শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ ঢাকার পথে : অজানা গন্তব্যের দিকে নীরব যাত্রা

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-১১
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ১২ ঘন্টা আগে

নীলফামারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দোতলার সিঁড়ি বেয়ে আমাদের নামানো হলো। ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ফুটে ওঠেনি। চারপাশে কুয়াশা আর নিস্তব্ধতার এক অদ্ভুত আবরণ। নিচে নেমেই চোখে পড়ল একটি সাদা রঙের মাইক্রোবাস ইঞ্জিন চালু করে অপেক্ষা করছে। গাড়ির চারপাশে আগেই অবস্থান নিয়েছে কয়েকজন পুলিশ সদস্য। পরিবেশ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো গোপন অভিযানের প্রস্তুতি চলছে।
মাইক্রোবাসের সামনে একজন কনস্টেবল, পেছনে আরেকজন। মাঝখানে আমি আর তরুণ। আমাদের নির্দেশ দেওয়া হলো “দুই হাত পেছনে নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করেন। ছবি তোলা হবে।”
আমি কিছুটা অবাক হয়ে তাকালাম। কেন ছবি? প্রশ্ন করার আগেই একজন নিচু স্বরে বলল,
“স্যারকে দেখানোর জন্য। যেন মনে হয় আপনাদের দড়ি দিয়ে বেঁধে ঢাকায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু চিন্তা করবেন না, আপনাদের আমরা হ্যান্ডকাফ বা বেঁধে নিচ্ছি না। আমাদের কাছে আপনারা পুরোপুরি নির্দোষ বলেই মনে হচ্ছে।”
এই কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অনুভূতি খেলা করল। একদিকে অপমান, অন্যদিকে মানবিকতার ক্ষীণ আলো। ছবি তোলা শেষ হলে ডিবির মুন্সী আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
“এমরান ভাই, গাড়ির ভাড়া আমরা দেব। ঢাকা যাওয়া-আসা আর খাওয়া-দাওয়াটা আপনাকে দেখতে হবে।”
আমি শুধু মাথা নেড়ে বললাম, “ইনশাআল্লাহ।”
আমাদের গাড়ির মাঝখানে বসানো হলো। সামনে-পেছনে পুলিশ সদস্য। অন্ধকারে প্রায় ফাঁকা রাস্তা পেয়ে মাইক্রোবাসটি যেন উড়তে লাগল ঢাকার উদ্দেশ্যে। ভোরের নীলচে অন্ধকার ভেদ করে গাড়ি ছুটে চলেছে, আর আমার ভেতরে চলছিল আরেক যাত্রা অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা আর আত্মসম্মানের যুদ্ধ।
বারবার জানতে চাইলাম, “আমাদের ঢাকায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কেন যাচ্ছেন?”
ডিবির দুই কর্মকর্তা ভদ্র ব্যবহার করলেও কোনো স্পষ্ট উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,
“বড় স্যার আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকায় গিয়ে তাকে জানালে তিনি ঠিক করে দেবেন আপনাদের কোথায় নেওয়া হবে।”
আমি বুঝতে পারছিলাম, এই কথার মধ্যে সত্যের চেয়ে অস্পষ্টতাই বেশি। এটা যে অনেকটাই সাজানো উত্তর, তা উপলব্ধি করেও আমি চুপ করে রইলাম। কারণ, এই মুহূর্তে আমার আর তরুণের হাতে প্রতিবাদ করার কোনো বাস্তব সুযোগ ছিল না।
মাইক্রোবাস ছুটছে, চারপাশে ঘন অন্ধকার, মাঝেমধ্যে ভোরের আলো চোখে পড়ছে। আর আমি ভাবছিলাম,একজন সাংবাদিক হিসেবে তিন দশকের পথচলায় কী এমন অপরাধ করলাম, যার পরিণতিতে আজ আমাকে এভাবে “নিরাপদ হেফাজত” নামের অনিশ্চিত গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে?
এই যাত্রা শুধু ঢাকার দিকে নয়, এ ছিল সম্মান ও অপমানের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষের আত্মসংঘাতের যাত্রা।
একটি মাইক্রোবাসের ভেতরে বসে আমি তখন বুঝতে পারছিলাম, এই গল্প এখানেই শেষ নয়, বরং এখান থেকেই শুরু হচ্ছে আমার জীবনের সবচেয়ে কঠিন অধ্যায়।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অন্ধকারে পরিবার : উৎকণ্ঠার দীর্ঘতম রাত
২৭ মে, শুক্রবার বিকেল চারটা। নীলফামারীর এক আবাসিক হোটেল থেকে আমাদের আটক করার সঙ্গে সঙ্গেই ডিবি পুলিশ আমার ও সহকর্মী তরুণের মোবাইল ফোন নিজেদের হেফাজতে নেয়। সেখান থেকেই শুরু হয় আরেকটি নীরব, অথচ ভয়ংকর অধ্যায় পরিবারের সঙ্গে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অধ্যায়।

২৮ মে শনিবার রাত প্রায় এগারোটা পর্যন্ত দীর্ঘ একত্রিশ ঘণ্টা একবারের জন্যও আমাদের হাতে মোবাইল ফোন তুলে দেওয়া হয়নি। শুধু তাই নয়, অসংখ্য অনুরোধের পরও পুলিশের নিজের ফোন থেকে কয়েক সেকেন্ডের জন্য একটি কল করার অনুমতিও মেলেনি।
আমি বারবার বলেছি আমার ছেলে আবির এইচএসসি পরীক্ষার্থী। রোববার তার ইংরেজি পরীক্ষা। পরীক্ষার সময়টাতে আমি একটু দেরি করলেও সে অস্থির হয়ে পড়ে। আর এখানে তো আমি পুরোপুরি নিখোঁজ। আমার জীবনসঙ্গী জাহেরা, আমার ছেলে আবির, আমার মেয়ে দিবা তারা নিশ্চয়ই তখন উৎকণ্ঠার আগুনে পুড়ছে। কারণ, আমি বাসা থেকে অফিসে গেলেও অন্তত দুই ঘণ্টা পরপর যোগাযোগ রাখি। আর এখানে একেবারে নিশ্চুপ, নিরুদ্দেশ।
আমি শুধু এতটুকুই চেয়েছিলাম, “আপনারা আমাকে কথা বলতে না দিলেও সমস্যা নেই। অন্তত আপনারাই আমার স্ত্রীকে বলে দিন, আমি ভালো আছি, আইনের হেফাজতে আছি। চিন্তার কিছু নেই।”
এই অনুরোধ শুধু আমার একার ছিল না। সহকর্মী তরুণও তার পরিবারের জন্য একই আকুতি জানিয়েছিল। কিন্তু উত্তর একটাই, “এখন না পরে একটু পর ”। এই ‘পরে’-র কোনো শেষ ছিল না।
রংপুর সদর পার হওয়ার পর হাইওয়ের এক হোটেলে নাস্তার জন্য গাড়ি থামানো হলো। মনে হলো, হয়তো এবার মানবিকতার একটু ছোঁয়া পাওয়া যাবে। আমি এক এসআইকে বললাম,
“ভাই, আমার ছেলের পরীক্ষা চলছে। আমার চিন্তায় হয়তো সে পরীক্ষা দিতেও পারবে না। শুধু একবার বলতে দিন, আমি ভালো আছি।”
তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে বললেন, “চলুন, আগে নাস্তা খাই।”
নাস্তা শেষ হলো। গাড়িতে উঠলাম। আবার বললাম। একবার নয় বারবার। বিনয়ের যত স্তর আছে, সব প্রয়োগ করলাম। কিন্তু ফল শূন্য।
একপর্যায়ে ভেতরের জমে থাকা ক্ষোভ আর অসহায়ত্ব গলায় উঠে এলো। কিছুটা শক্ত স্বরে বললাম,
“ভাই, একজন সন্দেহভাজন মানুষকে আপনারা সর্বোচ্চ কত ঘণ্টা তার পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে না দিয়ে রাখতে পারেন? এ বিষয়ে আইন কী বলে?” কেউ কোনো উত্তর দিল না।
নীরবতা শুধু আরও ভারী হলো। শেষবারের মতো বললাম, “আপনিই শুধু বলুন, আমরা ভালো আছি।” তবু কোনো সাড়া নেই।
শুধু সামনে ছুটে চলা গাড়ি, পেছনে পড়ে থাকা অজানা আতঙ্ক আর বুকের ভেতর পরিবারের জন্য এক অসহনীয় দহন।