শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ গভীর রাতের জিজ্ঞাসাবাদ ও বিবেকের জয়ধ্বনি :

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-১০
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৪ ঘন্টা আগে

রাত তখন অনেকটাই গভীর। নীলফামারীর ডিবি কার্যালয়ের নিস্তব্ধতা ভেঙে আবারও পায়ের শব্দ। দুইজন এসআই দুটি ল্যাপটপ হাতে নিয়ে এসে আমার সামনে দাঁড়ালেন। তাদের চোখেমুখে ক্লান্তি স্পষ্ট, তবু তার চেয়েও স্পষ্ট এক ধরনের বিরক্তি যেন অকারণ টানাপোড়েনে আটকে পড়েছেন তারাও। পুলিশ সুপারের অতি উৎসাহ ও অযৌক্তিক চাপ তাদের মনেও যে স্বস্তি আনেনি, তা তাদের আচরণেই বোঝা যাচ্ছিল।
ভদ্র স্বরেই একজন বললেন, ভাই, চেয়ারটার সামনে একটু বসবেন।
আমি বসলাম। আবারও সেই একই প্রশ্নমালা
আমি কি আওয়ামী লীগের কোনো পদে আছি?
নাঈমুল ইসলাম খানের ব্যক্তিগত পিএস কি না?
এমপি বাহার ও মেয়র সূচনার কথিত পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় আমার কোনো ভূমিকা আছে কি না?
প্রশ্নগুলো নতুন কিছু নয়, উত্তরও নয়। তবু তারা ল্যাপটপ খুলে আবারও আমার ফেসবুক টাইমলাইন, ভিডিও, লাইভ সবকিছু ঘাঁটতে শুরু করলেন। সময় গড়াতে গড়াতে রাত তখন পৌনে দুইটা কিংবা সোয়া দুইটার কাছাকাছি।
হঠাৎ করেই একজন এসআই উচ্চস্বরে চিৎকার করে উঠলেন
এমরান ভাই! এটাতো আপনি, তাই না?
আমি মনিটরের দিকে তাকিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম, আপনার সন্দেহ হচ্ছে নাকি? আমিই।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পুরোনো লাইভ ভিডিও, লালমাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিন, বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র থেকে করা আমার সরাসরি সম্প্রচার। সেই লাইভে আমি বলছিলাম-
“প্রিয় দর্শক, আজ লালমাই উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মাননীয় অর্থমন্ত্রী ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি লোটাস কামাল সাহেবের নিজ এলাকার কেন্দ্র,বাগমারা উচ্চ বিদ্যালয়। কিন্তু এখানে ভোটার নেই, আছে শুধু দুটি কুকুর। যেখানে প্রার্থী স্বয়ং অর্থমন্ত্রীর ভাতিজা, জেলা যুবলীগের আহ্বায়ক শাহিন। ভোটারশূন্য এই কেন্দ্রই প্রমাণ করে,একতরফা, সাজানো নির্বাচনকে জনগণ কীভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।”

ভিডিওর শব্দ থামতেই দৃশ্যপট বদলে গেল। ডিবির দুই সদস্য একে অপরের দিকে তাকালেন, তারপর হঠাৎ করেই আমাকে জড়িয়ে ধরলেন। আবেগ চাপা রাখতে পারলেন না।
একজন বললেন, ভাই, ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে অর্থমন্ত্রীর ভাতিজার বিরুদ্ধে তারই ভোটকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে লাইভে এমন কথা বলার সাহস যিনি দেখিয়েছেন, আজ তাকে ফ্যাসিস্ট বানানোর জন্য আমরা রাত জেগে বসে আছি,এটা ভাবতেই লজ্জা লাগছে।
মুহূর্তের মধ্যেই তারা ল্যাপটপ বন্ধ করে ফেললেন।ভাই, সরি। আপনি ঘুমান। কাল সকালে এসপি স্যার অফিসে এলে এই ভিডিও দেখলেই সব ভুল ভেঙে যাবে। স্যার আপনাকে সম্মানের সাথেই ছেড়ে দেবেন। সুযোগ পেয়ে আমি বললাম, দিনের ভোট রাতে হওয়ার বিষয়েও আমার একাধিক লেখা আছে, চাইলে সেগুলোও দেখুন।
তারা আগ্রহভরে দেখলেন। বিস্মিত কণ্ঠে একজন বললেন,ভাই, গত সতেরো বছর চাকরি করছি দেশের নানা জেলায়। কিন্তু আওয়ামী লীগের শাসনামলে কোনো স্থানীয় পত্রিকায় এভাবে সত্য লেখা হবে,এটা আমাদের কল্পনার বাইরে ছিল। আজ আপনাকে দেখে সত্যিই ভালো লাগছে। চলে যাওয়ার আগে তারা বললেন,
কুমিল্লা থেকে যারা এসপি স্যারের কাছে গিয়ে আপনার বিরুদ্ধে এত ঢাহা মিথ্যা, ভিত্তিহীন অভিযোগ করেছে, আল্লাহ তাদের এমন বিচার করবেন, যা তারা কল্পনাও করতে পারবে না। হয়তো আমরা জানব না, কিন্তু বিচার হবেই। এই কথা বলে একজন স্নেহভরে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।
অনেক রাত হয়েছে ভাই। এবার ঘুমান। সকালে অন্য স্যাররাও আসবেন। আমরা সবাই মিলে এসপি স্যারকে বলব, আপনি ষড়যন্ত্রের শিকার। আপনার ভোটকেন্দ্রের ভিডিওই যথেষ্ট। তারা চলে গেলেন। ঘড়ির কাঁটা তখন পৌনে তিনটার ঘরে। ডিবির ফ্লোরে গা এলিয়ে দিলাম। শরীর ক্লান্ত, কিন্তু চোখে ঘুম নেই।
মনের ভেতর একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে,
আমি কবে, কখন, কীভাবে এমন শত্রু তৈরি করলাম, যারা আমাকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায়?
আমি কি এতটাই খারাপ?
গত তিন দশকের সাংবাদিকতা জীবনে কারও অমঙ্গল করেছি কি?
নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করতে করতে, আত্মসমালোচনার অতল গহ্বরে ডুবে যেতে যেতে কখন যে চোখ লেগে এসেছে, টেরই পাইনি।
১৯। ভোরের ডাক : অজানা যাত্রার পূর্বক্ষণ
রাতের গভীর অন্ধকার পেরিয়ে যখন ভোরের আলো ফোটার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক তখনই আমার চোখে সামান্য ঘুম এসে ভর করেছিল। শরীর ক্লান্ত, মন অবসন্ন তবু চেতনার কোথাও অদ্ভুত এক জাগরণ ছিল। এমন সময় হঠাৎ ডিবির মুন্সী এসে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,ভাই, উঠেন। দ্রুত রেডি হন। ঢাকায় যেতে হবে।
কথাগুলো যেন বজ্রপাতের মতো এসে পড়ল মাথার ওপর। কেন যেতে হবে, কী কারণে – এই একটি প্রশ্নেরও কোনো উত্তর মিলল না। শুধু বলা হলো, রেডি হন। প্রশ্ন করার সুযোগ নেই, ব্যাখ্যার অবকাশ নেই। পুলিশি আদেশ মানেই নিরুত্তর নীরবতা।
ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর চারটার দিকে। ঠিক সেই মুহূর্তেই মসজিদ থেকে ভেসে আসতে শুরু করল ফজরের আজান। আজানের ধ্বনি যেন আমার বুকের ভেতর জমে থাকা সমস্ত ভার এক নিমিষে আলগা করে দিল। মনে হলো,এই ডাকে হয়তো আল্লাহ নিজেই আমাকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন, মানুষ যতই ষড়যন্ত্র করুক, শেষ সিদ্ধান্ত তাঁরই।
আমি অজু করে ফজরের নামাজে দাঁড়ালাম। ডিবির সেই বড় ঘর, ঠান্ডা ফ্লোর, কম্বলের ভাঁজ সবকিছুকে ছাপিয়ে তখন আমার মন কেবল সিজদার মধ্যে ডুবে গেল। নামাজ শেষে হাত তুলে মহান রবের দরবারে নিঃশব্দে বললাম “হে মহান প্রভু,
আপনার কাছে আমার নতুন করে চাওয়ার কিছু নেই।
যদি এই জীবনে আমার দ্বারা অজান্তে আপনার কোনো বান্দার হক নষ্ট হয়ে থাকে,
যদি আমার কলম, আমার কথা, আমার উপস্থিতি কারো জন্য কষ্টের কারণ হয়ে থাকে
তবে আমি নিজেকে নির্দোষ দাবি করছি না।
আমার গুনাহ অনুযায়ী শাস্তি আপনি দিন, আমি তা মাথা পেতে নেব।”
কণ্ঠ তখন ভারী হয়ে আসছিল। চোখের কোণে জমে উঠছিল অশ্রু।
আবার বললাম,
“ হে আল্লাহ,
যদি আমি অপরাধী না হই,
যদি আমি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে থাকি,
তবে আমাকে এমন সম্মান দান করুন,
যাতে মানুষ বুঝতে পারে
মিথ্যা আর অন্যায়ের সামনে সত্যকে আপনি কখনো একা ছেড়ে দেন না।”

সবশেষে বুকের গভীর থেকে উঠে এল একটিই প্রার্থনা
“আমাকে এবং আমার সহকর্মী তরুণকে
আমার প্রিয় শহর কুমিল্লায়
মাথা উঁচু করে, সম্মানের সাথে ফিরে যাওয়ার তৌফিক দিন।”
দোয়া শেষ করে যখন হাত নামালাম, তখন মনে হলো, ভিতরের ভয় অনেকটাই হালকা হয়ে গেছে। হয়তো সামনে আরও কঠিন সময় অপেক্ষা করছে, হয়তো আবার জিজ্ঞাসাবাদ, অপমান কিংবা নতুন কোনো নাটক। তবু বিশ্বাস জন্মাল যিনি রাতের অন্ধকার ভেদ করে ফজরের আলো পাঠান, তিনি নিশ্চয়ই সত্যের পথও আলোকিত করবেন।
ভোরের সেই মুহূর্তে, পুলিশের হেফাজতে দাঁড়িয়ে, আমি প্রথমবারের মতো গভীরভাবে অনুভব করলাম,
মানুষের হাতে ক্ষমতা থাকতে পারে, কিন্তু ফয়সালা একমাত্র আল্লাহর হাতে।