শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ ঘুমন্ত গাড়ি, জাগ্রত স্মৃতি : অতীতের দীর্ঘ ছায়াপথে একাকী আমি

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-১২
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২১ ঘন্টা আগে

মাইক্রোবাসটি নিস্তব্ধ ভোর চিরে ঢাকার দিকে ছুটে চলেছে। জানালার বাইরে তখনো অন্ধকার রাস্তা, ভেতরে নিঃশব্দ ঘুম আর আমার ভেতরে ক্রমশ ঘনীভূত হয়ে ওঠা এক অদৃশ্য ঝড়। বুকের ভেতর উৎকণ্ঠা যেন ঢেউ তুলে আছড়ে পড়ছে বারবার। তবু আমি মনোবল হারাতে পারি না। জানি, আমি যদি এক মুহূর্তের জন্যও ভেঙে পড়ি, তরুণ পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। তাকে শক্ত রাখার দায় আমার কাঁধেই।
চোখ ঘুরিয়ে দেখলাম পুলিশের ছয়জন সদস্যই ঘুমিয়ে পড়েছে। সাধারণত নীলফামারী থেকে ঢাকায় কোনো আসামি নিলে চারজন পুলিশই যথেষ্ট হয়। কিন্তু আমাদের ‘অপরাধের’ গুরুত্ব বিবেচনায় নাকি সন্দেহের গভীরতায় দেওয়া হয়েছে ছয়জন। আমার পাশে বসা সহকর্মী তরুণও ঘুমিয়ে আছে। যেই ‘আমি’ সাইকেলের পেছনে বসেও অনায়াসে ঘুমিয়ে পড়তে পারে, সে ঘুম আজ তলিয়ে গেছে এসি মাইক্রোবাসে। আমার দুই চোখের পাতা শত চেষ্টা করেও এক করতে পারছি না। ক্ষণে ক্ষণে শরীর ভিজে উঠছে ঘামে। শুধু শরীর নয়, মনও। ভাবনার পর ভাবনা এসে ভিড় করছে।নানা রকম নানা কথা মনে আসছে। অতীত নিয়ে যেন মনের হালখাতা বসেছে হিসেব নেয়ার। হঠাৎ মনে হলো যদি আমাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানো হয়? তাহলে কী হবে? এক মুহূর্তেই ভবিষ্যতের এক ভয়ংকর ছবি চোখের সামনে ভেসে উঠল। আমার রুটির রুজির একমাত্র
প্রাণের প্রতিষ্ঠান ‘আমাদের কুমিল্লা’ পত্রিকাটি বন্ধ হয়ে যাবে। আমার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন সাংবাদিক ও স্টাফের পরিবার এক নিমিষেই বেকার হয়ে পড়বে। আমার পরিচালিত মফিজ উদ্দিন সরকার মডেল মাদ্রাসা ও এতিমখানা টাকার অভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি প্রায় ২০/২৫ জন এতিম শিশুর পড়াশোনা থেমে যাবে। একজন বাবুর্চীসহ ছয়জন আলেম বেকার হয়ে পড়বেন।
আমার জীবনসঙ্গী জাহেরার একার আয়ে কি সংসার চলবে? বাসা ভাড়া, সন্তানদের পড়াশোনা সবকিছু কীভাবে সামলাবে সে? আমার অনুপস্থিতিতে সে কী করবে? সংসার চালাবে, না চাকরি করবে, না আদালত-পুলিশের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়াবে?
জাহেরা অত্যন্ত কোমল হৃদয়ের মানুষ। তার শরীর, মন, অস্তিত্ব সবখানেই আমি জড়িয়ে আছি। আমার কোনো খারাপ খবর সে কীভাবে গ্রহণ করবে, কীভাবে নিজেকে সামলাবে এই ভাবনাই আমাকে ভেতর থেকে ভেঙে ফেলছিল।
হিসাব কষে দেখলাম চলমান কয়েকটি ডিপিএস বাদ দিলে ব্যাংকে এমন কোনো টাকা নেই, যা দিয়ে জাহেরা এক মাসও চলতে পারবে। কুমিল্লা শহরের টমছমব্রিজ এলাকায় যে বাসায় আমরা ভাড়া থাকি, প্রথম মাসেই সেই বাসা ছেড়ে দিতে হবে। তাহলে আমার স্ত্রী, আমার সন্তানরা কোথায় যাবে? কোথায় মাথা গুঁজবে আমার কলিজার টুকরো আবির আর দিবা ?
মধ্যম আশ্রাফপুরে আমার টিনশেড বাড়িটিতে কুমিল্লা ইপিজেডে কর্মরত কয়েকজন নারী শ্রমিক ভাড়া থাকে। সামান্য বৃষ্টি হলেই সে ঘর পানিতে তলিয়ে যায়। সেখানে কি থাকা সম্ভব? কোথায় যাবে আমার পরিবার ? অথচ হলুদ সাংবাদিকরা ফেসবুকে লিখেছে আমার নাকি কুমিল্লা শহরে কয়েকটি ফ্ল্যাট আছে। বারবার চোখের সামনে ভেসে উঠছে জীবন বন্ধু জাহেরা, আবির আর দিবার নিস্পাপ মুখগুলো।
আমার শান্ত স্নিগ্ধ দিবার কন্ঠস্বর কত শত রুনা লায়লার কন্ঠস্বর থেকেও যে আমার কাছে অধিক প্রিয় সেটা কে বুঝবে ? অফিস থেকে বাসায় গিয়ে কত শত দুষ্টামী করি আমার দিবার সঙ্গে।শুধু তার মিষ্টি মুখের নির্মল কথা গুলো শুনার জন্য। কখনো সখনো মা মনি দিবার রুমে গিয়ে দুষ্টামী করে তার বিছানার চাদর এলো মেলো করে দেই শুধু তার মিষ্টি মধুর বকা শুনার জন্য। তার কোমল হাত দিয়ে যখন আমাকে সোহাগী মার দেয় তখন বড়ই মধুর লাগে আমার। এ সময় জীবন বন্ধু হেসে বলবে,মেয়ের হাতে মার খেতে কত মজা লাগে তোমার। আমি অভিনয়ের চিৎকার দিয়ে মা মা বলি। এমন কত শত ভালোবাসাময় খুঁনসুটির স্মৃতি চোখে ভাসছে আমার তার হিসেব মেলা দায়। আর তার চেয়েও বেশি ভেসে উঠছে আমার এতিমখানার ছোট ছোট কোরআনের পাখিগুলোর মুখ। কারো বাবা নেই, মা আছে; কারো মা নেই, বাবা আছে। আমি মাদ্রাসার দরজায় পা দিলেই কেউ “বাবা” বলে কেউ বা আঙ্কেল বলে দৌঁড়ে এসে জড়িয়ে ধরে। আমার হাত ধরে, জামা আঁকড়ে ধরে। ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে? ওদের দেখার কি কেউ থাকবে?
এই সব ভাবতে ভাবতেই কখন যে চোখের কোণ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়তে শুরু করল, টেরই পেলাম না।
স্মৃতির দরজা খুলে গেল আরও গভীরে। মনে পড়ল শৈশবের কথা। যে বয়সে মায়ের আঁচলে থাকার কথা, সে বয়সেই মায়ের মমতা আর বোনদের স্নেহ পেছনে ফেলে চলে গিয়েছিলাম বাবার কর্মস্থলে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও উপজেলার বৈদ্যের বাজার ইউনিয়নের আনন্দ বাজারে।
১৯৮৪ সালের ৩১ মার্চ বাবা আমাকে ভর্তি করালেন ৬৪ নম্বর খংসারদী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, তৃতীয় শ্রেণীতে। সেখান থেকে পঞ্চম শ্রেণী পাস করে ভর্তি হই বৈদ্যের বাজার এন.এ.এম. পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৯২ সালে এসএসসি পাস করে চলে আসি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের রাজার বাজারে ছোট ফুফু আম্মার বাসায়। ভর্তি হই চৌদ্দগ্রাম সরকারি কলেজে বাণিজ্য বিভাগে, পরে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজে।
১৯৯৪ সালের ২১ অক্টোবর কুমিল্লা পৌর পার্কের জামতলায় বন্ধুদের সঙ্গে গড়ে তুলি কুমিল্লা বিতর্ক পরিষদ। সেই বিতর্ক পরিষদের খবর দিতে গিয়ে খবর হয়নি বলে সাপ্তাহিক আমোদ-এ বসিয়ে আমার হাত দিয়ে প্রথম সঠিক নিউজ লিখিয়ে সাংবাদিকতার হাতে খড়ি দেন কুমিল্লা প্রেস ক্লাবের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও সাপ্তাহিক আমোদ সম্পাদক শ্রদ্ধেয় বাকীন রাব্বী ভাই। সেই দিন থেকে আজ ২০২৫ সালের ২৮ মে।চোখের পলকে ভেসে উঠল পুরো জীবন।
সোনারগাঁওয়ের সাত বছরের জীবন (১৯৮৪-১৯৯২), আর কুমিল্লার তেত্রিশ বছরের জীবন (১৯৯২-২০২৫) মোট চল্লিশ বছরের ছাত্র ও পেশাগত জীবন যেন এক নিমিষেই চোখের সামনে হাজির।
আশ্চর্য লাগছে চল্লিশ বছরের প্রতিটি স্মৃতি এত স্পষ্ট। অথচ এই দীর্ঘ সময়ে একবারের জন্যও মনে পড়ছে না, আমি এমন কী ক্ষতি করেছি যার জন্য কেউ আমাকে নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইবে। কারো সঙ্গে আমার এমন কোনো বিরোধ নেই, যে বিরোধ থেকে জন্ম নিতে পারে এমন হীন ষড়যন্ত্র।
এই জীবনে কেউ আমার গায়ে হাত তোলেনি, আমিও কারো গায়ে হাত তুলিনি। কোনো নারীকে ভালোবেসে ঠকাইনি। একজনকেই ভালোবেসেছি তাকেই জীবনসঙ্গী করেছি। সৎভাবে সাংবাদিকতা করেছি, সামাজিক কাজ করেছি, সংগঠন গড়েছি, বই লিখেছি।
তবু কেন আমি টার্গেট?
কেন এই কথিত হলুদ সাংবাদিকদের নিশানা আমি?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই গাড়ি ঢাকার কাছাকাছি চলে এলো। একে একে সবার ঘুম ভাঙতে শুরু করল। আর আমার কল্পনার দীর্ঘ জগৎ থেকেও ঘটল এক অনিবার্য বিচ্ছেদ। বাস্তব আবার সামনে এসে দাঁড়াল নতুন অধ্যায়ের দ্বারপ্রান্তে।
২৩। জীবনে প্রথম ঢাকা ডিবির প্রধান কার্যালয়ে
(ভয়, রাষ্ট্র ও এক সাংবাদিকের অন্তর্গত লড়াই)
সম্ভবত বেলা তখন প্রায় এগারোটা। ছয়জন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের কঠোর তত্ত্বাবধানে আমরা দুই সাংবাদিক পাড়ি দিয়েছি প্রায় তিনশ পঁয়ষট্টি কিলোমিটার দীর্ঘ এক ক্লান্তিকর পথ। গন্তব্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের প্রধান কার্যালয়, ওয়ারী জোন।
গাড়ি থেকে নামতেই প্রথম যে অনুভূতিটি আমাকে আচ্ছন্ন করল, তা ভয় নয় বরং এক ধরনের অবিশ্বাস। মনে হচ্ছিল, আমি যেন কোনো অপরাধজগতের অদৃশ্য সীমানায় প্রবেশ করেছি। ভেতরে ঢুকেই দেখি, তিনজন ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তা আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। ঠিক সেই মুহূর্তে উপলব্ধি করলাম আমাকে কতটা ‘গুরুত্বপূর্ণ অপরাধী’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে।
আমার বিরুদ্ধে ঢাকার যাত্রাবাড়ি থানার একটি হত্যাকা-ের মামলায় ফাঁসানোর প্রস্তুতি যে কতদূর এগিয়েছে, তা বুঝতে আর বাকি রইল না। ওয়ারী জোন জুড়ে হঠাৎ এক ধরনের গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল“নীলফামারী থেকে দুই সাংবাদিক আনা হয়েছে।” কিছুক্ষণের মধ্যেই কানে এলো আরও ভয়ংকর খবর শুধু আমাদের বিষয়টি দেখার জন্য আজ ডিবি কার্যালয়ে উপস্থিত হয়েছেন দেশের একজন অতিরিক্ত আইজিপি।
শোনা গেল, তিনজন ডিআইজি সাহেব আমাদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে সিদ্ধান্ত দেবেন অতিরিক্ত আইজিপি। এ কথা শুনে মাথার ভেতর যেন ঝড় বয়ে গেল। মনে হলো হায় আল্লাহ! আমি কি এত বড় সন্ত্রাসী?
একজন আসে, আবার আরেকজন আসে। সবার একই প্রশ্ন “নীলফামারী থেকে আনা দুই সাংবাদিক কারা?” মনে হচ্ছিল, পুরো ওয়ারী জোনের কার্যক্রম যেন আমাদের কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। কম্পিউটারে বসা পুলিশ সদস্যরা আলাদা আলাদা ভাবে আমার ও তরুণের স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা নিচ্ছেন, দ্রুত টাইপ করছেন।
হঠাৎ কেউ এসে বলল, “দুই সাংবাদিকের ফাইল দ্রুত রেডি করতে বলছে।” কথাটা শোনার পর কম্পিউটারে কাজ করা পুলিশ সদস্যদের মধ্যে অদ্ভুত এক তাড়াহুড়া শুরু হয়ে গেল। কিবোর্ড আর মাউস যেন যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্র।
আমি ঠিক সেই কম্পিউটার অপারেটরের চেয়ারের পেছনে দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ চোখ চলে গেল মনিটরের দিকে। যা দেখলাম, তা আমার বুকের ভেতরটা শূন্য করে দিল।
বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সময়, ৫ আগস্ট, যাত্রাবাড়িতে সংঘটিত একটি হত্যাকা-ের মামলায় আমাকে ১৫ নম্বর এবং তরুণকে ১৬ নম্বর আসামি দেখানো হয়েছে। সেখানে লেখা হচ্ছে কিভাবে, কোন সূত্রে আমাদের ‘যোগসাজশ’ ছিল। এরপর যোগ করা হয়েছে ২৭ মে নীলফামারী সীমান্ত দিয়ে পালানোর সময় নীলফামারী ডিবি আমাদের আটক করেছে। একটি সম্পূর্ণ সাজানো কাহিনি। সত্যের সঙ্গে যার কোনো সম্পর্ক নেই।
প্রিন্ট বের করে ফাইলটি পাঠানো হলো ‘বড় স্যারের’ কাছে। হোটেল থেকে আটকের পর যাত্রাবাড়ি হত্যাকা-ের মামলাটি নিজের চোখে দেখার আগ পর্যন্ত মনে যতটা উদ্বেগ ছিল, ততটা ভেঙে পড়িনি। কিন্তু এই প্রথম আমার মনোবলে প্রবল এক আঘাত এলো। চোখ অজান্তেই ভিজে উঠল।
তরুণকে বললাম,দোস্ত, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের যাত্রাবাড়ি হত্যা মামলার ১৬ নম্বর আসামি তুমি।
তরুণ কান্নায় ভেঙে পড়ল। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম, যা হওয়ার, তাই হবে। এখানে আমাদের কোনো হাত নেই। যদি সত্যিই আমাদের এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়, মনে করবা মহান আল্লাহর কাছে আমরা এমন কোনো পাপ করেছি, যার কারণে তিনি আপাতত তাঁর রহমত ফিরিয়ে নিয়েছেন। তবে ভয় পেও না। তোমার মামলা থেকে শুরু করে সবকিছু আমি দেখব। কথাগুলো শুনে তরুণ কিছুটা স্থির হলো। এরপর আমি নীলফামারী ডিবি পুলিশের দিকে তাকিয়ে বললাম,মামলা তো দিচ্ছেন। এবার বাসায় একটা ফোন করতে দেন।
তিনি মুচকি হেসে শুধু বললেন,আর একটু প্লিজ। এই ‘আর একটু’ যে কত দীর্ঘ, কত ভারী তা তখনও বুঝিনি। চলবে।