শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ ক্ষমতার ছায়ায় মুহূর্তের রূপান্তর : এসপি তারেক হোসেনের আগমন

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-৭
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৫ ঘন্টা আগে

ডিবির ওসির কক্ষে তখন এক অদ্ভুত নীরবতা যে নীরবতায় প্রশ্ন ছিল, অথচ ভয় ছিল না আমাদের। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলাম সাহেব আমাদের সামনে বসে ধীরস্থির ভঙ্গিতে জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন। কথোপকথনের ভাঁজে ভাঁজে অজান্তেই সেই জিজ্ঞাসাবাদ একসময় আড্ডার রূপ নিল। চায়ের কাপে ধোঁয়া উঠছিল, আমি ধীরে ধীরে চুমুক দিচ্ছিলাম। বাইরে হয়তো সন্ধ্যা নেমেছে, ভেতরে আমার বুকের গভীরে তখন বঙ্গোপসাগরের ঢেউ খেলছে আর একটার পর একটা প্রশ্ন আসছে, দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তার ঢেউ আছড়ে পড়ছিল দিগন্তজুড়ে।
ইতোমধ্যে কয়েক ঘণ্টা কেটে গেছে। জীবনসঙ্গী জাহেরা বারবার ফোন করবে আমি জানি, দীর্ঘ সময় আমাকে না পেলে তার উদ্বেগ কোন মাত্রায় পৌঁছাতে পারে তা জানি আমি। কিন্তু আমাদের দু’জনের ফোন তখন পুলিশের হেফাজতে। আমরা নির্বাক দর্শকের মতো সময়ের গতিপথ গুনছি। হঠাৎ করেই দৃশ্যপট বদলে গেল।
সুঠাম দেহের, ইনফর্ম পরিহিত এক পুলিশ কর্মকর্তা কক্ষে প্রবেশ করলেন। তার উপস্থিতির সঙ্গে সঙ্গেই যেন বাতাসের দিক পাল্টে গেল। সবাই একযোগে দাঁড়িয়ে পড়লেন। বুঝতে আর বাকি রইল না তিনি এ.এফ.এম. তারেক হোসেন, নীলফামারীর পুলিশ সুপার।
আমাদের হাতে তখন হাতকড়া নেই। আমরা এএসপির সঙ্গে একই কক্ষে বসে চা খাচ্ছি। সেই দৃশ্য দেখে হয়তো তিনি মুহূর্তে আমাদের ‘অভ্যস্ত আসামি’ হিসেবে চিহ্নিত করতে পারেননি। তিনি সংক্ষিপ্ত অথচ কঠোর কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,
“ওরা কোথায়?”
এএসপি সাহেব হাত দেখিয়ে শান্ত স্বরে বললেন,
“স্যার, উনারাই।”
এই একটি বাক্য উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কক্ষের আবহ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেল। মুহূর্তেই কথার সুর বদলে গেল, বদলে গেল আচরণের ভাষা। পুলিশ সুপার আমাদের উদ্দেশে অশ্রাব্য ও রূঢ় ভাষায় গালাগালি শুরু করলেন। এএসপি ও ডিবির এসআই জাকিরকে লক্ষ্য করে কঠোর স্বরে বললেন, “ওরা দাগি ক্রিমিনাল! ওদের হাতকড়া না পড়িয়ে চা খাওয়াচ্ছ?”
পরিস্থিতির আকস্মিকতায় আমরা দু’জনই বিস্মিত। সেই বিস্ময় ভাঙল তরুণের কণ্ঠে। সে সাহস সঞ্চয় করে বলল,
“স্যার, আপনি না জেনে আমাদের বকছেন। আগে জানেন স্যার আমরা দোষী কি না।”
এই একটি বাক্য যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। উত্তরে তরুণকে আরও ভয়ংকর, অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করা হলো। মুহূর্তেই অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলামসহ ডিবির উপস্থিত সব সদস্যের মুখ মলিন হয়ে গেল। তাদের চোখেমুখে স্পষ্ট অনুশোচনার ছাপ । হয়তো তারা জেনেও কিছু বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছেন। কারণ, খোঁজখবর নিয়ে, যাচাই-বাছাই করে কোনো ত্রুটি না পাওয়ার পরও আমাদের ‘ফাঁসানোর’ একটি প্রবল ইচ্ছা যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠছিল পুলিশ সুপার নীলফামারীর চোখে মুখে। কোনো প্রতিবাদ আর শোনা গেল না।
ডিবির এক এসআই মুখ কালো করে তৃতীয়বারের মতো আমাদের দু’জনের হাতে হ্যান্ডকাফ পরিয়ে দিলেন। ধাতব শিকলের ঠান্ডা স্পর্শ তখন আমার কব্জিতে, অথচ বুকের ভেতর আগুন জ্বলছে অন্যায় অপমান আর অসহায়তার আগুন।
পুলিশ সুপার উত্তেজিত পায়ে ডিবির কক্ষ ছেড়ে বেরিয়ে যেতে যেতে বললেন,
“এই ক্রিমিনালদের কয়েক মিনিট পর আমার রুমে নিয়ে এসো হাতকড়া পরানো অবস্থায়।”
তার কণ্ঠ মিলিয়ে গেল করিডরের অন্ধকারে। আমরা দাঁড়িয়ে রইলাম হাতকড়ার শব্দ, চাপা দীর্ঘশ্বাস আর নীরব প্রতিবাদের ভার নিয়ে। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, এখানে অপরাধের প্রমাণ নয় ক্ষমতার ধারণাই অনেক সময় সবচেয়ে বড় সত্য হয়ে দাঁড়ায়।
পুলিশ কি মানুষ? নাকি শুধু ক্ষমতার পরিচয়
৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর কুমিল্লাসহ সারা দেশের পুলিশ বাহিনীর সার্বিক অবস্থা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি। প্রত্যক্ষ করেছি মানুষের চোখে পুলিশের ভাঙা প্রতিচ্ছবি, আতঙ্ক, ঘৃণা আর অবিশ্বাসের দীর্ঘ ছায়া। সেই সময় একজন সচেতন নাগরিক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট হিসেবে দায়িত্ববোধ থেকেই আমি পত্রিকায় একের পর এক কলাম লিখেছি,পুলিশ সংস্কার, রিফর্ম এবং এ বাহিনীকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। আমি টকশো করেছি, নিজে কথা বলেছি। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেমিনার, আলোচনা সভায় দাঁড়িয়ে পুলিশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য রেখেছি। বলেছি, পুলিশকে মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন করলে রাষ্ট্র দুর্বল হয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চেষ্টা করেছি মানুষের মধ্যে পুলিশের প্রতি হারানো আস্থা ফিরিয়ে আনতে। বারবার বলেছি, সব পুলিশ খারাপ নয়, কয়েকজনের দোষে পুরো বাহিনীকে কাঠগড়ায় দাঁড় করানো অন্যায়।
কিন্তু নীলফামারীতে এসে, ডিবির কক্ষে দাঁড়িয়ে, হাতকড়া পরা অবস্থায় যেদিন বাস্তবের মুখোমুখি হলাম, সেদিন নিজেকেই প্রশ্ন করেছি, আমি কি ভুল বলেছিলাম?
কোনো ন্যূনতম তদন্ত ছাড়াই, কোনো সত্য যাচাই না করেই নীলফামারীর পুলিশ সুপার যেভাবে আমাদের সঙ্গে রাস্তাঘাটের মানুষের মতো ভাষায় কথা বললেন, অকথ্য গালাগাল শুরু করলেন, সেই মুহূর্তে আমার সমস্ত বিশ্বাস, যুক্তি আর কলাম যেন একে একে ভেঙে পড়ল। মনে হলো, এতদিন কলম ধরে যা লিখেছি, তা কি কেবলই আত্মপ্রবঞ্চনা ছিল? নিজের ভেতরেই নিজেকে ধিক্কার দিলাম।
হাতকড়া পরা অবস্থায় সহকর্মী তরুণের দিকে তাকিয়ে ধীরস্বরে বললাম,“দোস্ত, আসলে পুলিশ পুলিশই থাকল। পুলিশ আর মানুষ হইলো না।” তরুণ তখন কটাক্ষের সুরে, হালকা খোঁচা দিয়ে বলল, “হাসিনার পতনের পর যখন মানুষ পুলিশ দেখলেই মারতে যাইতো, তখন আপনিই তো কলম ধরেছিলেন। বলেছিলেন, পুলিশদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পুলিশের প্রতি বিরূপ মনোভাব পরিহার করতে হবে। এবার বুঝেন পুলিশের জাত কেমন!”
তার কথায় ব্যথা পেলেও অস্বীকার করতে পারলাম না বাস্তবতার নির্মমতা। তবু মনটা মানতে চাইছিল না। বললাম, “শেখ হাসিনার আমলেও যেমন সব পুলিশ খারাপ ছিল না, এখনো সব পুলিশ খারাপ না। কতিপয় কুলাঙ্গারের জন্য গোটা পুলিশ বাহিনীকে ধ্বংস করতে পারি না। দেখ না, মামুন ভাই কেমন ব্যবহার করলো।”
আমি তখন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলামের কথাই বলছিলাম, যিনি শুরু থেকে মানবিক, সংযত ও দায়িত্বশীল আচরণ করেছিলেন।
কিন্তু সত্য বলতে কী,সেই মুহূর্তে নীলফামারীর এসপি এ.এফ.এম. তারেক হোসেনের আচরণ আমার চিন্তার ভিত নড়িয়ে দিয়েছিল। কেন জানি তখন আমার মনেও ক্ষণিকের জন্য হলেও মনে হয়েছিল, পুলিশরা বুঝি মানুষ নয়, তারা কেবল পুলিশ। ক্ষমতার পোশাক পরা এক ভিন্ন সত্তা, যাদের কাছে মানবিকতা অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় বিলাসিতা মাত্র।
পুলিশ সুপারের মুখের ভাষা আর হাতকড়ার শীতল ধাতব স্পর্শ তখন শুধু কব্জিতে নয়, আমার বিশ্বাসের ভেতরেও বিঁধে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছিল,রাষ্ট্র, ক্ষমতা আর মানুষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এই বাহিনীটি যদি মানুষ হতে ভুলে যায়, তবে সাধারণ মানুষের যাওয়ার পথ কোথায়?
সেই রাতে আমি প্রথমবার বুঝলাম,পুলিশ সংস্কার শুধু নীতিমালার বিষয় নয়, এটা মানসিকতার প্রশ্ন। আর সেই মানসিকতা বদলানো সবচেয়ে কঠিন কাজ। (চলবে)।