বুলেট বৈরাগী হত্যা: চাকরি-সহায়তা মেলেনি,চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উর্মি হীরার

স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ২১ ঘন্টা আগে

স্বামীকে হারিয়ে একমাত্র শিশুসন্তান নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে উর্মি হীরার। কুমিল্লার কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যার ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। মামলাটি বিচারের জন্য জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু স্বামীকে হারানোর পর চাকরি ও সরকারি সহায়তার আশ্বাস পেলেও এখনো কিছুই পাননি উর্মি। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা বাসাভাড়া দিতে গিয়ে সংসার চালানোই তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে স্বামী হত্যার বিচার পাওয়ার অপেক্ষা, অন্যদিকে সন্তানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ গড়ার দুশ্চিন্তা—দুই সংকটে অসহায় এই নারী।

বুলেট বৈরাগী কুমিল্লার বিবির বাজার স্থলবন্দরে সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। গত ২৪ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লায় ফেরার পথে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ে প্রাণ হারান তিনি। তাঁর মৃত্যুতে স্ত্রী, শিশুসন্তান ও মা-বাবা উপার্জনক্ষম স্বজনকে হারান। দীর্ঘ তদন্ত শেষে জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশ এ ঘটনায় পাঁচজনকে অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে।

বুলেট বৈরাগীর স্ত্রী উর্মি হীরা বলেন, বুলেটের উপার্জনেই তাঁদের সংসার চলত। এখন স্বামী নেই, অথচ সন্তানকে নিয়ে বেঁচে থাকার দায়িত্ব তাঁর কাঁধে। চাকরির আশ্বাস দেওয়া হলেও এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। কাস্টমস বিভাগ থেকেও তাঁরা প্রাপ্য সরকারি অর্থ পাননি বলে জানান তিনি।

উর্মি হীরা বলেন, কুমিল্লা নগরের বাসাটি এখনো রয়েছে। প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়। স্বামীর উপার্জন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তিনি সরকারের কাছে চাকরির ব্যবস্থা এবং স্বামী হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের দাবি জানান।

যেভাবে প্রাণ হারান বুলেট :

বুলেট বৈরাগী চট্টগ্রামের কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট ট্রেনিং একাডেমিতে ৪৪তম বুনিয়াদি প্রশিক্ষণ শেষে গত ২৪ এপ্রিল রাতে বাসে কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হন। ওই দিন গভীর রাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার ঝাগুরজুলি এলাকায় বাস থেকে নামার পর ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন তিনি।

পরদিন ২৫ এপ্রিল সকালে ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানা-পুলিশ সদর দক্ষিণ উপজেলার মহাসড়কের বাতাবাড়িয়া এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনের কাছে পড়ে থাকা অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করে। পরে পরিবারের সদস্যরা মরদেহটি বুলেট বৈরাগীর বলে শনাক্ত করেন।

পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, ছিনতাইকারীরা তাঁর টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেয়। এ ঘটনায় বুলেটের মা লিলিমা বৈরাগী বাদী হয়ে সদর দক্ষিণ মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মামলা করেন। পরে র‍্যাব তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় আসামিদের শনাক্ত করে গ্রেপ্তার করে।

পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র :

ডিবি পুলিশ এ হত্যা মামলায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। তাঁরা হলেন কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার নাওতলা গ্রামের মো. সোহাগ (৩৪), আদর্শ সদর উপজেলার ধর্মপুর এলাকার ইসমাইল হোসেন জনি (২৮), আমড়াতলী গ্রামের এমরান হোসেন ওরফে হৃদয় (৩৪), আড়াইওরা গ্রামের রাহাত হোসেন জুয়েল (২৭) এবং ধর্মপুর এলাকার মো. সুজন (৩২)। পুলিশ জানিয়েছে, তাঁরা বর্তমানে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আলম শাহ জানান, গ্রেপ্তার পাঁচ আসামি আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টাকা ও মুঠোফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রীবেশে ছিনতাইকারীরা বুলেট বৈরাগীর সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন। একপর্যায়ে ধস্তাধস্তির সময় তাঁকে অটোরিকশা থেকে ফেলে দেওয়া হয়। এতে মাথায় আঘাত পেয়ে তাঁর মৃত্যু হয়।

বুলেট বৈরাগীর মা ও মামলার বাদী লিলিমা বৈরাগী বলেন, ডিবি পুলিশ তাঁকে অভিযোগপত্র দাখিলের বিষয়টি জানিয়েছে। তিনি বলেন, “আমার সন্তানকে তো আর ফিরে পাব না। বুলেটের শিশুটিও কম বয়সে বাবাকে হারিয়েছে, বউটিও বিধবা হলো। যারা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে, তাদের কঠোর শাস্তি দেখতে চাই।”

কুমিল্লার আদালতের পুলিশ পরিদর্শক মো. সাদেকুর রহমান জানান, ডিবি পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে বিচারের জন্য মামলাটি জেলা ও দায়রা জজ আদালতে পাঠিয়েছেন।

স্বামী হত্যার ঘটনায় অভিযোগপত্র দাখিলের পর বিচারপ্রক্রিয়া এগোলেও উর্মি হীরার চাকরি ও সহায়তার অপেক্ষা শেষ হয়নি। স্বামী হারানোর শোকের সঙ্গে এখন প্রতিদিনের সংসার চালানো ও সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার কঠিন লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে তাঁকে।