সময় তখন রাত প্রায় নয়টা কিংবা সাড়ে নয়টা হবে।নীল সাগরের ছোট শহর নীলফামারীর আকাশে রাত নেমে এসেছে, কিন্তু ডিবি কার্যালয়ের ভেতরে অদ্ভুত এক চাপা উত্তেজনা যেন বাতাসও কথা বলতে ভুলে গেছে। আমাকে ও সহকর্মী তরুণকে যৌথভাবে আবার হাতকড়া পরিয়ে পুলিশ সুপার এ.এফ.এম. তারেক হোসেন খানের কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো।
কিছুক্ষণ আগেও যাঁকে একজন মানুষ নয়, বরং কেবলই একজন ক্ষমতাধর পুলিশ হিসেবে দেখেছি, এখন তাঁর মুখোমুখি দাঁড়াতে যাচ্ছি। কক্ষে ঢোকার আগে তরুণের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু স্বরে বললাম, “তুমি কোনো কথা বলবে না। যা বলার, আমিই বলব।”
আমার জীবনের দীর্ঘ সাংবাদিকতা পথচলার অভিজ্ঞতা তখন চোখের সামনে ভেসে উঠছিল। ১৯৯৪ সাল থেকে ২০২৫ সালের ২৭ জুন এই দীর্ঘ সময়ে অসংখ্যবার কুমিল্লার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে গিয়েছি। বিচ্ছিন্ন দু-একটি ঘটনা বাদ দিলে কখনো চা না খেয়ে, সৌজন্যতা ছাড়া ফিরতে হয়নি। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে যতটুকু সম্মান পাওয়ার কথা, ঠিক ততটুকুই মহান রব আমাকে দিয়েছেন।
কিন্তু আজ এই প্রথম একটি জেলার পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আমি দাঁড়িয়ে আছি হাতকড়া পরা অবস্থায়। কুৎসিত, কদাকার ষড়যন্ত্রকারীদের বানানো মিথ্যা কল্পকাহিনীর ওপর ভর করে আমাকে অপরাধীর কাতারে দাঁড় করানো হয়েছে।
এই বইয়ে, মহান আল্লাহকে সাক্ষী রেখে আমি বলছি, যারা তথাকথিত ‘হলুদ’ কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাংবাদিকতা করে আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছে, আমার দ্বারা তারা কখনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। আমি তাদের সঙ্গে চলিও না, তারা আমার বন্ধু নয়, আবার আমার ব্যক্তিগত শত্রুও ছিল না। তবু অদৃশ্য কোনো অশুভ শক্তির ইশারায় তারা আমাকে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি করছে।
এই অধ্যায়ে আমি পাঠকের সামনে এমন একজন পুলিশ সুপারকে উপস্থাপন করতে চাই, যাঁকে দেখে পাঠক নিজেই সিদ্ধান্ত নেবেন, তিনি মানুষ ছিলেন, না কেবলই পুলিশ। কারণ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি,সব পুলিশ মানুষ হয়েই পুলিশে যোগ দেন; কিন্তু দুঃখজনকভাবে সবাই পুলিশে যাওয়ার পর মানুষ হয়ে থাকতে পারেন না।
কক্ষে ঢুকতেই একজন দাগি আসামিকে যেমনভাবে দাঁড় করানো হয়, আমাদেরও ঠিক তেমনভাবেই দাঁড় করানো হলো। মুহূর্তের মধ্যেই নিজের ভেতর এক অদ্ভুত দৃঢ়তা অনুভব করলাম। মনে মনে স্থির করলাম, সারা পৃথিবী তোলপাড় হয়ে গেলেও কেউ আমার বিরুদ্ধে একটি সাধারণ ডায়েরির কপিও দেখাতে পারবে না। দেশের প্রচলিত আইনে আমাকে ন্যূনতম অপরাধী সাব্যস্ত করার মতো কোনো কাজ আমি করিনি। সুতরাং আইনের চোখে আমাকে হয়রানি ছাড়া আর কিছুই করা সম্ভব নয়। তাই যা বলব, চোখে চোখ রেখে বলব ইনশাআল্লাহ।
হঠাৎ করেই পুলিশ সুপার এ.এফ.এম. তারেক হোসেন খান গর্জে উঠলেন। গালাগালির সঙ্গেই হুঙ্কার দিয়ে বললেন,
“আমি যা জিজ্ঞেস করব, সোজা সোজা উত্তর দিবি। না হলে এমন মামলা দিব, জীবনেও বের হতে পারবি না।”
আমি কেবল বলার চেষ্টা করলাম, “স্যার”
কিন্তু ‘স্যার’ শব্দটি তাঁর কানে পৌঁছানোর আগেই আবার গালি ছুড়ে দিয়ে বললেন,
“তোর কোনো কথা শুনব না। শুধু আমি যা জিজ্ঞেস করব, তারই উত্তর দিবি।”
বললাম, “ঠিক আছে স্যার, বলেন।”
এই কথা বলার পর তিনি আরও উত্তেজিত হয়ে পাশে থাকা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলামসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“দেখছো, শালার সাহস কত!” এরপর একে একে চারটি প্রশ্ন ছুড়ে দিলেন । যেগুলো কুমিল্লা থেকে পাঠানো কিছু কুখ্যাত হলুদ ও বিপথগামী সাংবাদিকদের বানানো অভিযোগের হুবহু প্রতিলিপি।
অভিযোগগুলো ছিল,
১. আমি নাকি কুমিল্লায় আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতা।
২. আমি নাকি সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব নাঈমুল ইসলাম খানের ব্যক্তিগত পিএস।
৩. আমি নাকি কুমিল্লা সদর আসনের সাবেক এমপি বাহাউদ্দিন বাহার ও সাবেক মেয়র ডা. তাহসিন বাহার সূচনাকে ভারতে পালাতে সহযোগিতা করেছি।
৪. আমি নিজেও নাকি সীমান্ত দিয়ে ভারতে পালানোর উদ্দেশ্যে নীলফামারীতে এসেছি।
এমনকি আমি অতীতে এপেক্স ক্লাব, বাপা, নাটাব, সুইড বাংলাদেশসহ বিভিন্ন জাতীয় সামাজিক সংগঠনের যে কর্মসূচিগুলো করেছি, সেখানে উপস্থিত অতিথিরা নাকি সবাই আওয়ামী লীগের কর্মী আর সেই সূত্রে আমিও নাকি তাদের দোসর!
নীলফামারীতে আসার কারণ জানতে চাইলে আমি বিনয়ের সঙ্গে সব ব্যাখ্যা দিলাম। বললাম,
“আপনি কুমিল্লায় খোঁজ নিন। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিএনপি, জামায়াত, সবার সঙ্গে কথা বলুন। দেখুন আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের কোনো ভিত্তি আছে কি না।”
আমি তাকে অনুরোধ করলাম, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে ‘আমাদের কুমিল্লা’ পত্রিকা ও ‘কুমিল্লার জমিন’ অনলাইন পোর্টালের ভূমিকা আমার মোবাইল ফোনে যাচাই করে দেখতে।
আমি স্পষ্ট করে বললাম, আমি কোনো রাজনৈতিক দল করি না। তবু কুমিল্লার নব্বই শতাংশ মানুষ মনে করে আমি বিএনপি-ঘেঁষা সাংবাদিক, কারণ আমার লেখায় ডানপন্থি রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিফলন পাওয়া যায়। পেশাদার সাংবাদিক হিসেবে আমি দলীয় পরিচয় বহন না করলেও আমার কলমের একটি অবস্থান আছে এটা লুকানোর কিছু নয়।
সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় হলো, পুলিশ সুপার নিজেই প্রশ্ন করে আবার আমার উত্তরের জন্য অপেক্ষা না করেই আমাকে গালাগালি শুরু করেন। অথচ উত্তর দিতে গেলেই আবার উত্তেজিত হয়ে উঠছিলেন। একপর্যায়ে নিজের সাহস নিজেই সঞ্চয় করে গলার স্বর একটু উঁচু করে বললাম,
“স্যার, আমি তো এখন আপনার হেফাজতে। আপনি যা ইচ্ছা বলতে পারেন, করতে পারেন। কিন্তু আপনি আমাকে যে চারটি প্রশ্ন করেছেন, তার একটিরও যদি এক শতাংশ প্রমাণ করতে পারেন, তাহলে এখনই আমাকে ক্রসফায়ারে দিয়ে দিন।”
আমি বললাম, “আমি কুমিল্লা জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সদস্য। আপনি জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, বিজিবি, র্যাব, ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিএসবি যে কোনো পর্যায়ে যোগাযোগ করুন। তাদের মধ্যে একজনও যদি বলে আমি আপনার অভিযোগ গুলোর সঙ্গে জড়িত, আমি আপনার দেওয়া সব শাস্তি মাথা পেতে নেব।”
কিন্তু আমার কোনো কথার জবাব না দিয়ে আবার চিৎকার করে বললেন,
“এই শালা, তুই নীলফামারী সীমান্তে কেন গিয়েছিস?” আমি ডিবির এসআই জাকির হোসেনের দিকে ইশারা করে বললাম, “আপনার পুলিশ আমাদের হোটেল থেকে ধরে এনেছে। সীমান্তের কথা আসছে কোথা থেকে?”
এই সময় সহকর্মী তরুণ মুখ খুলল। বলল, “স্যার, আমরা পঞ্চগড় যাওয়ার জন্য কুমিল্লা থেকে রওনা হয়েছিলাম। ঘটনাচক্রে নীলফামারী নামতে হয়েছে।” সে আরও বলল, নীলফামারীতে এসে আমি ‘কুমিল্লার জমিন’-এ কয়েকটি লাইভ করেছি। কথা শেষ হওয়ার আগেই তরুণকে আরও ভয়াবহ গালিসহ ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপ কর! তুই তার সহযোগী।”
আমার দিকে আঙুল তুলে বললেন, “সে হচ্ছে কুমিল্লার নাম্বার ওয়ান ক্রিমিনাল।”
এরপর তিনি আমাকে একের পর এক ছবি দেখাতে শুরু করলেন, নাঈমুল ইসলাম খান ভাইয়ের সঙ্গে আমার ছবি, সাবেক মেয়র ডা. তাহসিন বাহার সূচনাকে আমার মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গ্রন্থ ‘শরণার্থীদের যুদ্ধজীবন–১৯৭১’ উপহার দেওয়ার ছবি, এমনকি বঙ্গবন্ধুর বিকৃত ছবির বিষয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে করা আমার একটি ভিডিও।
আমি প্রতিটি ছবির ব্যাখ্যা দিতে গেলেই তিনি ধমক দিয়ে থামিয়ে দিচ্ছিলেন। একপর্যায়ে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ.বি.এম. ফয়জুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন, “কিছু পাইলা?”
ফয়জুল ইসলাম সাহেব মাথা নেড়ে ‘না’ সূচক উত্তর দিলেন।
সে মুহূর্তে লক্ষ করলাম অতিউৎসাহী, প্রভাবিত হয়ে আসা পুলিশ সুপারের মুখটা হঠাৎ করেই মলিন হয়ে গেল। যেন কোথাও তাঁর সাজানো অভিযোগের দেয়ালে প্রথম ফাটল ধরল।