কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাটির পাহাড় খ্যাত লালমাই অঞ্চলের অর্থনীতিতে এক নতুন অর্থনীতির সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিতে পারে বাঁশ শিল্প। বাঁশ একটি কৃষিজাত বা বনায়ন ফসল হলেও এর প্রক্রিয়াজাতকরণ, বানিজ্যিক ও উৎপাদনকেন্ত্রিক ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি একটি শিল্প। পরিবেশ দূষণকারী প্লাস্টিক ব্যাগ নির্মুল করতে পারলে বাঁশ শিল্প আরো বেগবান হয়ে দেখা দিতে পারে দেশের সমষ্টিক অর্থনীতিতে। কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ের সবুজ বাঁশ অর্থনীতিতে জোয়ার বয়ে আনতে পারে। কিন্তু বাঁশের সম্ভাবনা যখন ইতিবাচক ভাবে হাঁটছে তখন এই বাঁশ কার অধীন এটা নিয়ে শুরু হয়েছে ঠেলাঠেলি। মঙ্গলবার( ২১ অক্টোবর-২০২৫) এই প্রতিবেদক কুমিল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক মো. মিজানুর রহমানের কাছে যখন কত হেক্টর জমিতে কুমিল্লায় বাঁশ আবাদ কিংবা চাষ হচ্ছে তখন তিনি বলেন, বাঁশ কৃষিতে পড়ে না, এটা সামাজিক বন বিভাগের আওয়ায় পড়ে। এ সম্পর্কে আমাদের কোন নথি নেই। অপরদিকে একই দিন সামাজিক বন বিভাগ কুমিল্লার রেঞ্জ কর্মকর্তা সদর দিলীপ কুমার দাশে র কাছে কৃষি অফিসের ডিডির রেফারেন্সে কথা বললে তিনি বলেন, এটা সামাজিক বন বিভাগের বিষয় না। এটা কৃষি বিভাগ দেখবে। এই যদি হয় দুটি সরকারি অফিসের রশি টানাটানি তাহলে সম্ভাবনাময় এই বাঁশ কিভাবে শিল্পের মর্যাদা নিয়ে দেশের অর্থনীতিতে যোগান দেবে-বলেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন কুমিল্লার যুগ্ম সম্পাদক।
সম্প্রতি কুমিল্লার সদর দক্ষিণ উপজেলার লালমাই পাহাড় সরেজমিনে বাঁশের খোঁজ নিতে গিয়ে দেখা যায়, পাহাড়ের বিজয়পুর ই্উনিয়ন ও বারপাড়া ইউনিয়নের কয়েক গ্রামের প্রায় ২ হাজার পরিবার বাঁশ শিল্পের উপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে জড়িত। সারি সারি লম্বা লম্বা মোটা বাঁশ কোথায়ও আবার আঁকা বাঁকা চিকন বাঁশ সবুজময় করে তুলেছে গোটা লালমাই পাহাড়টিকে। যেন পাহাড়ী কণ্যা হাতছানি দিয়ে নয়া আগন্তককে সাদর সম্ভাষন জানাচ্ছে পাহাড়ে আগমনের জন্য।
সদর দক্ষিণ উপজেলা কৃষি অফিসের মতে,পাহাড়ে প্রায় ১০০ একর জায়গায় বাঁশ চাষ হচ্ছে। যদিও বেসরকারি হিসেবে এই চাষ দ্বিগুণ হতে পারে বলে জানা গেছে। লালমাই পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত বড় ধর্মপুর, রাজারখলা,চোধুরীখলা, ধর্মপুর, দূর্গাপুরসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বাঁশের চাষ হয় বেশি। কষ্ট কম, খরচ অপেক্ষাকৃত নেই বললেই চলে কিন্তু লাভ বেশি – এই কারণে লালমাই পাহাড়ের বাসিন্দারা এখন বাঁশ চার্ষে ঝুঁকছে। জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বাঁশ চাষ। জানা যায়, বর্তমানে সারা বিশ্বে প্রায় ১৫০০ প্রজাতির বাঁশ আছে। বাংলাদেশে আছে ৩৭ প্রজাতির বাঁশ। এগুলোর মধ্যে ২৫-২৬টি প্রজাতিই হল গ্রামীণ বাঁশ আর বাকিগুলো বুনো প্রজাতির। আর কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে প্রায় ৭ প্রকার বাঁশ পাওয়া যায়। এগুলো হলো, বরাক বাঁশ, হিলি বরাক বাঁশ, কনক কানছি বাঁশ ,বারি বরাক বাঁশ,মাল বাঁশ,মুলি বাঁশ ও তল্লা বাঁশ । এর মধ্যে বরাক বাঁশের দাম খুব বেশি এবং কনক বাঁশের দাম অপেক্ষাকৃত কম। বরাক বাঁশ দিয়ে ঘরের চাল বা সেন্টারিংয়ের কাজ করা হয়। অপর দিকে কনক বাঁশ দিয়ে মাছ ধরার চাই, বিভিন্ন ক্ষেতে খামারে বেড়ার কাজে ব্যবহৃত হয়। সদর দক্ষিণ উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের বড় ধর্মপুর গ্রামের বাঁশ চাষি জাহাঙ্গীর আলম সরদার বলেন, আমার নিজস্ব ৫টি বাঁশ মুড়া (বাগান) আছে। প্রতিটি মুড়ায় ১০০ থেকে ১৫০টি গাছ রয়েছে। বাঁশের বীজ কোথায় থেকে আনেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাঁশের বীজ কিনতে হয় না। একবার কষ্ট করে একটা গাছ বড় হলেই চলবে। পরবর্তীতে এটা থেকেই ছোট ছোট চাড়া জন্মাবে। আর এভাবেই গড়ে উঠবে বাঁশ মুড়া বা বাঁশ ঝাড় বা বাঁশ বাগান।
আবদুল কুদ্দুছ মিয়া নামে রাজারখোলা এলাকার আরেকজন কৃষক বলেন,বাঁশ মুড়া করতে খুব বেশী খরচ করতে হয় না। তবে বাঁশ একটু বড় হলে গোড়ায় মাটি দিতে হবে যাতে গাছটি পড়ে না যায়। আবার সময়ে সময়ে ইউরিয়া সার দিতে হবে। তাহলে বাঁশের গোড়াটি মজবুত হয়ে উঠবে এবং বাঁশ পাকলে টেকসই হবে। দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে লালমাই পাহাড়ের বাঁশ কেন অনন্য জানতে চাইলে স্থানীয় স্কুল শিক্ষক শিরাজুল ইসলাম বলেন, এক কথায় বলব, গুণে মানে অনন্য লালমাই পাহাড়ে বাঁশ। এই এলাকার বাঁশ দেখতে সুন্দর এবং টেকসই। লালমাই অঞ্চলের পাহাড়ী মাটি ও আবহাওয়া বাঁশ চাষের উপযোগী। বাঁশ চাষে কোন রকম কষ্ট হয় না জানিয়ে এ শিক্ষক বলেন, শুধু একটু শারিরিক কষ্ট করতে হবে বাগানের সেবা যত্নের জন্য।
তিনি বলেন,লালমাই পাহাড়ের বাঁশ শুধু লালমাই না,গোটা কুমিল্লার চাহিদা মিটিয়ে ফেনী,চাঁদপুর,নোয়াখালী ও চট্রগ্রাম থেকেও পাইকররা এসে এখানকার বাঁশ পাইকারি নিয়ে যায়। তবে বাঁশ বাগানের সবচেয়ে বড় কষ্ট হলো বাঁশ কাটা। বাঁশ কাটা শ্রমিকদের অনেক টাকা দিতে হয়। কারণ,বাঁশগুলো একটার সাথে আরেকটা এমন ভাবে লেগে থাকে যে, একটা বাঁশ মনমতো কেটে আনতে অনেক সময় লাগে। লালমাই পাহাড়ে বর্তমানে বাঁশের দাম জানতে চাইলে জাহাঙ্গীর সর্দার বলেন,বরাক বাঁশ পাইকারি ২৫০-৩০০ টাকা এখন বিক্রি হয় আর খুচরা আমরা ৩৫০-৪০০ টাকা বিক্রি করি। কনক কাইছ পাইকারি আমরা ২০-৩০ টাকা ধরে বিক্রি করি আর খুচরা আমরা ৬০-৮০ টাকা বিক্রি করি।
স্থানীয় বাঁশ চাষি, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা ,কুষি বিষয়ক শিক্ষকদের সাথে কথা বলে ও সরেজমিনে গিয়ে প্রত্যক্ষ করে বুঝা যাচ্ছে, বাঁশ চাষকে কেন্দ্র করে কুমিল্লার লালমাই পাহাড়ে এখন এক নতুন সবুজ বিপ্লবের সূচনা হতে যাচ্ছে।
আগে যেখানে অনুর্বর পাহাড়ি ঢাল পড়ে থাকত নির্জীব, এখন সেখানে ঘন সবুজ বাঁশবাগান দোল খাচ্ছে বাতাসে। পরিবেশ বান্ধব এই উদ্যোগ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যই ফিরিয়ে আনেনি, কৃষকদের অর্থনৈতিক মুক্তির পথও খুলে দিয়েছে। লালমাই উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে কৃষকেরা এখন আগ্রহ নিয়ে বাঁশের চারা রোপণ করছেন।
তাদের সাথে কথা বলে জানা যাচ্ছে, বর্তমানে বছরে প্রায় একশ কোটি টাকার বাঁশ বিক্রি হচ্ছে লালমাই পাগাড় ও এর আশে পাশের কিছু এলাকায়। ফলে যত্ন কম, খরচ কম, কিন্তু লাভ অনেক। এই মন্ত্রে দিক্ষিত হয়ে অনেক তরুণ আগ্রহ দেখাচ্ছে বাঁশ চাষে।
স্থানীয় তরুণ বাঁশ চাষি খোকন বলেন, “বাঁশ এখন শুধু ঘরবাড়ি বা আসবাবেই লাগে না, অনেক কারখানায় কাঁচামাল হিসেবে এর চাহিদা বেড়েছে। আমি এখন বাঁশ চাষের পাশাপাশি বাঁশজাত পণ্য বিক্রি করছি।”
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সদর দক্ষিণ উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা জুনায়েদ কবীর খান বলেছেন, “লালমাই পাহাড়ের মাটি ও জলবায়ু বাঁশ চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। কৃষকরা এখন টেকসই পদ্ধতিতে বাঁশ চাষ করছে। আমাদের কাছে আসলে আমরা তাদের পরামর্শ দিচ্ছি।যাতে তারা টেকসইভাবে বাঁশ চাষ করতে পারে বাঁশের চাহিদা স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। এখানকার মাটি ও আবহাওয়া বাঁশের দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা আঞ্চলিক কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর মাসুম বলেছেন, পরিকল্পনা মতো বাঁশ চাষ করলে রপ্তানিতেও সম্ভাবনা তৈরি হবে । বিভিন্ন হস্তশিল্প কারখানায় বাঁশের ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। বাঁশ চাষ পাহাড়ের মাটি ধস প্রতিরোধে সহায়তা করে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক প্রভাব কমাতেও ভূমিকা রাখে। বাঁশ চাষকে “সবুজ অর্থনীতির অংশ” হিসেবে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া উচিত বলে মনে করেন কুমিল্লার এই পরিবেশবিদ।
পরিবেশবিদ ড. নাজমুল হক বলেন, “বাঁশ একদিকে মাটিক্ষয় রোধ করে, অন্যদিকে কার্বন শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমায়। তাই এটি কৃষি ও শিল্প—দুই খাতেই যুগপৎ সম্ভাবনাময়।” সরকার যদি লালমাইয়ের মতো পাহাড়ি এলাকায় বাঁশ প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা স্থাপন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র চালু করে, তবে এখান থেকে গড়ে উঠতে পারে পূর্ণাঙ্গ ‘বাঁশ শিল্প এলাকা’
সবশেষে বলব, লালমাটির পাহাড় লালমাই বাঁশ শিল্পে নতুন দিগন্তের সূচনা করে পাহাড়ে সবুজ বিপ্লব ঘটাতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সরকারের পৃষ্টপোষকতা ও কঠোর নজরধারী।