চব্বিশের জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে কুমিল্লার দেবিদ্বারে ৯ জনের নাম স্থান পেয়েছে শহীদদের তালিকায়। একই সঙ্গে ৬৬ জন আহত জুলাইযোদ্ধাও স্থান পেয়েছেন জুলাই গেজেটে। তবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রক্ত ঝরিয়েও চূড়ান্ত গেজেট তালিকায় ঠাঁই হয়নি চার আহত আন্দোলনকারীর। সরকারি খাতায় নাম না ওঠায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন তারা। পাশাপাশি আর্থিক সংকটে চিকিৎসা নিতে পারছেন না বলে জানান তারা। ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের অভিযোগ, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহের অভাব এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই তারা এখনও গেজেট থেকে বঞ্চিত।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট দেবিদ্বারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনকালে তৎকালীন শাসকদল ও তাদের অঙ্গসংগঠনের সশস্ত্র হামলায় রণক্ষেত্রে পরিণত হয় দেবিদ্বার উপজেলা সদর এলাকা। সেদিন আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রের হামলায় একজন নিহত এবং বেশ কজন আহত হন। ৫ আগস্ট সরকার পতনের দিন থানা ঘেরাও করতে গিয়েও অনেকে গুলিতে আহত হন।
৪ আগস্ট আহত হন দেবিদ্বার উপজেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব নাজমুল হাসান সরকার। আন্দোলনের দিন তাঁর মাথা ও বুকসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে মারাত্মকভাবে স্প্লিন্টার বিদ্ধ হয়। দীর্ঘ চিকিৎসাতেও শরীর থেকে সমস্ত স্প্লিন্টার বের করা সম্ভব হয়নি। শরীরে মারাত্মক যন্ত্রণা বয়ে বেড়ালেও তাঁর স্থান হয়নি সরকারের চূড়ান্ত আহত তালিকায়। একই দিন পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের রোষানলে পড়েন স্থানীয় সাংবাদিক মেহেদী হাসান রিয়াদ। ধাতব গ্যাস পাইপ দিয়ে পিটিয়ে তাঁর বাঁ কানের পর্দা ফাটিয়ে দেওয়া হয় এবং বাঁ পায়ের জয়েন্ট গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। গেজেটে জায়গা হয়নি এই সংবাদকর্মীরও। গেজেটবঞ্চিতদের তালিকায় আরও রয়েছেন দুই অদম্য শিক্ষার্থী। আন্দোলনের দিন ১৬ বছর বয়সী কাজী ইয়াছিনের বাঁ হাতের বাহু ভেদ করে গুলি বেরিয়ে যায়। অন্যদিকে ৫ আগস্ট আহত হন ১৮ বছর বয়সী মো. সোহাগ। তার ডান হাত গুলির স্প্লিন্টারে ঝাঁঝরা হয়ে যায়। পঙ্গুত্ব আর তীব্র যন্ত্রণা নিয়ে বর্তমানে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন সোহাগ।
ভুক্তভোগীদের পরিবারের আকুতি—অভাবের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা থামতে বসেছে। রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ও সহায়তাটুকু পেলে অন্তত চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের পথ সুগম হতো। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক সিয়াম আহমেদ বলেন, “রাজপথে যাঁরা রক্ত দিয়েছেন, তাঁদের আত্মত্যাগের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি কোনো সুযোগ-সুবিধার বিষয় নয়, এটি তাঁদের প্রাপ্য অধিকার। অবিলম্বে নাজমুল, রিয়াদ, ইয়াছিন ও সোহাগের নাম গেজেটভুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের কার্যকর হস্তক্ষেপ জোর দাবি জানাচ্ছি।” যোগাযোগ করা হলে দেবিদ্বার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অশোক বিক্রম চাকমা জানান, আহত হয়েও যাঁরা জুলাই গেজেটে বাদ পড়েছেন, তাঁদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হবে। যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে বাদ পড়া প্রত্যেকের নাম তালিকাভুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।