রাত তখন প্রায় এগারোটা কিংবা সাড়ে এগারোটা। দীর্ঘ, ক্লান্তিকর যাত্রা শেষে আমাদের বহনকারী গাড়িটি যখন নীলফামারী জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সামনে এসে থামল, তখন মনে হচ্ছিল ,আর কিছু ঘটার বাকি নেই। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক দৃশ্য, যার জন্য আমি একেবারেই প্রস্তুত ছিলাম না।
গাড়ি থামার সঙ্গে সঙ্গেই দেখি, ডিবির এসআই জাকির হোসেনসহ কয়েকজন পুলিশ সদস্য সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন, যেন কোনো বিশেষ অতিথিকে অভ্যর্থনা জানানোর অপেক্ষায়। আমি কিছু বুঝে ওঠার আগেই এসআই জাকির নিজ হাতে গাড়ির দরজা টেনে খুললেন। তারপর আমাকে নামিয়ে এনে আচমকা বুকে জড়িয়ে ধরলেন। গালে চুমু দিয়ে বললেন, তুমি তো আমার বন্ধু! তুমি ৯২ সালে এসএসসি, আমিও ৯২ সালে এসএসসি। এই অপ্রত্যাশিত আন্তরিকতায় আমি কিছুটা হতভম্ব হয়ে গেলাম। বললাম,তরুণও ৯২ সালে এসএসসি। হেসে তিনি বললেন, দোস্ত, কোনো চিন্তা নেই। আগে উপরে চলো। তোমরা এখনই কুমিল্লা চলে যাবে।
ডানে তাকিয়ে দেখি আমার ছোট শ্যালক রুবেল, মনির এবং মিয়াবাজারের বন্ধু রিপন গাড়িসহ হাজির। তাদের চোখেমুখে উৎকণ্ঠা আর স্বস্তির মিশ্র অনুভূতি। বাঁ দিকে তাকিয়ে দেখি, নীলফামারীর ৭১ টিভির সাংবাদিকসহ আরও অনেক গণমাধ্যমকর্মী আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। চারপাশে ক্যামেরা, কৌতূহলী চোখ, চাপা ফিসফাস এক অদ্ভুত পরিস্থিতি।
দোতলায় উঠতে উঠতে এসআই জাকির নিচু গলায় বললেন,দোস্ত, সত্যি বলতে কি, তোমাদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগই মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমার এসপি স্যারকে দোষ দিও না। কুমিল্লার কিছু কুলাঙ্গার, জানোয়ার আছে, যাদের সাংবাদিক বলা হয়, কিন্তু আসলে তারা নর্দমার কীট। তারা পুরো একটি সাজানো গল্প বানিয়ে এসপি স্যারের কাছে পাঠিয়েছে। সঙ্গে দিয়েছে কিছু ছবি।
তিনি একটু থেমে আবার বললেন,যাই হোক, তুমি মনে কিছু নিও না। তোমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। এই কথাগুলো শুনতে শুনতে আমরা দোতলার ডিবি অফিসে পৌঁছে গেলাম। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে রাষ্ট্রযন্ত্র আমাকে ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ বানাতে ব্যস্ত ছিল, সেই একই যন্ত্রের ভেতরেই এখন ঘোষণা হচ্ছে সব অভিযোগ মিথ্যা।
আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম এই কি তবে ক্ষমতার আসল রূপ? একই রাষ্ট্র, একই বাহিনী, অথচ এক প্রান্তে ভয় আর অপমান, অন্য প্রান্তে রাজকীয় অভ্যর্থনা। একটিমাত্র ভুল তথ্য, একটি সাজানো গল্প মানুষের জীবনকে কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে উল্টে দিতে পারে, সেই নগ্ন বাস্তবতাই যেন চোখের সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠছিল।
সেই রাতে নীলফামারী পুলিশ সুপার কার্যালয়ের দোতলায় দাঁড়িয়ে আমি বুঝেছিলাম সবচেয়ে ভয়ংকর অপরাধ কখনো কখনো অস্ত্র নয়, বরং মিথ্যা।
২৭। সাগর ভাইয়ের ফোন,চার্জ ফুরিয়ে যাওয়া আর মুক্তির ঠিক আগমুহূর্ত
নীলফামারীর ডিবি অফিসে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গেই এক অপ্রত্যাশিত দৃশ্যের অবতারণা হলো। ডিবির কর্মকর্তারা আমাদের ব্যাগ ও মোবাইল ফোনগুলো ফিরিয়ে দিলেন। কয়েক ঘণ্টা, কিংবা বলা ভালো,একটি দীর্ঘ দুঃস্বপ্নের সময়জুড়ে যে ফোনটি আমার থেকে বিচ্ছিন্ন ছিল, সেটি আবার আমার হাতের মুঠোয় ফিরে এলো।
ফোনটি হাতে নেওয়ার মুহূর্তেই যেন সময় আর অপেক্ষা আর ধৈর্য সব একসঙ্গে জমে উঠল।
ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটি পরিচিত নাম, কানাডা থেকে কল।
ফেস দ্য পিপলের সাইফুর সাগর ভাই।
ফোন কানে নিতেই তিনি কোনো ভূমিকা ছাড়াই দৃঢ় কণ্ঠে বললেন,
এমরান ভাই, আপনাকে এখনই ছেড়ে দেবে। আমি পুলিশ সুপারকে পরিষ্কার করে বলে দিয়েছি পাঁচ মিনিটের মধ্যে যদি আপনাকে না ছাড়া হয়, আমি লাইভে আসছি।
এই কথাগুলো শুনে বুকের ভেতর জমে থাকা ভয় আর ক্লান্তির স্তূপের ভেতর দিয়ে এক ঝলক আলো নেমে এলো। মনে হলো, দেশের মাটিতে না থেকেও কেউ একজন শক্ত করে আমার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। প্রবাসের দূরত্বও যে প্রতিবাদের কণ্ঠকে নীরব করতে পারে না, সাগর ভাইয়ের সেই কণ্ঠই তার প্রমাণ।
আমি কিছু বলতে যাচ্ছিলাম ধন্যবাদ, কৃতজ্ঞতা, কিংবা শুধু একটুখানি স্বস্তির নিশ্বাস। কিন্তু ঠিক তখনই ঘটল নির্মম বাস্তবতা। ফোনের স্ক্রিন হঠাৎ নিভে গেল।চার্জ শেষ।
এক মুহূর্তে সব শব্দ, সব যোগাযোগ, সব প্রতিরোধ নীরবতায় ডুবে গেল। মনে হলো, এই ছোট্ট যন্ত্রটির চার্জের সঙ্গে সঙ্গে আমার হাতে থাকা শেষ আশাটুকুও যেন নিভে গেল।
আমি ফোনটির দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। ভাবলাম এটাই কি তবে আধুনিক সময়ের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি? যেখানে একটি সত্য, একটি লাইভ, একটি কণ্ঠ সবকিছু নির্ভর করে থাকে কয়েক শতাংশ ব্যাটারির ওপর?
তবু মনকে শক্ত করলাম। কারণ, ফোন নিভে গেলেও সত্য নিভে যায় না। বাইরে কোথাও না কোথাও, হয়তো এই মুহূর্তেও, সাগর ভাই প্রস্তুত আছেন কথা বলার জন্য, প্রতিবাদ জানানোর জন্য।
নীলফামারীর ডিবি অফিসের সেই ঘরে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমবার গভীরভাবে উপলব্ধি করলাম এই সময়ের রাজনীতিতে ক্ষমতার বিপরীতে সবচেয়ে শক্তিশালী অস্ত্র কখনো কলম, কখনো ক্যামেরা, আবার কখনো একটি লাইভ বাটন। আর কখনো কখনো একটি ফোনের চার্জ।