অপ চিকিৎসায় রোগীদের মৃত্যু,সন্তান হারা মায়েদের আহাজারি ও জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের ভূমিকা-শাহাজাদা এমরান

সময়ের কথা
শাহাজাদা এমরান
প্রকাশ: ১০ মাস আগে

একজন শিক্ষার্থী যখন চিকিৎসক হওয়ার মানসে মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় তখন সংশ্লিষ্ট কলেজের অধ্যক্ষ প্রথমেই তাদের একটি শপথবাক্য পাঠ করান। শপথের অনেক গুলো কোড অব ইথিকছের মধ্যে মূল একটি বাক্যের সহজ সারমর্ম হলো, আমি চিকিৎসক হওয়ার পর আমার সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে রোগিদের জীবন বাঁচানো। নিজের সর্বোচ্চটুকু ব্যয় করে হলেও একজন রোগির স্বার্থে সব কিছু করব। রোগির জীবনের স্বার্থে নিজের আবেগকে বিসর্জন দিতেও দ্বিধা করব না। অথচ, আমাদের নগর কুমিল্লাসহ জেলার সর্বত্র চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ প্রতিনিয়তই পাওয়া যাচ্ছে।
গত ১৮ দিনের ব্যবধানে কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার ফায়ার সার্ভিস সংলগ্ন একই সাথে লাগায়ো দুটি হাসপাতালে দুই জন শিশু অকালে জীবন হারায়। ঐ শিশু দুটির পরিবারের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অর্থের বিনিময়ে রফা দফা করে ফেলে। গণমাধ্যমের কর্মীরা জেলা স্বাস্থ্য বিভাগকে ফোন করলে নামকাওয়াস্তে একটি বক্তব্য দেওয়া ছাড়া কার্যকর আর কোন পদক্ষেপই গ্রহন করে না।
এ দিকে সন্তান হারা মা-বাবা, স্বামী হারা স্ত্রী কিংবা স্ত্রী হারা স্বামীর বুক ফাটা গগনবিধারী কান্নার আওয়াজ আকাশ বাতাস প্রকম্পিত হলেও হৃদয়ে নূন্যতম কম্পন ধরে না তাদের,যাদের সামান্য একটু ভুমিকাতেই বন্ধ হতে পারে ভুল চিকিৎসায় রোগির মৃত্যুর মিছিল। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ কি পারে না কঠোর হস্তে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠা এই সকল মৃত্যুর কূপ হাসপাতাল গুলোর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নিতে। জেলা সিভিল সার্জনের কাজটা কি , সেমিনার,সিম্পোজিয়াম,সভা করে বেড়ানো ? আর কালে ভাদ্রে লোক দেখানো কতিপয় অকার্যকর অভিযান করা।

গত ১৮ দিনের ব্যবধানে নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার একসাথে লাগায়ো দুটি হাসপাতাল তিতাস ও আল নূরে দুটি শিশু চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় মারা যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে সংশ্লিষ্ট পরিবার গুলোর কাছ থেকে। এর সর্বশেষ অভিযোগটি আসে গত ২ সেপ্টেম্বর শনিবার আল নূর হাসাপাতালের বিরুদ্ধে।
অভিযোগে জানা যায়, গত ৭ আগস্ট ২০২৩ প্রসূতি সাবিনা ইয়াসমিন বিথির প্রসববেদনা উঠলে তাকে নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার তিতাস মেডিকেল সেন্টার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ওইদিন গাইনি চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া ডা.তাসলিমা রিজভী লাইলী ও তার সহযোগীসহ পাঁচ জন মিলে ওই হাসপাতালে প্রথমে প্রসুতির সিজার অপারেশন করেন, এতে প্রসূতির গর্ভের সন্তান মারা যায়। একপর্যায়ে প্রসূতির পেটে বড়ো দুইটি টিউমার আছে বলে তারা আরও একটি অপারেশন করেন। এতে ১৬ ব্যাগ রক্ত দিয়েও ভুক্তভোগী বিথির রক্তক্ষরণ বন্ধ হয়নি। পরে চরম সংকটাপন্ন অবস্থায় প্রসূতিকে নগরীর অন্য একটি হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

তিতাস মেডিকেল সেন্টারে ভুয়া চিকিৎসকের মাধ্যমে সিজারে নবজাতকের মৃত্যু ও মায়ের জরায়ু কাটার অভিযোগে প্রসূতির স্বামী বাদী হয়ে গত ১৬ আগস্ট ৫ জনের নামে অতিরিক্ত চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা করেছে।
আর এর আগে রোববার (৩ সেপ্টেম্বর) দুপুরে সরেজমিনে গিয়ে জানা যায়, শনিবার (২ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০ টায় তানিয়া আক্তার এবং সবুজ মিয়া ছেলের প্রস্রাবের রাস্তার সমস্যা নিয়ে কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাও আল-নূর হসপিটালে ভর্তি হন। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করলে সমস্যা ঠিক হয়ে যাবে। তাই অপারেশনের জন্য রাত ৮ টায় ওটিতে নিয়ে যায় ডাক্তার। কন্ট্রাক হয় ২৫ হাজার টাকা। অপারেশনের দায়িত্বে থাকা ডাক্তার দেবাশীষ চক্রবর্তী একটি ইনজেকশন দিলে শিশু নূর মোহাম্মদ আস্তে করে চোখ বন্ধ করে ফেলে আর চোখ মেলেনি। রাত সাড়ে নয়টায় ডাক্তার জানায় শিশু নূর মোহাম্মদ মারা গেছে।
এ ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে দৈনিক আমাদের কুমিল্লায় ৪ সেপ্টেম্বর সোমবার প্রকাশিত রিপোর্ট থেকে জানা যায়, নিহত শিশুর পরিবারের দারিদ্রতার সুযোগ নিয়ে মাত্র দেড় লক্ষ টাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আপোষ মিমাংসা করে। একটি জীবনের দাম কি শুধুই দেড় লক্ষ টাকা।
আমাদের দেশের থানা পুলিশ যেমন একটি মুখস্ত কথা বলে অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখব। ঠিক ইদানিং জেলা স্বাস্থ্য বিভাগও তোতা পাখির সেই বুলি আওড়াতে বেশ পারদর্শিতা দেখাতে পারছে বলে নগরীর সচেতন মহলের অভিমত।
আরে ভাই, প্রকাশ্য দিবালোকে যখন কোন ঘটনা ঘটে তখন কিন্তু পুলিশের কাছে কে অভিযোগ করলো আর না করলো সেটা ধর্তব্যের বিষয় হতে পারে না। পুলিশ তার পেশাগত দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যেমন তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিতে পারে। ঠিক তেমনি চিকিৎসকের ভুল চিকিৎসায় কিংবা হাসপাতালের অবহেলার কারণে যখনি একটা জীবনহানীর মত ঘটনা ঘটে তখনও কিন্তু অভিযোগের বিষয়টি ধর্তব্যের জায়গায় পড়ে না। জেলা সিভিল সার্জন গণমাধ্যম কিংবা যে কোন পর্যায় থেকেই শুনুক না কেন তিনি তাৎক্ষনিক ব্যবস্থা নিতে পারেন বা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা দেখতে পারেন।
কিন্তু গত ৭ আগস্ট এবং ২ সেপ্টেম্বরের ঘটনার পর জেলা সদরের মত জায়গায় এমন দুটি ঘটনা অর্থাৎ মৃত্যুর অভিযোগ বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত হওয়ার পরেও কিন্তু সিভিল সার্জন মহোদয় বা ডেপুটি সিভিল সার্জন সাহেব ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেননি। আমি যেহেতু আইন বিশারধ নই, তাই বিতর্কের খাতিরে মেনে নিলাম, হয়তো স্বাস্থ্য বিভাগের আইনে নেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করার। কিন্তু পেশাদারিত্বের নৈতিকতা কি বলে ?

কুমিল্লা জেলা সিভিল সার্জন জনাব ডা. নাসিমা আক্তার মহোদয়ের কাছে বিনীত অনুরোধ রেখে বলতে চাই, প্লিজ, শুধু সরকারি দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করেই চাকুরির মেয়াদটা শেষ করবেন না। সমাজের মানুষ হিসেবে একজন মানবিক মানুষ হিসেবে সামাজিক দায়িত্বটাও পালন করুন। আপনি যখন আদর্শ সদর উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ছিলেন, আপনাকে আমি তখন থেকেই চিনি এবং কিছুটা হলেও জানি। নি:সন্দেহে একজন সজ্জন ব্যক্তি আপনি। আপনার মধ্যে সহানুভুতি ও বিনয়ী মনোভাবও রয়েছে। সুতরাং কুমিল্লা নগরকবাসীসহ জেলার মানুষ শুধু আশা নয় দৃঢ় ভাবে প্রত্যাশা করে, জেলার প্রথম নারী সিভিল সার্জন হিসেবে আপনি এমন কিছু কাজ করুন, যাতে মানুষ আপনাকে মনে রাখে। যেমন কুমিল্লার মানুষ এখনো সাবেক সিভিল সার্জন ডা. মজিবুর রহমানের কথা মনে রেখেছে।
আপনি নিজ উদ্যোগে এবং দায়িত্ব নিয়ে গোপনে গোপনে জেলা সদরসহ জেলার বিভিন্ন উপজেলার হাসপাতাল গুলো ভিজিট করুন। ঢাক ঢোল পিটিয়ে নয়। তাহলে ব্যাঙ্রে ছাতায় ন্যায় গড়ে উঠা এই হাসপাতাল গুলোর প্রকৃত অবস্থা আপনি অনুধাবন করতে সক্ষম হবেন। অনেক হাসপাতাল এবং ক্লিনিক কিংবা ডায়াগনিষ্ট সেন্টার রয়েছে যাদের যথাযথ কোন অনুমোদন নেই। অনুমোদন না থাকা এই সকল প্রতিষ্ঠানে অনেক কোয়াক ডাক্তার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হিসেবে চিকিৎসা দিয়ে মানুষ মারার কারখানা খুলে বসে আছেন। আবার অনেকে প্রকৃত চিকিৎসক হয়ে খামখেয়ালী করে চিকিৎসা দিতে গিয়ে মানুষ মেরে ফেলেন। আবার অনেক চিকিৎসক রয়েছেন তারা রোগীদের সাথে কসাইয়ের মত আচরণ করেন। আবার বর্তমানে সময়ে এমন অনেক চিকিৎসকও এই নগর তথা জেলায় রয়েছেন, যারা আর্তমানবতার সেবা হিসেবে এই চিকিৎসকের চাকুরিটা করে থাকেন। রোগিদের পরম বন্ধু হিসেবে সেবা দেন। অনেকে ভালো ও মানবিক চিকিৎসক ্আবার অনেক দরিদ্র রোগি থেকে যেমন ভিজিট নেন না আবার নিজের উপহার পাওয়া কোম্পানী থেকে প্রাপ্ত ঔষুধ গুলোও দরিদ্র রোগীদের বিলিয়ে দিয়ে পরম আনন্দবোধ করেন।
সুতরাং আপনি ভালো ডাক্তারদের মূল্যায়ন করুন এবং খারাপদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিন। অবৈধবাবে গড়ে উঠা ক্লিনিক গুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার এখনি সময়।
তিতাস এবং আল নূর হাসপাতালের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় তদন্ত করুন। এর আগে হাসপাতাল গুলোতে আপনি ভিজিট করুন। একজন সিভিল সার্জন যখন একটি হাসপপাতালে ভিজিটে যাবেন তখন কিন্তু এর একটি ইতিবাচক প্রতিক্রিয় দেখা দেবে। এভাবেই একদিন আপনি হয়ে উঠবেন কুমিল্লার গণমানেিষর ভালোবাসার সিভিল সার্জন হিসেবে। মনে রাখবেন চেয়ারে বসে প্রশাসন চালানো যায় কিন্তু মানুষের ভালোবাসা অর্জন করা যায় না। এতএব, সাধু সাবধান।