বর্তমান পরি¯ি’তিতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে যেসব অভিযোগ উঠেছে, তার একটি অংশ বাস্তব সমস্যা ভিত্তিক । কিš‘ অভিযোগগুলোর অনেকগুলো একতরফা, অতিরঞ্জিত এবং প্রেক্ষাপট বিবর্জিত। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, এই অভিযোগগুলো যাচাই করার জন্য কিছু মূল প্রশ্ন এবং যুক্তি সামনে আনা জরুরি।
১. সময়কাল: এক বছরেরও কম সময় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিকে বহু বছরের সমস্যার দায়ে অভিযুক্ত করা কতটা ন্যায্য? অধ্যক্ষ এই কলেজে দায়িত্ব নিয়েছেন এখনো এক বছর হয়নি।
অথচ শিক্ষার্থীদের উল্লেখ করা জলাবদ্ধতা, ক্যান্টিন বন্ধ, বাস সংকট, বহিরাগতদের আধিপত্য এসব সমস্যা বহু বছরের পুরনো। পূর্ববর্তী প্রশাসন বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো এসব সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজ অব¯’ার অবনতি ঘটেছে।
একজন নতুন অধ্যক্ষকে এত কম সময়েই দায়ী করা এবং পদত্যাগে বাধ্য করা এক ধরনের অবিচার।
২. বাস্তবতা: সব সমস্যার সমাধান কি একজন অধ্যক্ষ একাই করতে পারেন? নিরাপত্তা, সিসি ক্যামেরা, বাস, ক্যান্টিন বা জলাবদ্ধতা এসব সমাধানে অধ্যক্ষকে একা সিদ্ধান্ত নিয়ে বাস্তবায়ন করার সুযোগ নেই। সরকারি কলেজে এসব বিষয়ে বরাদ্দ, মন্ত্রণালয় অনুমোদন, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সমন্বয় প্রয়োজন হয়। অধ্যক্ষ ইতিমধ্যে একাধিকবার দপ্তরে চিঠিপত্র, প্রকল্প প্রস্তাব এবং বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা চালিয়েছেন। তাহলে প্রশ্ন আসে উদ্যোগ নি”েছন কিনা?
উত্তর: হ্যাঁ, তিনি নি”েছন। কিš‘ বাস্তবায়নে সময় লাগছে, সেটি প্রশাসনিক বাস্তবতা।
৩. আলোচনা ও সংলাপের প্রতি তার মনোভাব কি বিরূপ ছিল?
শিক্ষার্থীরা রোডম্যাপ দিলে অধ্যক্ষ তা গ্রহণ করেছেন।
তিনি আলোচনায় বসেছেন, যা অনেক সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেখা যায় না।
তাই বলা যায় না যে তিনি “অসহযোগিতামূলক” আচরণ করেছেন। বরং কিছু শিক্ষার্থী আলোচনাকে ঘিরে আন্দোলনের রণনীতিতে চলে যায়, যা অগ্রহণযোগ্য।
৪. বহিষ্কারের ভয়, অপমান ইত্যাদি অভিযোগ কতটা তথ্যভিত্তিক?
প্রশাসনিক বিধিনিষেধ ভাঙলে অধ্যক্ষ ছাত্রকে সতর্ক করতে পারেন তাতে নিয়ম মেনে চলার বার্তা যায়। অভিভাবক ডেকে সতর্ক করা যদি অপমান হয়, তাহলে শৃঙ্খলা রক্ষা কীভাবে হবে?
কোনো নির্দিষ্ট অপমান বা বেআইনি হুমকির প্রমাণ নেই। শুধুমাত্র আবেগ থেকে বলা হয়েছে।
৫. তিনি একক সিদ্ধান্ত নি”েছন এই অভিযোগের যৌক্তিকতা কতটুকু?
প্রশাসনিক ব্যব¯’ায় কখনো কখনো দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হয়। অধ্যক্ষ যদি এককভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন, সেটি সর্বত্র খারাপ নয়। তার একক সিদ্ধান্তে যদি প্রতিষ্ঠান চলমান থাকে, তাহলে তা আপত্তির বিষয় নয়, শর্ত একটাই, স্ব”ছতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে। শেষ বক্তব্য! দোষারোপ নয়, সমাধান চাই।
অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে কিছু বাস্তব সমস্যা তুলে ধরা হয়েছে ঠিকই, কিš‘ সমস্যাগুলোর অধিকাংশ তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে, তার দায়িত্ব গ্রহণের সময়কাল খুবই অল্প, এবং তিনি আলোচনা, সমন্বয়, বাস্তবায়নের চেষ্টা করে যা”েছন এমন প্রমাণ পাওয়া যা”েছ। তাই, আমরা যদি ন্যায়বিচার চাই, দায়িত্বশীল প্রশাসন চাই, তাহলে একজন সদ্য-নিযুক্ত, আগ্রহী ও আলোচনাপ্রবণ অধ্যক্ষকে সময় ও সুযোগ দেওয়া উচিত। মিডিয়ার প্রতি আমাদের আন্তরিক আহ্বান
আমরা জানি, মিডিয়া হলো জাতির বিবেক, সমাজের আয়না। আপনারাই পারেন সত্য তুলে ধরে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে, আবার আপনারাই পারেন ভুল ব্যাখ্যা বা অপূর্ণ তথ্য দিয়ে পরিবেশকে উত্তপ্ত করে তুলতে।
১) আপনারা যেন একপাক্ষিক অভিযোগ বা আবেগ নির্ভর বক্তব্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভকে উসকে না দেন।
২) অধ্যক্ষ বা কলেজ প্রশাসনের দিকটি সমান গুরুত্বে, তথ্যভিত্তিক ও যাচাই করে উপ¯’াপন করেন।
৩) এমনভাবে সংবাদ প্রচার করেন, যাতে সত্য উন্মোচিত হয়, গুজব নয়।
৪) আপনারা যেন এমন ভাষা ও ভঙ্গি পরিহার করেন যা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে হেয় বা অ¯ি’র করে তোলে।
একজন সদ্যযোগদানকৃত অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে পুরনো সমস্যাগুলোর দায় চাপিয়ে, গণচাপ তৈরি করে, যেকোনো সিদ্ধান্তে ঠেলে দেওয়া মানে অন্যায়কে ন্যায়ের মুখোশ পরানো। এতে প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আমরা চাই :
ন্যায্য অভিযোগের স্ব”ছ তদন্ত,
সমাধানমুখী আলোচনা,
আর একজন অধ্যক্ষকে কাজ করার পর্যাপ্ত সুযোগ।
অন্যথায়, বারবার প্রশাসনিক বদলি আর আন্দোলনের চক্রে পড়ে শিক্ষার পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
লেখক : বিশিষ্ট আইনজীবী,বাংলাদেশ সপ্রিম কোর্ট ও জজ কোর্ট কুমিল্লা।