শরীয়তপুরে তিন সাংবাদিককে মারধর ও কয়েকজনকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পর এবার সাংবাদিকদের বিরুদ্ধেই চাঁদাবাজির অভিযোগ দিয়েছেন জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা।
গতকাল বুধবার (২৬ আগস্ট) রাতে পালং মডেল থানায় তিনি লিখিত অভিযোগ দেন। একই ঘটনায় হামলার শিকার সাংবাদিকদের পক্ষ থেকেও থানায় অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ দেওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পার হলেও সাংবাদিকদের অভিযোগটি মামলা বা জিডি হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি বলে দাবি করেছেন তারা।
এদিকে সাংবাদিকদের মারধর ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠার পরও আরিফুজ্জামান মোল্লার বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেয়নি বিএনপি। বরং জেলার কয়েকজন সাংবাদিককে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী ও সমর্থকরা হুমকি দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকদের মধ্যে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
অভিযোগের বিষয়টি নিশ্চিত করে পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শাহ আলম বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধরের ঘটনায় সাংবাদিক বরকত মোল্লা তার অনুপস্থিতিতে থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। পরে বিএনপি নেতা আরিফুজ্জামান মোল্লাও কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। দুটি অভিযোগই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে মামলা নথিভুক্ত করা হবে।
গত শনিবার রাতে জেলা প্রশাসন জেলা প্রেস ক্লাবকে লিখিত নোটিশ না দিয়ে প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে দেয় বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের। এ ঘটনার প্রতিবাদে সময় টেলিভিশনের সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল তার ফেসবুক পোস্টে প্রেস ক্লাবের সভাপতি আবুল হোসেন ও জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগমের ছবি ব্যবহার করে প্রতিবাদ জানান।
এর পরদিন রোববার সকালে ইসরাফিলের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। এতে তার ডান হাতের কবজি ভেঙে যায়। হামলার প্রতিবাদ এবং প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনায় ওই দিন বিকেলে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেন শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকরা।
কর্মসূচি চলাকালে জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম ওই স্থান দিয়ে যাওয়ার সময় সাংবাদিকরা তাকে ঘিরে ধরেন এবং তার প্রত্যাহারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। সাংবাদিকদের এ কর্মসূচির পর বিএনপির একটি পক্ষ তাদের ওপর ক্ষুব্ধ হয় বলে অভিযোগ সাংবাদিকদের।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেস ক্লাব ও কয়েকজন সাংবাদিককে নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। সোমবার বিএনপির একটি পক্ষ জেলা প্রশাসকের সঙ্গে দেখা করে কথা বলে। পরে পৃথক সভা করে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর ধারাবাহিকতায় মঙ্গলবার ‘শরীয়তপুর জেলার সর্বস্তরের জনগণ’র ব্যানারে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়। এতে বিএনপির জেলা পর্যায়ের কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। কর্মসূচি থেকে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া এবং ব্যানার প্রদর্শন করা হয়।
ওই বিক্ষোভ মিছিলের সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে তিন সাংবাদিক মারধরের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তারা হলেন—নিউজ টোয়েন্টিফোর, জাগো নিউজ ও খবরের কাগজের প্রতিনিধি বিধান মজুমদার অনি, দ্য ডেইলি স্টারের শরীয়তপুর ও মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি জাহিদ হাসান রনি এবং দৈনিক এদিন ও মানবকণ্ঠের প্রতিনিধি বরকত উল্লাহ।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, যুবদলের সাবেক সভাপতি ও জেলা বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা, জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান আমানসহ কয়েকজন তাদের মারধর করেন। একই দিন বিকেলে আরিফুজ্জামান মোল্লা আরও কয়েকজন সাংবাদিককে মুঠোফোনে হুমকি দেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জাজিরা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি ও সোনালী নিউজের শরীয়তপুর প্রতিনিধি পলাশ খানের কাছে দেওয়া হুমকির একটি অডিও রেকর্ড সাংবাদিকদের কাছে রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন। সাংবাদিকদের দাবি, ওই অডিওতে আরিফুজ্জামান মোল্লাকে তাদের মারধরের হুমকি এবং সাংবাদিকদের ‘তালিকায়’ থাকার কথা বলতে শোনা যায়।
এ ঘটনায় রোববার (২৩ আগস্ট) সকালে হামলার শিকার সময় টিভির সাংবাদিক বিএম ইসরাফিল পালং মডেল থানায় মামলা করেন। ওই মামলার আসামি পলাশ সরদার পরে ইসরাফিলের বিরুদ্ধে পাল্টা মামলা করেন। দুটি মামলায় এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।
বুধবার সন্ধ্যায় মানবকণ্ঠ ও দৈনিক এদিনের প্রতিনিধি বরকত মোল্লা পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আরিফুজ্জামান মোল্লা, শরীয়তপুর জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আমিনুর রহমান ওরফে আমান এবং যুবলীগের কর্মী রুবেল মাদবরের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আরও দুজন সাংবাদিক জিডির জন্য থানায় লিখিত আবেদন করেছেন।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক বরকত মোল্লা বলেন, মামলা করার জন্য থানায় গেলে ওসি তাদের এড়িয়ে থানা থেকে বের হয়ে যান। পরে তাকে ফোন করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। পুলিশ সুপারকেও ফোন করে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় থানায় অপেক্ষা করে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়ে আসতে হয়েছে। পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা তাকেসহ অন্য সাংবাদিকদের ভয় দেখাচ্ছেন।
এখন টিভির শরীয়তপুর প্রতিনিধি কাজী মনিরুজ্জামান বলেন, বিনা নোটিশে প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সাংবাদিকদের বিরোধের সৃষ্টি হয়। পরে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও তাদের বিরুদ্ধে বিএনপির একটি পক্ষের বিক্ষোভের ঘটনা ঘটে।
তিনি বলেন, তিন সাংবাদিককে মারধর করা হয়েছে। এরপর অব্যাহতভাবে সাংবাদিকদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। শরীয়তপুরে কর্মরত সাংবাদিকরা এখন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।
শরীয়তপুর প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক নুরুল আমিন বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলা, হুমকি এবং প্রেস ক্লাবের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে ফেলার ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকরা কোনোভাবেই হামলা, হুমকি বা হয়রানির শিকার হতে পারেন না।
তিনি বলেন, সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় লিখিত অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা না হওয়ায় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে শরীয়তপুর জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি সিরাজুল হক মোল্লা বলেন, ফ্যাসিস্টদের কিছু দোসর সাংবাদিকতার আড়ালে মব সৃষ্টি করে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে অশোভন আচরণ করেছেন। রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধির সঙ্গে এমন আচরণের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের সঙ্গে বিএনপিও প্রতিবাদ করেছে।
তিনি বলেন, তবে বিএনপির কোন নেতা সাংবাদিকদের মারধর করেছেন এমন তথ্য তাদের কাছে নেই বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, একজন নেতা রাগের মাথায় এক সাংবাদিককে কিছু উল্টাপাল্টা কথা বলেছেন, যা অনাকাঙ্ক্ষিত ও দুঃখজনক। এ ঘটনার তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।