুরের শাহরাস্তি ও হাজীগঞ্জ উপজেলা অতিক্রম করে চাঁদপুর মেঘনা নদীতে মিলিত হয়েছে। নদীটির ধরণ প্রকৃতি সর্পিলাকার।
ডাকাতিয়া নদীর নামকরণ নিয়ে বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। এ নদী দিয়ে একসময় মগ-ফিরিঙ্গি জলদস্যুরা নোয়াখালী ও কুমিল্লা জেলায় প্রবেশ করত এবং নদীতে ডাকাতি করত। ডাকাতের উৎপাতের কারণে নদীটির নাম ডাকাতিয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। আবার কারো কারো মতে, ডাকাতিয়া নদীর করাল গ্রাসে দুই পাড়ের মানুষ সর্বস্ব হারাত। জীবন বাঁচাতে ডাকাতিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে বহু মানুষের সলিলসমাধি রচিত হয়েছে। ডাকাতের মতো সর্বগ্রাসী বলে এর নামকরণ হয়েছে ডাকাতিয়া নদী।
ডাকাতিয়া নদীর পানি দিয়ে লক্ষ লক্ষ একর জমিতে ইরি ধানসহ বিভিন্ন ফসলের চাষাবাদ হতো। হাজার হাজার কৃষক এই নদীর পানির ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। কিš‘ বর্তমানে নদীর পানি এতটাই দূষিত যে কৃষকরা সেচকাজে তা ব্যবহার করতে পারছেন না। কেমিক্যালযুক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ইরি ধানসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হ”েছ এবং উৎপাদন কমে যা”েছ।
ডাকাতিয়া নদী একসময় ছিল নৌ-যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। চাঁদপুর থেকে লাকসামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে নৌকা, ট্রলার এমনকি ছোট লঞ্চ চলাচল করত। নদীপথে কৃষিপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় মালামাল পরিবহন সহজ ছিল। কিš‘ নদীর নাব্যতা হ্রাস ও দূষণের কারণে সেই ঐতিহ্য আজ বিলীনের পথে।
একসময় ডাকাতিয়া নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় মিঠাপানির মাছ প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যেত। নদীর মাছে আশপাশের খাল-বিল ভরে থাকত এবং হাজার হাজার জেলে পরিবার জীবিকা নির্বাহ করত। বর্তমানে দূষণের কারণে অধিকাংশ দেশীয় মাছ বিলুপ্ত হয়ে যা”েছ। অভিযোগ রয়েছে, সুযোগ পেলে দখলদাররা ডাকাতিয়ার পাড় দখল ও মাটি কেটে নেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এছাড়া, বিভিন্ন ¯’ানে কল-কারখানার দূষিত বর্জ্য ও আবর্জনা ফেলে বিষাক্ত করে তোলা হয়। নদী তীরের আশে-পাশের বাসাবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে নদীর পানি দূষিত হয়ে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পেয়ে নানা রোগ ব্যাধি ছড়ায়। দীর্ঘ কয়েকবছর খনন না করায় কোথায়ও কোথায়ও মরাখালো পরিণত হয়। তখন নদীটির সুফল বঞ্চিত হয় নদী এলাকার কৃষক, ব্যবসায়ী সহ ভ্রমণ পিপাসুরা।
লাকসাম, মনোহরগঞ্জ, নাঙ্গলকোটের বিভিন্ন ¯’ানে অপার সম্ভাবনার ডাকাতিয়া নদীকে দখলমুক্ত করে খনন করে বছর জুড়েই দর্শনীয় করতে ¯’াণীয়রা দাবি জানিয়ে আসলেও এ বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। ২০১৯ সালের ২ মার্চ পানি উন্নয়ন বোর্ড, এলজিইডি নির্বাহী প্রকৌশলীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ডাকাতিয়া নদীর দুই তীর পরিদর্শনে এসে খনন ও উ”েছদ অভিযান শুরুর ঘোষণা দিলেও তা আলোর মুখ দেখেনি।
সাম্প্রতিক ডাকাতিয়া নদীর পানি ভয়াবহভাবে দূষিত হয়েছে। নদীটির পানিতে দুর্ঘন্ধ ছড়িয়েছে। নদীর এলাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, পর্যাপ্তভাবে বর্জ্য শোধনাগার ব্যবহার না করে কেমিক্যালযুক্ত দূষিত পানি নদীতে ফেলা হ”েছ। এছাড়া বিভিন্ন রাইসমিলের কালো বর্জ্য এবং পৌরসভার ড্রেনেজের অপরিশোধিত বর্জ্যও সরাসরি ডাকাতিয়া নদীতে গিয়ে মিশে পানি দূষিত হ”েছ।
লাকসাম প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি, প্রবীণ সাংবাদিক আবদুল কুদ্দুস জানান, ডাকাতিয়া নদী আমাদের ঐতিহ্য। সাম্প্রতিক নদীর পানি এমন দূষিত যে, চারদিকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। দূষণরোধে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যব¯’া নেওয়া হোক।
লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌরসভার প্রশাসক নার্গিস সুলতানা (ইউএনও) জানান, ডাকাতিয়া নদীর পানি দূষণের বিষয়টি আমরা অবগত আছি। দূষণরোধে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরের মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।