ফেনীর বাজারে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৯০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। কোথাও তারও বেশি দামে। কিন্তু সরকারি নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। অর্থাৎ সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় ক্রেতাকে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ৬৩ থেকে ১৬৩ টাকা।
ব্যবসায়ীদের কেউ বলছেন সরবরাহ সংকট, কেউ দায় দিচ্ছেন ডিলারদের। আবার ডিলারদের দাবি-কোম্পানি থেকেই তাদের বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি মূল্য নির্ধারণের পরও বাজারে এলপিজির দাম নিয়ন্ত্রণের বাইরে যাচ্ছে কেন?
ফেনী শহর ও বিভিন্ন উপজেলার বাজার ঘুরে ক্রেতা, খুচরা বিক্রেতা ও ডিলারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার একেক দোকানে একেক দামে বিক্রি হচ্ছে। কোথাও ১ হাজার ৯০০ টাকা, কোথাও ২ হাজার টাকা। সরবরাহ কম থাকায় অনেক ক্রেতাকে একাধিক দোকানে ঘুরেও কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ডের সিলিন্ডার না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফেনী শহরের মাস্টারপাড়ার বাসিন্দা সাইফুর রহমান বলেন, সরকারি নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
তিনি আরও বলেন, আমি অল্প বেতনে চাকরি করি। পরিবারের ছয় সদস্য নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকি। ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২ হাজার টাকা দিয়ে কিনেছি। এভাবে চললে সংসারের খরচ সামলানো কঠিন হয়ে যাবে।
শহরের একাডেমি সড়কের বাসিন্দা বিবি আমেনার সংসারও এলপিজি নির্ভর। তিনি বলেন, ‘স্বামীর অল্প আয়ে সংসার চলে। বাসায় লাকড়ির চুলা ব্যবহারের সুযোগ নেই। তাই বাধ্য হয়েই গ্যাস কিনতে হয়। দাম এভাবে বাড়তে থাকলে সংসার চালানো কঠিন।
শুধু গৃহস্থালিই নয়, এলপিজির বাড়তি দাম চাপে ফেলেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদেরও। ট্রাংক রোডের চা-সিঙ্গারা দোকানি আবু ইসমাইল বলেন, বাড়তি দামে গ্যাস কিনেও পণ্যের দাম বাড়াতে পারছেন না। তার ভাষায়, সিলিন্ডারের দাম বাড়ছে, কিন্তু সিঙ্গারা ১০ টাকাতেই বিক্রি করছি। ১৫ টাকা করলে ক্রেতা কমে যাবে। বাড়তি খরচটা আমাদেরই বহন করতে হচ্ছে।
দাগনভূঞার ব্যবসায়ী একরামুল হক জানান, মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) তিনি ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার পাইকারি পর্যায়ে ১ হাজার ৯০০ টাকা দরে কিনেছেন। তাই ২ হাজার টাকার কমে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না বলে দাবি তার। তিনি দাবি করেন, ডিলাররা সরকার নির্ধারিত দামে দিলে আমরাও কম দামে বিক্রি করতে পারতাম।
খুচরা বিক্রেতা হারুন অর রশিদ বলেন, গত দুই মাস ধরে বসুন্ধরা গ্যাসের সিলিন্ডার পাচ্ছেন না। অন্য একটি কোম্পানির সিলিন্ডারও স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় ২০০ টাকা বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
খুচরা ব্যবসায়ীদের বক্তব্যের সঙ্গে ডিলার পর্যায়ের তথ্য পুরোপুরি মিলছে না। ফেনীতে বসুন্ধরা গ্যাসের ডিলার মেসার্স রাসেল এন্টারপ্রাইজের ক্যাশিয়ার শাহাদাত হোসেন তারেক বলেন, বিইআরসি ১২ কেজির এলপিজির দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করলেও কোম্পানি থেকে তাদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৯০০ থেকে ১ হাজার ৯৫০ টাকা দরে কিনতে হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমরা প্রায় ৫০ টাকা লাভে বিক্রি করছি। কিন্তু গ্রামগঞ্জে কিছু খুচরা বিক্রেতা নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণ করছেন। তারা প্রতি বোতলে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত লাভ করছেন।
তারেক দাবি করেন, শুধু দাম নয়, সরবরাহ সংকটও প্রকট। গত দুই মাস ধরে দুটি কোম্পানির গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না বলেও জানান তিনি।
এলপিজি বাজারের এ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে। যদি ডিলার পর্যায়েই সরকারি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়, তাহলে নির্ধারিত খুচরা মূল্য কার্যকর হবে কীভাবে? আবার কোনো কোনো খুচরা বিক্রেতা যদি অতিরিক্ত মুনাফা করেন, তাহলে তাদের বিরুদ্ধে নজরদারি কতটা কার্যকর-সেটিও প্রশ্নের মুখে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) ফেনী জেলা শাখার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোরশেদ হোসেন বলেন, অতিরিক্ত দামে এলপিজি বিক্রি বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি আরও বাড়াতে হবে।
তিনি আরও বলেন, শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত নিয়মিত বাজার মনিটরিং দরকার। মানুষ এমনিতেই অর্থকষ্টে আছে। অনেক পরিবারের জন্য অতিরিক্ত কয়েক টাকা ব্যয়ও বড় চাপ।
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ফেনীর সহকারী পরিচালক মো. আছাদুল ইসলাম বলেন, এলপিজির দাম নিয়ে নিয়মিত মনিটরিং করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি নেওয়ার বিষয়ে কোনো ভোক্তা অভিযোগ করলে প্রতিটি ঘটনা শুনানি করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারি দামে বিক্রি নিশ্চিত করতে অভিযান চলছে।
ফেনী জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবউল করিম বলেন, সরকার নির্ধারিত ১ হাজার ৮৩৭ টাকা দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে অভিযান চলছে।
তিনি আরও জানান, ফেনীর ১৮ জন সাপ্লায়ার প্রশাসনকে জানিয়েছেন যে তারাও নির্ধারিত দামে এলপিজি কিনতে পারছেন না। কোথাও ১ হাজার ৯০০ টাকা বা তারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে বলে তারা জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক বলেন, বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে।
ফেনীর এলপিজি বাজারের চিত্র তাই একদিকে সরকারি নির্ধারিত মূল্য, অন্যদিকে সরবরাহকারী ও বিক্রেতাদের দাবি-এই দুইয়ের মাঝখানে আটকে আছে সাধারণ ভোক্তা। দাম বাড়ার প্রকৃত কারণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থার কোথায় সংকট, সেটি পরিষ্কার না হলে সরকারি মূল্য নির্ধারণ করেও বাজারে তার সুফল পৌঁছানো কঠিন।