শাহাজাদা এমরান রচিত ‘নীলফামারী ও আমার দায়’ আমাকে বের করে দেওয়া হলো : তরুণের পরীক্ষা ও সাহসের প্রত্যাবর্তন

ধারাবাহিক সিরিজ, মূল পাণ্ডুলিপি থেকে-৯
স্টাফ রিপোর্টার
প্রকাশ: ৩ ঘন্টা আগে

আমার মোবাইল ফোন ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর নিয়ে পুলিশ সুপার এ.এফ.এম. তারেক হোসেন খানের কক্ষ যেন এক অস্থায়ী প্রযুক্তি ল্যাবে পরিণত হলো। চারদিকে চার-পাঁচটি ল্যাপটপ, একের পর এক ডাটাবেসে ঢুকে পড়ছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। চোখে মুখে তাদের একাগ্রতা কিন্তু ফল শূন্য। ঘণ্টার পর ঘণ্টা খোঁজ করেও আমার বিরুদ্ধে একটি শরিষা পরিমাণ ক্লু পর্যন্ত বের করতে না পারায়, মহান আল্লাহর অশেষ রহমত ও প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)–এর উসিলায়, এই প্রথমবারের মতো কিছুটা হলেও হোঁচট খেলেন পুলিশ সুপার তারেক।
ক্ষমতার গলায় তখন চাপা বিরক্তি। হঠাৎ করেই তিনি ডিবির এসআই জাকির হোসেনের দিকে তাকিয়ে সংক্ষিপ্ত নির্দেশ দিলেন“ওকে (শাহাজাদা এমরান) বাইরে নিয়ে যাও। ও( তরুণ) থাকুক।
এতক্ষণ আমি ও তরুণ একই হ্যান্ডকাফে যৌথভাবে বাঁধা ছিলাম। এবার সেই হাতকড়া আলাদা করা হলো। আমাকে কক্ষের বাইরে বের করে এনে পুলিশ সুপারের দরজার ঠিক পাশেই দাঁড় করিয়ে রাখা হলো। দরজার ভেতরে রইল তরুণ একাকী, নিঃসঙ্গ, অথচ একটি ভয়ংকর পরীক্ষার মুখোমুখি।
ভেতরে তখন অন্য এক দৃশ্য। পুলিশ সুপার তারেক সরাসরি তরুণকে লক্ষ্য করে বললেন,
“আমি যেভাবে বলব, তুই যদি সেভাবে শাহাজাদা এমরানের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিস, তাহলে তোকে ছেড়ে দেব। বল সাক্ষী দিবি কি না?”
এই প্রশ্নটি ছিল কেবল একজন তরুণ সাংবাদিকের উদ্দেশে ছোড়া হুমকি নয়; এটি ছিল একটি মানুষকে ভেঙে ফেলার রাষ্ট্রীয় কৌশল, একটি মিথ্যাকে সত্য বানানোর চূড়ান্ত প্রচেষ্টা।
আমি বাইরে দাঁড়িয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না, কিন্তু প্রতিটি শব্দ যেন দরজার ফাঁক গলে আমার কানে এসে আঘাত করছিল। কয়েক মিনিট আগেও যে তরুণ ভীত ছিল, আতঙ্কে কাঁপছিল ঠিক সেই তরুণই হঠাৎ যেন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করল। দৃঢ় কণ্ঠে, এক ফোঁটা দ্বিধা ছাড়াই সে পুলিশ সুপারের মুখের ওপর বলে উঠল, “শাহাজাদা এমরান আমার বন্ধু, বস। তিনি আমাকে সাংবাদিক বানিয়েছেন। আমি তাঁর বিরুদ্ধে এত বড় মিথ্যা সাক্ষ্য দিতে পারব না। জেল খাটতে হলে আমরা দু’জন একসঙ্গেই খাটব।”
এই একটি বাক্যেই মুহূর্তের মধ্যে পাল্টে গেল সমীকরণ। ভয়ের জায়গায় জন্ম নিল সাহস। সুবিধাবাদের জায়গায় দাঁড়াল নৈতিকতা। ষড়যন্ত্রকারীদের সাজানো ছক প্রথমবারের মতো বড় ধরনের বাধার মুখে পড়ল।

এই দৃশ্যের কথা পরে জানতে পেরে আমি বুঝেছিলাম মানুষের বিবেক যখন জেগে ওঠে, তখন রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুর পরিকল্পনাও থমকে দাঁড়ায়।
পুলিশ সুপার তখন বুঝতে পারলেন, কোনোভাবেই আমাকে এই তরুণের মাধ্যমে জড়ানো সম্ভব নয়। তাঁর চোখে-মুখে তখন স্পষ্ট হতাশা। দীর্ঘ সময় ধরে তৈরি করা মিথ্যার কাঠামো ভেঙে পড়ছে একের পর এক।
শেষ পর্যন্ত, সম্ভবত রাত সাড়ে নয়টা বা দশটার দিকে, কিছুটা ক্লান্ত ও ক্ষুব্ধ মন নিয়ে তিনি কার্যালয় ছেড়ে বাসার উদ্দেশে রওনা হলেন। যাওয়ার আগে ডিবির কর্মকর্তাদের কড়া নির্দেশ দিয়ে গেলেন, “রাতে আরও ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ চলবে।” পুলিশ সুপারের ভাষ্য এমন, যে করেই হোক শাহাজাদা এমরানকে ফাঁসাতে হবে। অথচ, এই পুলিশ সুপারের সাথে জীবনেও আমার দেখা,সাক্ষাত কিংবা পরিচয় নেই। তিনি কেন যে আমাকে ফাঁসানোর জন্য আপোষহীন ভূমিকা নিলেন তা এক মাত্র তিনি এবং মহান আল্লাহই ভালো জানবেন।
নির্দেশ দিয়ে পুলিশ সুপার চলে গেলেন, কিন্তু রেখে গেলেন এক দীর্ঘ রাত, অনিশ্চয়তা আর অপেক্ষার ভার। তবে সেই রাতের অন্ধকারে একটি আলো জ্বলে উঠেছিল একজন তরুণ সাংবাদিকের অটল সততা ও সাহসের আলো, যা ষড়যন্ত্রের অন্ধকারকে পুরোপুরি গ্রাস করতে দেয়নি। এখানে সহকর্মী তরুণকে ধন্যবাদ দিতে হয়।
জীবনে প্রথম পুলিশ হেফাজতে রাত : অচেনা এক দীর্ঘ অন্ধকার
পুলিশ সুপার তারেক হোসেনের প্রস্থান করার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্তিমিত হয়ে এলো। উচ্চস্বরে ধমক, উত্তেজনা আর দম্ভের যে ঝড় বয়ে গিয়েছিল, তার রেশ তখনও বাতাসে ভাসছে। সেই নীরবতার ভেতরেই ডিবি নীলফামারীর কর্মকর্তারা আমাদের দু’জনকে রাত কাটানোর জন্য কার্যালয়ের একটি বড় কক্ষে নিয়ে গেলেন। এটি কোনো সেল নয়, আবার পুরোপুরি ঘরের মতোও নয় রাষ্ট্রের হেফাজতে থাকা এক অচেনা আশ্রয়।
মোবাইল ফোন আমাদের কাছ থেকে আগেই নেওয়া হয়েছিল। তবে আমাদের ব্যবহৃত ব্যাগ দুটি আমাদের হাতে তুলে দিয়ে ডিবির এসআই জাকির হোসেন স্বাভাবিক কণ্ঠে বললেন, “আপনারা কাপড়চোপড় বদলে নেন। যা হওয়ার, সকালে হবে। কোনো দুশ্চিন্তা করবেন না।”
এই একটি বাক্যেই যেন দীর্ঘ দিনের ক্লান্তি একটু হালকা হলো। মানুষটি দায়িত্বের বাইরে গিয়ে মানুষ হিসেবেই কথা বললেন,পুলিশ হিসেবে নয়,এটুকুই তখন বড় প্রাপ্তি।
কিছুক্ষণ পর ডিবির মুন্সী এসে হাজির হলেন। বয়সে ও আচরণে তিনি ভদ্রতার প্রতিমূর্তি। এসে খুব স্বাভাবিকভাবেই জানতে চাইলেন, আমরা কী খাব। এই প্রশ্নটি তখন অপ্রত্যাশিতভাবে মানবিক মনে হলো। কারণ এতক্ষণ আমরা ছিলাম কেবল ‘আটককৃত’, এখন প্রথমবারের মতো ‘মানুষ’ হিসেবে জিজ্ঞাসিত হলাম।
তরুণ বলল, সে ভাত খাবে।
আমি বললাম, সম্ভব হলে রুটি বা পরোটা।
কিছু সময় পর খাবার এসে গেল। তরুণের জন্য ছিল ভাত, মাছ, আলুর ভর্তা আর ডাল। আমার জন্য ছিল দুইটি আটার রুটি ও এক বাটি ডাল। পুলিশ হেফাজতের ভেতর এই সাধারণ খাবারটুকুও সেদিন আমার কাছে অস্বাভাবিক রকমের স্মরণীয় মনে হয়েছিল।কারণ এটি এসেছিল কোনো অবহেলা বা অবজ্ঞা ছাড়া।
ঘুমানোর ব্যবস্থাও তারা নিজেরাই করে দিলেন। আমাদের দু’জনের জন্য আলাদা দুটি কম্বল পেতে দেওয়া হলো। সঙ্গে দুটি বালিশ ও দুটি কাঁথা। সবকিছু নিঃশব্দে, কোনো বাড়তি কথা ছাড়া। সেই মুহূর্তে বুঝলাম, একই পোশাকের ভেতরেও মানুষ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।
এরপর আমরা দু’জন আলাদা আলাদা করে এশার নামাজ আদায় করলাম। দিনের সমস্ত অস্থিরতা, অপমান আর অনিশ্চয়তার ভার যেন সিজদার ভেতর কিছুটা নামিয়ে রাখা গেল। আল্লাহর কাছে তখন আর কোনো অভিযোগ ছিল না। ছিল কেবল শক্ত থাকার এবং মুক্তির দোয়া।
হোটেল থেকে শুরু করে এই মুহূর্ত পর্যন্ত একটি বিষয় আমি বারবার লক্ষ করছিলাম। তা হলো, তরুণ নিঃশব্দে চোখের পানি মুছছে বার বার। সে প্রকৃতিগতভাবেই নরম মনের মানুষ। এই ধরনের পরিস্থিতির জন্য সে মানসিকভাবে প্রস্তুত ছিল না। তাকে দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, ভয় সে লুকাতে পারছে না। আমি তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বললাম,“তুমি যেহেতু আমার সঙ্গে এসেছ, যদি কোনো মামলা হয়ও ,চিন্তা করবে না। সব দায়িত্ব, সব খরচ আমার।” এই কথাটুকু বলার পর লক্ষ করলাম, তার মুখের চাপা উদ্বেগটা কিছুটা হলেও নরম হলো। সে নিশ্চুপ হয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। হয়তো প্রথমবারের মতো সে বিশ্বাস করতে পারল, এই অন্ধকার রাতে সে একা নয়। রাত সাড়ে এগারোটার দিকে তরুণ ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে পড়ল। পুলিশের কার্যালয়ের সেই অচেনা কক্ষে, অচেনা বিছানায়, অচেনা এক বাস্তবতায় তার নিঃশ্বাস তখন গভীর ও স্থির।
আর আমি?
আমি তখনও জেগে ছিলাম। জীবনে এই প্রথম পুলিশ হেফাজতে একটি রাত কাটাতে যাচ্ছি,এই সত্যটাই যেন ঘুমকে দূরে ঠেলে রাখছিল। নীরবতার ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা সেই রাত আমার জীবনের গল্পে এক নতুন, অমোচনীয় অধ্যায়ের সূচনা করছিল।চলবে।