পরিশ্রম, ধৈর্য আর কঠোর ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে যদি প্রযুক্তি যুক্ত হয়, তাহলে জীবনের সাফল্য হাতের মুঠোয় আসতে বাধ্য। সেই স্বপ্নময় সাফল্যের মিষ্টি হাসি এবার ফুটেছে কৃষক বিল্লালের মুখে তিতা করলা চাষ করে। তার লাজুকতা, হাসি-ভরা মুখাবয়বে তৃপ্তির ছাপ স্পষ্ট। যেন বলছে, সাফল্য এমনি এমনি আসে না; এজন্য প্রয়োজন অধ্যবসায় এবং ভালো কিছু করার সুন্দর এক স্বপ্ন।
বলছিলাম চান্দিনার সফল কৃষক বিল্লাল হোসেনের কথা। পিতা আবুল হাশেম মেম্বার। চান্দিনা উপজেলার কেরনখাল ইউনিয়নের ডুমুরিয়া গ্রামে জন্ম তার। পিতা-মাতার তিন ছেলে ও দুই মেয়ের মধ্যে তিনি বড়। বড় ছেলে হওয়ায় নানা কারণে প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারেননি বিল্লাল হোসেন। ছোটবেলা থেকেই তিনি দেখেছেন তার বাবা ইউনিয়নের মেম্বারি করছেন আর জমি চাষ করে সংসার চালাচ্ছেন। বাবার পথ ধরে তিনিও নেমে আসেন ক্ষেতে-খামারে। শুরু করেন কৃষিকাজ। এই কৃষিকাজ করেই ছোট দুই ভাই ও দুই বোনকে মানুষ করেছেন তিনি। ইতিমধ্যে একজন কৃষক হিসেবে তিনি সিকি শতাব্দী পার করেছেন। নানা সময়ে নানা রকম সবজি চাষ করে এখন আলোচনায় বিল্লাল হোসেন। তবে গত কয়েক বছর ধরে আগাম করলা চাষ করে তিনি উপজেলার গণ্ডি পেরিয়ে সারা দেশেই আলোচিত।
কুমিল্লার চান্দিনা উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমনা আক্তার স্মৃতি আপার কাছ থেকেই গত সপ্তাহে জানতে পারি কৃষক বিল্লালের সাফল্যের গল্প। দিনক্ষণ ঠিক করে বুধবার (২৯ অক্টোবর) কুমিল্লা শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার আঁকাবাঁকা গ্রামীণ মেঠোপথ পেরিয়ে চলে গেলাম একেবারে চান্দিনার ডুমুরিয়ার বিল্লাল হোসেনের করলা ক্ষেতে। সেখানে আগে থেকেই অপেক্ষায় ছিলেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমনা আক্তার স্মৃতি, যিনি এই ব্লকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা।
জানা যায়, বিল্লাল হোসেন এবার ১৩০ শতক জমিতে করলা লাগিয়েছেন। চারা থেকে ফলন আসা পর্যন্ত প্রায় দুই মাস বা তার কিছু বেশি সময় লাগে বলে জানান তিনি। এতে তার দুই থেকে আড়াই লক্ষ টাকা খরচ হলেও বিক্রি করতে পারবেন প্রায় দশ লক্ষ টাকা এমনটাই জানান বিল্লাল হোসেন। এটি ‘নিসি করলা’ জাতের করলা। দেখতে সুন্দর, আকারে সাধারণ করলার চেয়ে কিছুটা লম্বা, আর খেতেও তুলনামূলক সুস্বাদু।
বিল্লাল হোসেন জানান, ইউটিউবে দেখে তিনি এই করলা সম্পর্কে জানতে পারেন। পরে দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে সিলেট থেকে এই নিসি করলার বীজ সংগ্রহ করেন। প্রথমে কোকো-ডাস্ট পদ্ধতিতে চারা উৎপাদন করে পরে মালচিং পদ্ধতিতে রোপণ করেন। বিল্লাল হোসেনের করলার জমিতে গেলে যে কারও চোখ জুড়িয়ে যাবে। নিচে মালচিং পদ্ধতি, উপরে মাচা— আর চারপাশে শুধু সবুজ করলার লতা। আহা! কী চমৎকার দৃশ্য! মুহূর্তেই নয়ন ভরে যায়। বিল্লাল হোসেন দেখিয়ে দিয়েছেন পরিশ্রম, ধৈর্য আর প্রযুক্তিনির্ভর কৃষির মাধ্যমে ইচ্ছা থাকলে গ্রামবাংলার মাটিতেও বদলে দেওয়া যায় ভাগ্য। এই তিতা করলার ভেতর দিয়েই তিনি খুঁজে পেয়েছেন আগামী দিনের আত্মবিশ্বাস ও নতুন আশার আলো। তিনি বলেন, “এখনো বাজারজাত শুরু করিনি। ঢাকা, কুমিল্লা, চাঁদপুর ও চট্টগ্রাম থেকে পাইকাররা আসতে শুরু করেছেন। মাটি ও আবহাওয়া ভালো হওয়ায় এবং স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা সুমনা আক্তার স্মৃতি প্রতিনিয়ত তদারকি করায় এবার ফলন দারুণ হবে বলে আশা করছি।” বিল্লাল বলেন, “আগে ভাবতাম চাষাবাদ করে বড় কিছু করা যায় না। কিন্তু এখন বুঝি সঠিক পরিকল্পনা ও পরিশ্রম থাকলে কৃষিই হতে পারে সোনার খনি।” করলা চাষে তিনি স্থানীয় কৃষি অফিস থেকেও পেয়েছেন প্রযুক্তিগত সহায়তা।
চান্দিনা উপজেলা কৃষি বিভাগের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সুমনা আক্তার স্মৃতি বলেন, “করলা দেখতে তিতা হলেও এর ফলন মিষ্টি। বাজারে সবসময় এর চাহিদা থাকে। তাছাড়া রোগবালাই তুলনামূলক কম, তাই কৃষকরা এখন করলা চাষে আগ্রহী হচ্ছেন।” তিনি আরও বলেন, “বিল্লাল হোসেন চান্দিনার একজন উদ্যমী কৃষক। তিনি নিয়মিত প্রশিক্ষণ নেন এবং নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। তাঁর সাফল্যে অন্য কৃষকরাও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন।” বিল্লালের বাগান এখন সবুজে ভরে গেছে করলার লতাগুল্মে। আগামী সপ্তাহ থেকে তিনি পুরোদমে করলা বাজারজাত করতে পারবেন বলে জানান সুমনা আক্তার স্মৃতি।
কুমিল্লা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কুমিল্লা জেলায় চলতি মৌসুমে মোট ৮৩৩ হেক্টর জমিতে করলা চাষ করা হয়েছে। জেলার ১৭ উপজেলার মধ্যে সবচেয়ে বেশি করলা চাষ হয়েছে দেবিদ্বার উপজেলায় (১২৮ হেক্টর), আর সবচেয়ে কম তিতাস উপজেলায় (১০ হেক্টর)।
এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, “কুমিল্লার মানুষ এখন ধীরে ধীরে করলার চাষে ঝুঁকছে। এখানকার আবহাওয়া করলা চাষের উপযোগী। তবে মাটির ধরন কিছু জায়গায় উপযোগী, কিছু জায়গায় নয়। এজন্য আমরা কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছি করলা চাষে ভালো ফলাফল পেতে হলে ধলচুন ব্যবহার করতে হবে এবং প্রতি শতকে চার কেজি জৈব সার প্রয়োগ করতে হবে।”
সব শেষে বলা যায়, বিল্লাল হোসেন এখন আত্মবিশ্বাসী কৃষক। তার সবুজ করলার বাগান কেবল অর্থনৈতিক উন্নতি কিংবা সমৃদ্ধির অংশই নয়, অনুপ্রেরণার প্রতীকও বটে। তিনি প্রমাণ করেছেন, “তিতা করলার ভেতর দিয়েও ফুটে উঠতে পারে মিষ্টি হাসি’’।