১৮ জুলাই, ২০২৪। একটি তারিখ, যা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে চিরকাল অমোচনীয় কালিতে লেখা থাকবে। এই দিনটি শুধু একটি ছাত্র আন্দোলনের দৃষ্টান্ত নয়, এটি একটি প্রতিরোধের দিন, একটি গর্জে ওঠার দিন। কোটবাড়ি বিশ্বরোডে শান্তিপূর্ণভাবে দাঁড়ানো তরুণ-তরুণীদের উপর গুলির শব্দে ধ্বনিত হয়েছিল রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের নিষ্ঠুরতা, আর ছাত্রদের বুক থেকে উঠে এসেছিল সাহসিকতার চিৎকার।
সেদিন সকালটা ছিল অনেকটা অন্যদিনের মতোই। ক্লাসরুমে ঢোকার বদলে শিক্ষার্থীরা ভিড় করেছিলেন কোটবাড়ি বিশ্বরোডে। কেউ হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে, কেউ গলায় বাঁধা রুমালে ‘বিক্ষোভ’ শব্দটি ধারণ করে এসেছিলেন। তাদের দাবিটি ছিল অতি সাধারণ, তা হলো কোটা সংস্কার। তাঁরা কেউ রাষ্ট্রদ্রোহী ছিলেন না, তাঁরা ছিলেন ভবিষ্যতের স্বপ্নদ্রষ্টা। দেশের কল্যাণে, সমাজের ন্যায়ের খোঁজে, প্রশাসনের মনোযোগ আকর্ষণের জন্য শান্তিপূর্ণভাবে রাস্তা অবরোধ করেছিলেন মাত্র।
কিন্তু শান্তিপূর্ণ এই অবস্থান কর্মসূচি সহ্য করতে পারেনি তৎকালীন রাষ্ট্রযন্ত্র। দুপুর ১২টার কিছু পর থেকেই ঘটনাপ্রবাহ এক ভয়াবহ রূপ নেয়। কোনোরকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই শুরু হয় পুলিশি তাণ্ডব। নির্বিচারে ছোড়া হয় গুলি, টিয়ারশেল। চারদিক ধোঁয়ায় ঢেকে যায়, কান্না আর আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে কোটবাড়ির বাতাস।
শুধু একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভেঙে দিতে এমন নির্মমতা। সেদিনের ছিন্নভিন্ন জামা, রক্তে ভেজা মাটি, মাটিতে লুটিয়ে থাকা যন্ত্রণা কাতর মুখ ভোলা যায় না।
যে তরুণটি সকালে পরিবারের কাছে বলে এসেছিল, “বিকেলের মধ্যেই ফিরব মা”, সে বিকেল পর্যন্ত রাস্তায় পড়ে থাকে গুলিবিদ্ধ হয়ে। কোনো চিকিৎসা না পেয়ে মাটিতেই কাতরায়। কেউ হয়তো মারাত্মকভাবে জখম হয়, কেউ আজও কানে ঠিকমতো শুনতে পান না। কারও পায়ে সেদিনের গুলির ক্ষত আজও পঙ্গুত্বের চিহ্ন হয়ে থেকে গেছে।
কিন্তু সেদিন থেমে যাননি শিক্ষার্থীরা। গুলির মুখে, টিয়ারশেলের ধোঁয়ার মধ্যেও তারা দৌড়ে গেছেন একে অন্যকে বাঁচাতে। অনেকে আহত হয়েও পাশে দাঁড়িয়েছেন ভাইয়ের মতো, বোনের মতো। সেই ভয়াল পরিস্থিতির মধ্যেও কেউ মোবাইল ক্যামেরা অন করে রেখেছেন, ইতিহাসের সাক্ষী হবার আশায়। কেউ আবার হাত ধরে বলেছিলেন, “ভয় পেয়ো না, আমরা একসাথে আছি।”
১৮ জুলাইয়ের আন্দোলন ছিল অনন্য এক নজির। কোনো রাজনৈতিক ব্যানার ছিল না, কোনো সংগঠনের পতাকা ছিল না। ছিল কেবল একটাই পরিচয়, তারা সবাই শিক্ষার্থী। তাদের চাওয়া ছিল সাম্যের, তাদের ভাষা ছিল প্রতিবাদের, তাদের চোখে ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আগুন। এই লড়াই ছিল একান্তভাবে নিজের অধিকারের জন্য, ভবিষ্যতের জন্য।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরেও তখন যুক্ত হয়েছিল কুমিল্লার অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। কলেজপড়ুয়া, স্কুলপড়ুয়া, এমনকি এলাকাবাসীর অনেকে পর্যন্ত এসে দাঁড়িয়েছিল শিক্ষার্থীদের পাশে। এক অনির্বচনীয় ঐক্যের ছবি ফুটে উঠেছিল কোটবাড়ির রাজপথে।
রাষ্ট্র যখন শিক্ষার্থীদের কণ্ঠরোধ করতে অস্ত্রের ব্যবহার করে, তখন তার গণতন্ত্র কেবল একটি মুখোশে পরিণত হয়। ১৮ জুলাই তেমনই এক দিন, যখন প্রকাশ্যে চলে এসেছিল সেই মুখোশের নিচের নিষ্ঠুর মুখ।
যে প্রশাসন ছাত্রদের কথা শোনার বদলে গুলি ছোঁড়ে, যে রাষ্ট্র আস্থা রাখে টিয়ারগ্যাসে, তার কাছে কী করে গণতন্ত্রের শিক্ষা আশা করা যায়? এ প্রশ্ন শুধু কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছিলো না, ছিলো এ দেশের প্রতিটি সচেতন নাগরিকের।
এক বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু ক্ষত শুকায়নি। কেবল শরীরের নয়, মনেও জেগে আছে সেই রক্তাক্ত দুপুরের ধ্বংসস্তূপ। কেউ হয়তো রাতেও ঘুমাতে পারেন না, চোখ বুঁজলেই দেখতে পান সহপাঠীর রক্তাক্ত মুখ। কারো হয়তো চিকিৎসার খরচ চালাতে গিয়ে পরিবার দেউলিয়া হয়ে গেছে।
তবুও, যখন এই প্রশ্ন করা হয় আপনি কি আবারও রাস্তায় নামতেন? অধিকাংশই বলেন, “হ্যাঁ, আবারও নামব। কারণ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো কখনো ভুল নয়।”

১৮ জুলাই আর কেবল একটি তারিখ নয়, এটি এক আত্মত্যাগের প্রতীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়ানোর সাহসের নাম। এটি শিক্ষা দেয়, ‘ভয়’ দিয়ে সত্যকে রুখে দেওয়া যায় না। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সেই দিন প্রমাণ করে দিয়েছিল যতই বল প্রয়োগ হোক না কেন, ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মনোবল কখনো ভাঙে না।
আজ, ১৮ জুলাই ২০২৫। এই দিনটিতে দাঁড়িয়ে আমরা তাদের স্মরণ করি, যারা গুলির মুখেও পিছু হটেনি। স্মরণ করি সেই বন্ধুটিকে, যিনি পাশের বন্ধুকে টেনে নিয়ে গেছেন নিরাপদ আশ্রয়ে। স্মরণ করি সেই তরুণীকে, যিনি নিজের রক্তাক্ত হাতে একটি পোস্টার ধরে চিৎকার করে স্লোগান দিয়েছিলেন, “আমার ভাই কবরে, খুনী কেন বাইরে।”
এই দিনটির আলোকে প্রশ্ন জাগে, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকাই বা কী ছিল? কেন ছাত্রদের সুরক্ষায় সক্রিয় হতে পারেনি প্রশাসন? অনেকেই বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নীরবতাই যেন ছাত্রদের উপর বর্বরতার নেপথ্য অনুমোদন ছিল।
আজকের দিনে সেই প্রশ্নগুলো আরও তীব্র হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থানের অধিকার নিশ্চিত করতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও বেশি মানবিক, আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে হবে।
এই ঘটনাটি শুধু একটি স্মৃতির জায়গা হয়ে থাকলে চলবে না। এটি হতে হবে নতুন প্রজন্মের জন্য পাঠ। পাঠ হতে হবে কিভাবে প্রতিবাদ করতে হয়, কিভাবে সাহসিকতার সঙ্গে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়।
এদিন আমাদের শিখিয়েছে, প্রতিবাদের ভাষা কেবল রাগ নয়, ভালোবাসাও। কারণ যে শিক্ষার্থীরা রক্ত দিলো, তারা এই সমাজটিকে, এই দেশটিকে ভালোবেসেই দিয়েছিল। তাই ১৮ জুলাই কেবল প্রতিরোধ নয়, এটি ভালোবাসারও একটি দিন, এই ভালোবাসা দেশপ্রেমের ভালোবাসা।
আজ যখন আকাশে সূর্য অস্ত যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি দেয়াল যেন মনে করিয়ে দেয় এই দিনে কেউ মাথা নত করেনি। প্রতিটি গাছের পাতা যেন বলে ওঠে, “সেই দিন আমরা কেঁদেছিলাম, কিন্তু ভেঙে পড়িনি।”
১৮ জুলাই আজ আমাদের অনুপ্রেরণা। আমাদের ইতিহাস। আমাদের চেতনা।
যত দিন অন্যায় থাকবে, ততদিন ১৮ জুলাই বেঁচে থাকবে আমাদের হৃদয়ে, আমাদের প্রতিবাদে, আমাদের সাহসে।
“আমরা ভুলবো না, আমরা থামবো না।”