এরপর ডিবির এসআই জাকির হোসেন হঠাৎ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করলেন, দোস্ত, কী খাবা?
প্রশ্নটা শুনে আমি একটু থমকে গেলাম। এতক্ষণ যে পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে গেছি, সেখানে খাবারের কথা ভাবাই যেন বিলাসিতা। বিনয়ের সঙ্গেই বললাম, এখন না। আমার সঙ্গে অনেক লোক আছে। তাড়াতাড়ি কুমিল্লা যাওয়ার ব্যবস্থা করলেই হয়। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আপত্তি জানিয়ে বললেন,প্রশ্নই আসে না। যত লোকই থাকুক, সবাই খাবে। কোনো সমস্যা নেই। তুমি আমার বন্ধু। বন্ধুর জন্য কি আমি একটু টাকা খরচ করতে পারি না? এই কথার ভেতরে ছিল আন্তরিকতা, আবার ছিল এক ধরনের ক্ষমতার স্বাভাবিক আত্মবিশ্বাস যেন খাওয়ানোটা শুধু সৌজন্য নয়, বরং কর্তৃত্বের অংশ। আমি আবার বললাম,আচ্ছা, ভাত খাব না। তুমি বরং পরোটা আর সবজি আনতে পার। কিন্তু আমার কথার মধ্যেই তিনি লোক পাঠিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ পর একে একে টেবিলে এসে হাজির হলো গরুর মাংস, পরোটা আর সবজি। খাবারের আয়োজন দেখে বুঝলাম, এটা শুধু ক্ষুধা নিবারণের ব্যবস্থা নয় এটা এক ধরনের ‘সংস্কৃতি’। মনে মনে হঠাৎই একটি ভাবনা এসে গেল, ঢাকা ডিবির হারুনের সেই আলোচিত ‘ভাতের হোটেল’ সংস্কৃতি কি তবে নীলফামারীর ডিবিতেও ঢুকে পড়ল? নাকি এটি নিছক ব্যক্তিগত সৌহার্দ্যের বহিঃপ্রকাশ? ঠিক উত্তরটা তখনও আমার কাছে পরিষ্কার ছিল না। এখনো পরিস্কার হয়নি। যাই হোক, যে কারণেই হোক, ডিবির এসআই জাকির হোসেনের আন্তরিকতা সেই মুহূর্তে আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করল। কয়েক ঘণ্টা আগেও যে মানুষটি রাষ্ট্রযন্ত্রের এক অচেনা মুখ ছিল, এখন সে-ই বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়াচ্ছে, এই বৈপরীত্য আমাকে ভাবিয়ে তুলল। আরও একটি বিষয় আমার চোখ এড়ায়নি। কুমিল্লা থেকে আসা আমার স্বজনরা যারা এতক্ষণ উৎকণ্ঠা, অপমান আর ভয়ের মধ্য দিয়ে সময় কাটিয়েছেন, তারা নিজের চোখে দেখছেন, আমাকে কীভাবে সম্মান দেওয়া হচ্ছে। এই দৃশ্য তাদের জন্যও এক ধরনের স্বস্তি, এক ধরনের নীরব প্রত্যয়। আমি চুপচাপ বসে খাবারের দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম, এই দেশটা বড় অদ্ভুত। এখানে কখনো মানুষ অপরাধী হয় একটি মিথ্যা খবরে, আবার কখনো সেই একই মানুষ কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হয়ে ওঠে সম্মানিত অতিথি। কখনো ক্ষমতা মুখ ভার করে থাকে, আবার কখনো সেই ক্ষমতাই নিজ হাতে খাবার তুলে দেয়। এই ‘ভাতের হোটেল’ সংস্কৃতি হয়তো আমাকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর প্রশ্ন, ন্যায় কি আতিথেয়তার ওপর নির্ভরশীল? চলবে।