এদিকে চার জন শিক্ষক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘এক বছর ধরে বেতন বন্ধ থাকায় জীবন অতিবাহিত হচ্ছে অভাবের সঙ্গে যুদ্ধ করে। পরিবারবর্গের আশা পূরণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। নিজের জীবনের কথা নাই ধরলাম, কিন্তু পরিবারে বাবা, মা, ভাইবোন এবং স্ত্রী সন্তান-তাদের মুখে দুমুঠো ভাতের ব্যবস্থা করাই কঠিন হয়ে পড়েছে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দুর্নীতিবাজ কিছু শিক্ষককে শিক্ষার্থীরা পদত্যাগ করতে বাধ্য করলে এই সুযোগ নেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সুযোগ সন্ধানী শিক্ষকরাই। শিক্ষার্থীদের দিয়ে স্কুল-কলেজের প্রধানসহ সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। ঘটনাটি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এক পর্যায়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা বন্ধ করতে নির্দেশনা দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়। পদত্যাগের শিকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান এবং সহকারী শিক্ষকরা সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ন্যয়বিচার দাবিতে রাজপথে আন্দোলনও করেছেন।
গত ১৯ জানুয়ারি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ জোর করে পদত্যাগ করানো শিক্ষকদের বেতন অব্যাহত রাখার নির্দেশনা জারি করে। অফিস আদেশে বলা হয়, ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা বোর্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ঐ সভায় শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ ও হেনস্তা ও বেতন-ভাতার বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। সিদ্ধান্তে বলা হয়, জোরপূর্বক পদত্যাগ ও এর পেছনে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে তাদের বিষয়ে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য সিদ্ধান্ত হয়। তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু থাকবে। এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) মহাপরিচালককে নির্দেশনা দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আরো দুই দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়। যার পরিপ্রেক্ষিতে সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষকের মধ্যে ২ হাজার ৪৫০ শিক্ষকের ইএফটিতে নাম অন্তর্ভুক্তি করা হয়। তবে ১ হাজারের বেশি শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে এক বছর ধরে, কারণ তাদের নাম ইএফটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
পদ-বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোটের আহ্বায়ক ও ধামরাইয়ের সূয়াপুর নান্নান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল ইসলাম তালুকদার ইত্তেফাককে বলেন, তিনি নিজেসহ সাড়ে ৩ হাজার শিক্ষক এক বছর কর্মস্থলে যেতে পারেননি। জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করা অধিকাংশ শিক্ষকের নিয়োগ হয়েছে বিএনপি সরকারের আমলে। তারা কখনো কোনো রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তার পরও তাদের আওয়ামী লীগের দোসর ট্যাগ দিয়ে কর্মস্থলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, শিশুদের সত্যিকারের মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার ব্রত নিয়ে সততা, নিষ্ঠা ও নৈতিকতার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে স্বার্থলোভী লোকদের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছি আমরা। তারা পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে, দুষ্কৃতকারীদের সঙ্গে নিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, যা অস্বাভাবিক, অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনভিপ্রেত।
পদ-বঞ্চিত প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষক জোটের নেতা এবং নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনি আক্তার মিলি বলেন, অনৈতিক সুবিধা পেতে সরকারের নির্দেশ মানছেন না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এক শ্রেণির ভারপ্রাপ্ত প্রধানরা। শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করায় অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে। কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হয়েও ফ্যাসিস্টের দোসর ট্যাগ পেয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন তিনি।
গত বছরের ২১ আগস্ট সচিবালয়ে নিজ মন্ত্রণালয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের তত্কালীন শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ বলেছিলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন পদে দায়িত্বরতদের জোর করে পদত্যাগ ও অপমান করা যাবে না। কারও বিরুদ্ধে ন্যায়সঙ্গত অভিযোগ থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উপদেষ্টার সে আহ্বান তখন কেউ শোনেনি। গত ২৭ আগস্ট শিক্ষা উপদেষ্টা জোরপূর্বক পদত্যাগ ও শিক্ষক হেনস্তার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি। গত তিন সেপ্টেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয় বলে ঘোষণা করা হয়। গত ১৪ জানুয়ারি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের সমস্যা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বেতন ভাতাদি চালু রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
ঢাকায় দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান প্রধানের পদত্যাগ : ঢাকা জেলাতেই অন্তত দুই শতাধিক প্রতিষ্ঠান প্রধান পদত্যাগে বাধ্য হন। ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ কেকা রায় চৌধুরী ও কলেজের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানম গত বছরের ১১ আগস্ট ভিকারুননিসার প্রাক্তন ও বর্তমান ছাত্রীদের আন্দোলনের মুখে পদত্যাগপত্র লিখে দেন। এছাড়া লেক সার্কাস বালিকা উচ্চবিদ্যালয়, লালবাগের রহমতুল্লাহ স্কুল অ্যান্ড কলেজ, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ড. মাহবুবুর রহমান মোল্লা কলেজ, শাহ আলী মহিলা কলেজ, ঢাকা কমার্স কলেজ, ঢাকা মডেল কলেজ, সায়েদাবাদ আর কে চৌধুরী কলেজ, হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের পদত্যাগ করানোর চেষ্টায় বিশৃঙ্খলা তৈরি করা হয়। এসব কলেজের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এখন পর্যন্ত বিদ্যমান। ফলে এর প্রভাব পড়ছে শিক্ষা কার্যক্রমে। একইভাবে মনিপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজ, মিরপুর বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, দনিয়া এ কে স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজেও ঘটেছে বিশৃঙ্খলার ঘটনা, এর জের এখনো শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাব পড়ছে। রাজধানীর সালেহা স্কুল অ্যান্ড কলেজের পরিস্থিতি ঢাকা সিটি কলেজের পরিস্থিতির কাছাকাছি, সেখানে চলছে এক পক্ষের খবরদারি। রাজধানীর শাহ আলী ফাজিল মাদ্রাসা, কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী উপজেলার দারুল উলুম আশরাফিয়া মাদ্রাসা, কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রাজারভিটা ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায় এখনো পুরোপুরি স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে ফেরেনি।
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পদত্যাগের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত হচ্ছে: শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, পদত্যাগের প্রতিটি ঘটনার তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত চলাকালে সবার বেতন চালু থাকবে। অনিয়ম-দুর্নীতি প্রমাণিত না হলে চাকরি ফিরে পাবেন। যাদের অনিয়ম-দুর্নীতি ধরা পড়বে, মন্ত্রণালয় থেকে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
